ভারতে ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) নামের যুব আন্দোলনের এবারের লক্ষ্য ছিল দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। এই দাবি পূরণে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
সিজেপি বিক্ষোভটির নাম দিয়েছে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’। গত সপ্তাহে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিক্ষোভগুলোর মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অধীনস্থ কর্মকর্তারা তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। ওই সংশোধনের ফলে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই সংখ্যা জাপানের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচকদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, সরকার নিজেদের সুবিধার জন্য ভোটার তালিকায় কারসাজি করার চেষ্টা করছে। সংবাদপত্রটির প্রতিবেদন প্রকাশের পর তারা দ্রুত সেই অভিযোগ আবার সামনে এনেছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে।
বিজেপির দাবি, মোদির জনপ্রিয়তা এবং ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নির্বাচনে দলটির আধিপত্যের প্রধান কারণ। দলটি আরও অভিযোগ করে, নির্বাচনে জিততে না পেরে বিরোধীরা দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করছে।
তা সত্ত্বেও বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর প্রায় প্রতিদিনের বিক্ষোভ মোদির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এর মাত্র কয়েক মাস আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় একই ধরনের বিক্ষোভের মুখে তার শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল।
২০২৭ সালের শুরুর দিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগেই নতুন এই বিক্ষোভ দেখা দিল।
শুক্রবার দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সিজেপি মৌলিক অধিকার প্রয়োগের যুক্তিতে তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে অবরুদ্ধ দিল্লি
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ শনিবার হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মীর টহল, যাতায়াতব্যবস্থা ও টেলিযোগাযোগ সংযোগ বন্ধসহ নানা বিধিনিষেধের মধ্য দিয়ে শহরজুড়ে কার্যত অবরুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের একটি বিক্ষোভ ঠেকাতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, মধ্য দিল্লিতে পুলিশের ধাওয়া খাওয়া কয়েকজন তরুণ বিক্ষোভকারী ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। এ সময় পুলিশ অন্য অনেক বিক্ষোভকারীকে টেনেহিঁচড়ে বাসে তোলে। তাদের সরিয়ে নেওয়ার মধ্যেই আরও বিক্ষোভকারী সেখানে আসতে থাকে।
বাসে তুলে নেওয়া হচ্ছিল এমন একজন যোগেন্দ্র সোলাঙ্কি রয়টার্সকে বলেন, “এটি জনগণের অধিকার লঙ্ঘন। দেশ আর এটা সহ্য করবে না।”
‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়েছে। সিজেপির এক বিবৃতিতে বলা হয়, মুম্বাই থেকে তাদের বহনকারী উড়োজাহাজটি দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তাদের আটক করা হয়।
টেলিভিশনের দৃশ্যে দেখা যায়, উড়োজাহাজের ভেতরে তিন নেতার সঙ্গে কথা বলতে আসা পুলিশ কর্মকর্তাদের দীপকে বলেন, “আমি গ্রেপ্তার হতে এসেছি, আমাকে গ্রেপ্তার করুন... আপনাদের ভয় পাই না।”
জবাবে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “না, এটি গ্রেপ্তার নয়। দয়া করে সহযোগিতা করুন।”
সিজেপি তাদের নেতাদের ‘কর্তৃত্ববাদী কায়দায় আটক’ করার নিন্দা জানিয়েছে। দলটি এ ঘটনাকে ‘পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া’ বলে অভিহিত করে বলেছে, শনিবারের সমাবেশের নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। আটক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তির দাবিও জানিয়েছে তারা।
দুটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় তাদের চার সাংবাদিককে আটক করেছে পুলিশ।
সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বিক্ষোভরত কয়েকজন আইনজীবীকেও আটক করা হয়েছে বলে এক্সে জানিয়েছেন আদালতের বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।
আটকের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুই কোটি মানুষের এই শহরের অন্যত্রও বিধিনিষেধ জারি করা হয়। কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় ৪৫টি মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধ রাখা হয়েছে এবং মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শহরে প্রবেশের বিভিন্ন পয়েন্টে বাস থামিয়ে তল্লাশি চালায় পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের খুঁজতে বাসে ওঠার পাশাপাশি গাড়ি ও অন্য যানবাহনেও তল্লাশি করা হয়।
তারা আরও জানান, সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জামযুক্ত দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানও মোতায়েন করা হয়েছে।
দিল্লির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে দীপকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী দেশের তরুণদের, দেশের মানুষকে এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”
মুম্বাইয়ে বার্তা সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, “সব রেল চলাচল, মেট্রো, ইন্টারনেট ও সড়ক বন্ধ করার প্রয়োজন হলো কেন? ... এগুলো ভয় ছাড়া আর কিছুই নয়।”
বিক্ষোভকারীদের সকাল ১০টায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার কথা ছিল। তবে নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে তাদের কর্মসূচি বিলম্বিত হয়।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ায় রাজ্য নির্বাচনের ফল প্রভাবিত হয়েছে, বিরোধীদের অভিযোগ
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনে নিজেদের নিয়োগ দেওয়া কর্মকর্তাদের—যাদের মধ্যে কুমারও রয়েছেন—সহযোগিতায় বিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিরোধী দলগুলোর দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা সম্প্রতি বিজেপির জেতা কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও এতে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ভোটার অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি ভোটারের সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার মারা গেছেন।
কমিশনের বক্তব্য, এই সংখ্যা মূলত খসড়া তালিকা সংশোধনের পর্যায়ে চিহ্নিত ভোটারদের নামের হিসাব। ভুলবশত যাদের নাম বাদ পড়েছে, তারা আবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেন।