Advertisement Banner

ইরান নয়, আমেরিকা আসলে যুদ্ধ করছে ইসরায়েলের বিপক্ষে

হামিদ দাবাশি
হামিদ দাবাশি
ইরান নয়, আমেরিকা আসলে যুদ্ধ করছে ইসরায়েলের বিপক্ষে
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

আমি এমন এক মন্তব্য করতে চাই, যা প্রথমে কিছুটা অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। আজ বিশ্ব যা দেখছে, তা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ‘ইসরায়েলি-আমেরিকান’ যুদ্ধ নয়। অবশ্য ‘জায়নবাদী’ প্রচারণা হিসেবে এ কথাই তুলে ধরা হচ্ছে। যাতে করে আমেরিকা ও বিশ্বব্যাপী এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে, তা চাপা দেওয়া যায়।

এটি আসলে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–উভয়ের বিরুদ্ধেই চালানো একটি যুদ্ধ। এখানে যুক্তরাষ্ট্র বলতে আমি বোঝাচ্ছি সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানদের, যারা এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। তারাই এই ইসরায়েলি আক্রমণের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য।

ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সহযোগীরা মনে করছে, তারা এই যুদ্ধকে ‘ইসরায়েলি-আমেরিকান’ জোট হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে পারবে। তারা তা পারবে না।

এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একটি বিষয় খেয়াল করা দরকার, কীভাবে নিউইয়র্ক টাইমস ও তাদের মতো অন্যান্য গণমাধ্যম আমেরিকানদের বিভ্রান্ত করছে। এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা চলছে, সেগুলো তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। পার পেয়ে যাচ্ছে প্রকৃত দায়ী–ইসরায়েল ও প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এই যুদ্ধ তারা শুরু করেছে—ট্রাম্প নয়, আর অবশ্যই সাধারণ আমেরিকানরাও নয়।

ইসরায়েল ট্রাম্পকে ধোঁকা দিয়ে এই যুদ্ধে যুক্ত করেছে। ইসরায়েলকে আড়াল করে এবং ট্রাম্পের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড থেকে আলাদা করে দেখিয়ে আমেরিকান গণমাধ্যম জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। এতে করে মার্কিনদের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে নিজেদের ‘অস্থিতিশীল’ প্রেসিডেন্টের ওপর, সেই ‘গণহত্যাকারী জায়নবাদীদের’ ওপর নয়, যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে।

এটি এমন একটি যুদ্ধ, যা ইসরায়েল চালাচ্ছে ইরান এবং সেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আমেরিকানদের বিরুদ্ধে, যারা এর বিরোধিতা করে। অধিকাংশ আমেরিকান চায় তাদের দেশকে ইসরায়েলের কবল থেকে মুক্ত করতে, যাদেরকে অবশ্য অর্থায়ন করে আসছে তারাই। সেটাও করে আসছে নিজেদের কল্যাণের কথা চিন্তা করে।

দুই দশকের বেশি আগে ‘দ্য অ্যানার্কি অব এমপায়ার ইন দ্য মেকিং অব ইউএস কালচার’ গ্রন্থে প্রয়াত অ্যামি ক্যাপলান দেখিয়েছিলেন, কীভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং বৈদেশিক নীতি গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। এদের মাঝে কোনো দেয়াল আছে–এই ধারণা ভ্রান্ত।

ধ্বংসাবশেষ। ছবি: রয়টার্স
ধ্বংসাবশেষ। ছবি: রয়টার্স

আমেরিকার জনমতের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ–এই ধারণা যারা করছেন বা বিভিন্ন মাধ্যমে বলে বেড়াচ্ছেন, তাদের দমনের মরিয়া প্রচেষ্টা চলছে। আর এই প্রচেষ্টা ইরানের বেসামরিক জনগণ, অবকাঠামো, তেল শোধনাগার, গ্যাস মজুত এবং বিশ্বখ্যাত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ওপর বোমাবর্ষণের মতোই ক্ষতিকর।

প্রক্সি শক্তি

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ আসলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলপন্থী লবিং গোষ্ঠীগুলোর যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু সম্প্রতি এই ধারণা থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে

নেতানিয়াহু বহু দশক ধরে এই যুদ্ধের স্বপ্ন দেখেছেন। অবশেষে তিনি ট্রাম্পকে ইরানের ওপর হামলায় যোগ দিতে প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মাধ্যমে হোয়াইট হাউসে বসে থাকা ‘সরলমনা’ শক্তিধর ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছেন এই নেতানিয়াহু। ট্রাম্প এখন স্পষ্টতই এই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন। কিন্তু তিনি এতটাই অজ্ঞ এবং অহংকারী যে, পরামর্শও করতে পারছেন না–তিনি কীভাবে তা করবেন।

‘নো কিংস’ শিরোনামে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে ব্যাপক বিক্ষোভ হচ্ছে, তা কী খেয়াল করেছেন? বিক্ষোভকারীরা ইসরায়েল-প্রশিক্ষিত মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। পাশাপাশি তারা দাবি করছে, তাদের প্রেসিডেন্টকে প্রতারিত করে ইরান যুদ্ধে যুক্ত করা হয়েছে।

ইরানের বেসামরিক মানুষ, অবকাঠামো, তেল শোধনাগার এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ওপর বোমা হামলার চেয়ে আমেরিকার জনমতের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই যুদ্ধ কোনো অংশে কম ক্ষতিকর নয়।

ইসরায়েলের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে ট্রাম্প কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি ‘প্রক্সি বাহিনীতে’ পরিণত করেছেন। তারা এখন ভীতু এক বসতি-উপনিবেশকারীর ব্যক্তিগত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে ছোট অংশ বড় অংশকে নিয়ন্ত্রণ করে। লাখো আমেরিকান এই ঐতিহাসিক দাসত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। তারা তাদের দেশকে ফিরে পেতে চায়।

এদের মধ্যে একজন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। এই ব্যক্তি ভবিষ্যতে ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে পারেন। এই নেতা সম্প্রতি বলেছেন, তিনি ইসরায়েলের জন্য সব ধরনের সামরিক সহায়তার–এমনকি প্রতিরক্ষামূলক সহায়তারও বিরোধিতা করবেন। এই প্রবণতা রিপাবলিকান পার্টির ‘মাগা’ আন্দোলনেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে জনপ্রিয় ও স্পষ্টভাষী বক্তাদের কথা শুনলেই তা বোঝা যায়। তাদের মধ্যে রয়েছেন টাকার কার্লসন, নিক ফুয়েন্টেস ও কান্ডাসি ওভেনস।

ধ্বংসাবশেষ। ছবি: রয়টার্স
ধ্বংসাবশেষ। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি ও আমেরিকান বোমারু বিমান যখন একটি সার্বভৌম দেশের স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা, সেতু, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং অন্যান্য অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, তখন তারা কেবল লাখো আমেরিকানের ক্রমবর্ধমান বিদ্রোহকেই উসকে দিচ্ছে।

তাহলে ইসরায়েল কেন ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালাচ্ছে? উত্তরগুলো সহজ এবং স্পষ্ট: প্রথমত, এর মাধ্যমে তারা গাজায় গণহত্যা, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি দখল এবং লেবাননে যুদ্ধাপরাধ থেকে দৃষ্টি সরাতে চায়। ইসরায়েল নিরলসভাবে একাধিক দেশের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে, একই সঙ্গে আরও বেশি ফিলিস্তিনিদের হত্যাকে বৈধতা দিতে আইন প্রণয়ন করছে।

কিন্তু সর্বোপরি, ফিলিস্তিনি, লেবানিজ, সিরীয় ও ইরানিদের বিরুদ্ধে (প্রকৃতপক্ষে পুরো অঞ্চলের বিরুদ্ধে) এই নির্মম যুদ্ধগুলো তাদের তথাকথিত ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ গঠনের বিভ্রমমূলক পরিকল্পনার অংশ।

ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সমর্থকেরা এখন আতঙ্কিত। তারা আর বুঝতে পারছে না, কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে। সত্য এখন প্রকাশিত, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল একটি ইসরায়েলি পরিকল্পনা। ট্রাম্পকে এতে যোগ দিতে প্রতারিত করা হয়েছে।

যেখানে অধিকাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধিতা করে, সেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ইসরায়েলি এটি সমর্থন করে। মূলত এটি একটি ইসরায়েলি যুদ্ধ, কোনো ‘ইসরায়েলি-আমেরিকান’ যুদ্ধ নয়।

ট্রাম্প এবং তার ‘জায়নবাদী’ সহযোগীরা ভিন্নমত দমন করতে একটি অভিযান চালিয়েছেন, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে সেন্সর করা এবং থামিয়ে দেওয়া। যাদের নেতৃত্বে আছেন হোয়াইট হাউসের নীতি বিষয়ক উপপ্রধান স্টিফেন মিলার।

তবুও, বাম, ডান ও মধ্যপন্থী—সব ধারার লাখো আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। তারা ক্লান্ত তাদের ছেলে-মেয়েদের ইসরায়েলের জন্য যুদ্ধ করতে পাঠাতে, যদিও ফক্স নিউজ এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নেতৃত্বে চলমান প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের এই যুদ্ধ আসলে সেইসব আমেরিকানদের বিরুদ্ধেও একটি বৃহত্তর যুদ্ধের অংশ, যারা তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে। সব যুদ্ধেই এমন হয়ে আসছে। এই তালিকায় ট্রাম্প থেকে শুরু করে সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবে এবং আরও অনেকে রয়েছেন। ইসরায়েল একটি পুরো প্রজন্মের নীতিবান ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আমেরিকানদের সমর্থন হারিয়েছে।

যেসব গণমাধ্যম ও লবিং গোষ্ঠী এখনও ইসরায়েলকে রক্ষা করে যাচ্ছে, তারা একসময় ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তারা ভেবেছিল, নিরপরাধ শিক্ষার্থী ও প্রতিবাদকারীদের ওপর “ইহুদিবিদ্বেষের” ভয়াবহ অপবাদ চাপিয়ে দিয়ে সমালোচনামূলক কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করতে পারবে। কিন্তু এই প্রজন্মের আমেরিকানরা আর কখনো প্রতারিত হবে না, সিবিএস নিউজের প্রধান বারি ওয়েইস তার নতুন অবস্থান থেকে যত জোরেই প্রতিবাদ করুন না কেন।

ইসরায়েল এই দুই যুদ্ধেই হারছে। হ্যাঁ, নেতানিয়াহু একটি পরাশক্তিকে যুদ্ধে জড়াতে এবং গাজার গণহত্যার আদলে ইরানি শিশুদের ব্যাপকভাবে হত্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যা পুরো ‘জায়নবাদী’ প্রকল্পকে ইউরোপীয় বর্বরতার একটি নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু ইরান এখনও দৃঢ় ও অটল অবস্থানে রয়েছে। প্রতিরোধ ও স্থিতিশীলতার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়ে আসছে।

আমেরিকান ক্ষেত্রেও ইসরায়েল পরাজিত হয়েছে। বিভিন্ন জরিপ ও প্রতিবাদ দেখাচ্ছে, আমেরিকানরা তাদের দেশের ওপর ইসরায়েলের প্রভাবকে ঘৃণা করে। রাজনৈতিক প্রার্থীরা এখন ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক এড়িয়ে চলছে, যেন এটি একটি মহামারি।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী সামনে রেখে এই গ্রীষ্মে আমেরিকানরা শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে নয়। বরং ইসরায়েল থেকেও তাদের মুক্তি উদযাপন করবে, যাদের আসলে ফিলিস্তিনের কেন্দ্রে এনে ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে বসানো হয়েছিল।

লেখক: হামিদ দাবাশি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানীয় অধ্যয়ন ও তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক। সেখানে তিনি তুলনামূলক সাহিত্য, বিশ্ব সিনেমা এবং উপনিবেশ-উত্তর তত্ত্ব পড়ান।

(লেখাটি মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া)

সম্পর্কিত