অস্ট্রেলিয়ার সাবেক আম্পায়ার সায়মন টফেল গত এক বছর কাজ করেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সঙ্গে। ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা আম্পায়ারদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এমন একজন সমৃদ্ধ ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষ ব্যক্তি কেন বিসিবিতে কাজ করতে আগ্রহী হলেন, সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ক, বিপিএলে ফিক্সিং বন্ধ করা বন্ধ করা সম্ভব কি না, এমন অনেক বিষয় নিয়ে চরচার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন টফেল।
চরচা: কেমন উপভোগ করলেন বাংলাদেশে সময়টা?
সায়মন টফেল: খুব ভালো। আমি যা ভেবেছিলাম, তারচেয়ে অনেক ভালো অভিজ্ঞতাই হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এখন আমি এখন খুব কাছ থেকে জানি।
চরচা: যখন এসেছিলেন, তখন আর এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটকে জানার ক্ষেত্রে বড় তফাত কি দেখছেন?
টফেল: আমি আম্পায়ার হিসেবে এবং খেলাটির একজন ভক্ত হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেট, এখানকার ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। তবে গত এক বছরে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ক্রিকেট কীভাবে চলে, সেই ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নিয়েই ফিরছি।
চরচা: আপনি এসেছিলেন আমিনুল ইসলামের বোর্ডে। আপনাকে চাকরি প্রস্তাবটা কি সরাসরি তারই দেওয়া?
টফেল: হ্যাঁ। সেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছিল আমি বাংলাদেশের ক্রিকেটে কাজ করতে চাই কি না। সেই সময়ে আমার কাছে মনে হয়েছিল এটা একটা দুর্দান্ত সুযোগ বাংলাদেশের ক্রিকেটে অবদান রাখার।
চরচা: এরপর তো আমিনুলকেই সরে যেতে হল সভাপতি পদ থেকে। তামিম ইকবালের বোর্ড সভাপতি হওয়ার পর কখনও নিজের কাজ নিয়ে চাপ অনুভব করেছেন?
সাবেক বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সাইমন টফেল। ছবি : বিসিবি
টফেল: একদমই না। সত্যি বলতে কে আসল আর কে গেল, সেটা নিয়ে আমার বা আমাদের মত ব্যক্তিদের ভাবার কিছু নেই। কারণ আপনি বোর্ডের জন্য কাজ করবেন, সভাপতির জন্য নয়। হ্যাঁ, আমিনুলের বোর্ড আমাকে নিয়োগ দিয়েছে, কিন্তু এখন যারা আছে তারা আমার কাজে কখনই হস্তক্ষেপ করেনি।
চরচা: নতুন বোর্ড আসার পর আমিনুলের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়েছিল আপনার?
টফেল: না। আমি জানি না সে কেন আমার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। আমার ম্যানেজার একবার জানিয়েছিল, আমিনুল নাকি ই-মেইল করে বলেছে আমি যাতে বিসিবির চুক্তি নিয়ে নতুন করে চিন্তা করি। আমি তাতে সাড়া দিইনি। হয়তো সে তাতে হতাশ হয়েছে।
চরচা: এতে আপনি অবাক হয়েছেন?
টফেল: কিছুটা। তবে আমিনুল আর বিসিবি সভাপতি না থাকলেও বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক এবং প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান। তাই দেশের ক্রিকেটের জন্য মঙ্গল হবে, নিশ্চয় সেটাই চাইবে সে। আমার বিশ্বাস, সে এভাবেই চিন্তা করে।
চরচা: যদি তাই হয়, তাহলে আপনাকে নতুন বোর্ডের অধীনে কাজ করার ব্যাপারে ভাবতে বললেন কেন?
টফেল: এটার উত্তর আমিনুলের কাছ থেকেই আপনাকে জানতে হবে। আমি নিশ্চিত তার কাছে এর একটা ব্যাখ্যা আছে।
চরচা: তামিমের বোর্ড আপনার কাছে হস্তক্ষেপ না করলেও আপনার সঙ্গে তিন বছরের চুক্তি এক বছরেই বাতিল করেছে। এতে আপনার কাজ কি অসম্পূর্ণ থেকে গেল না?
টফেল: বিসিবি তাদের জন্য যেটা ভালো মনে করেছে, সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছে। এই এক বছরে আমি চেষ্টা করেছি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের আম্পায়ার, ম্যাচ অফিশিয়ালসদের পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়ার। দুই বোর্ডের সময়েই বেশ কিছু কোর্স পরিচালনা করেছি, যা আমি নিশ্চিত তাদের অনেক কাজে দেবে।
চরচা: তবে দীর্ঘ মেয়াদে কাজ করার ক্ষেত্রে এটা নিশ্চয় একটা প্রভাব ফেলেছে?
টফেল: এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আপনাকে অনেক গভীরে যেতে হবে। আমি ছিলামই মাত্র এক বছর, তাই আমি নিশ্চিত নই এই ব্যাপারে। তবে এলিট প্যানেলে এতগুলো বছরে বাংলাদেশের মাত্র একজন আম্পায়ার থাকাটা হতাশাজনক। আমার কাছে মনে হয়েছে অতীতে আম্পায়ারদের সেই পর্যায়ে যাওয়ার মত যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা ছিল না।
চরচা: কিন্তু সৈকত তো এই সিস্টেমের মধ্য থেকেই এলিট প্যানেলে গেছেন। এটা কি একান্তই তার ব্যক্তিগত সাফল্য?
টফেল: বলতে পারেন। ক্রিকেটারদের মত আম্পায়ারদের মধ্যেও সহজাত প্রতিভা বলে একটা ব্যাপার কিন্তু আছে। সৈকতের বিষয়টা তেমনই। তাছাড়া প্রতিনিয়ত নিজেকে সেরাদের কাতারে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ ছিল তার মাঝে। এটাই হয়তো তাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে দিয়েছে।
চরচা: আপনার সময়ে একটা বিপিএল হয়েছে। আপনি কাজ করেছিলেন ম্যাচ রেফারি হিসেবে। বিপিএলে আম্পায়ারিংয়ের মান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন?
টফেল: প্রথমেই বলে নেই, বিপিএলে ম্যাচ পরিচালনা করা অনেক কঠিন কাজ। এটা বাইরে থেকে হয়তো বোঝা যায় না। গ্যালারি ভর্তি দর্শক, বিশ্ব ক্রিকেটের বড় বড় নাম থাকে এখানে। তাই এখানে আম্পায়ারিং করতে হলেও যোগ্যতা চাই আপনার। সেদিক থেকে আমি যে বিপিএলটা দেখেছি, সেখানে গোটা আসরে বাংলাদেশের আম্পায়ার থেকে শুরু করে ম্যাচ অফিশিয়ালসরা দারুণ কাজ করেছে।
চরচা: তবে বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে আম্পায়ারদের পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়ার অভিযোগ তো পুরনো। নির্দিষ্ট দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া বা স্পষ্ট আউটকে নটআউট দেওয়ার ঘটনা হয়েছে। আপনার চোখে এমন কিছু পড়েছে?
টফেল: অভিযোগ তো অনেক থাকবেই, তবে আপনাকে এর সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ঘরোয়া অন্য যেসব প্রতিযোগিতার কথা বললেন, সত্যি বলতে আমি সেভাবে খেলা দেখার সুযোগ পাইনি। তবে আমি তেমন কিছু দেখিনি বা শুনিনি। আমি নিশ্চিত বিসিবি এই ব্যাপারে কঠোর অবস্থানেই থাকবে।
চরচা: সম্প্রতি বিসিবি বিপিএলের গত আসরে ফিক্সিং কাণ্ডে জড়িত কয়েকজনকে শাস্তি দিয়েছে। কোনো ম্যাচ দেখে আপনার কাছে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়েছিল?
টফেল: যদি না করি তাহলে মিথ্যা বলা হবে। কিছু ম্যাচের বোলিং, ক্যাচ মিস, ব্যাটসম্যানদের আউট হওয়ার ধরন এসব দেখে মনে খটকা লেগেছিল। তবে খেলাটির একজন সমর্থক হিসেবে আপনি সন্দেহকে সত্যি বলে ধরে নিতে পারেন না। কারণ এসব খুব গুরুতর অভিযোগ। শতভাগ প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কারও দিকে আঙুল তোলা যায় না।
আগেভাগেই সাইমন টফেলের সঙ্গে চুক্তির ইতি টেনেছে বিসিবি। ছবি: সংগৃহীত
চরচা: আধুনিক সময়ে ফিক্সিং কি সেভাবে প্রমাণ করা সম্ভব? নিয়মের মারপ্যাঁচের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আইনেরও ব্যাপার আছে।
টফেল: এখন তো ম্যাচ ফিক্সিং হয় না বললেই চলে। স্পট ফিক্সিংই হয়। আর এখানে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন। কিন্তু সেটা হলে প্রতিটি ডেলিভারিতেই কেউ না কেউ এমন কিছু খুঁজে পাবে। আমি মনে করি আইসিসি, বিসিবি সহ প্রতিটি দেশের বোর্ডই এই ক্ষেত্রে খুব ভালো কাজ করছে।
চরচা: ক্রিকেটে স্পট ফিক্সিং কি বন্ধ করা সম্ভব?
টফেল: একেবারে বন্ধ করা হয়তো সম্ভব হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরেও প্রতিটি দেশেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে এখন এত এত ম্যাচ হয়, যারা সুযোগ নেওয়ার তারা নেবেই।
চরচা: আইসিসি কি কঠোর শাস্তির বিধান করতে পারে না?
টফেল: এটা প্রতিটি দেশের বোর্ডের ব্যাপার। আইসিসির এখানে করার আছে সামান্যই। বাংলাদেশেও বিসিবি সেই কাজটাই করে। বোর্ডগুলো চাইলে কেবল এসব ব্যাপারে আরও কঠিন পদক্ষেপ নিতে পারে।
চরচা: একটু জানতে চাই আপনার আম্পায়ারিং ক্যারিয়ার নিয়ে। টানা পাঁচবার আইসিসির বর্ষসেরা আম্পায়ার হয়েছেন। একটা সময়ে আপনার নামটাই হয়ে গিয়েছিল আম্পায়ারিংয়ের সমার্থক। নিজেকে কখনো তারকা মনে হয়?
টফেল: আপনার এই প্রশ্ন শুনে মনে হল আমি আসলেই একজন তারকা (হাসি)। তবে না, আমি তারকা নই। সাকিব-তামিমরা তারকা। আমি যখন যে কাজটা করি, চেষ্টা করি সেখানে সেরাটা দেওয়ার। আম্পায়ারিং আমি উপভোগ করেছি। ব্যাস, এতটুকুই।
চরচা: বিশেষ কোনো ম্যাচ ছিল যেখানে আম্পায়ারিং করার আগে চাপ অনুভব করতেন?
টফেল: না। আর আমি মনে করি কোনো আম্পায়ারেরই সেটা হওয়া উচিত না। মানসিকভাবে আপনাকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। চাপে পড়ে গেলেই ভুল করার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আর একটা ভুল সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলই বদলে দিতে পারে।
চরচা: আম্পায়াররা মাঠের সেরা পজিশন থেকে ব্যাটিং বা বোলিং দেখার সুযোগ পান। রেকর্ড বা পরিসংখ্যান নয়, শুধুমাত্র কাছ থেকে দেখার বিবেচনায় আপনার চোখে দুজন সেরা বেঁছে নিতে বলা হলে কার নাম বলবেন?
টফেল: খুব কঠিন প্রশ্ন। ব্যাটিংয়ে আমি শচীন টেন্ডুলকারের নামই বলব। আমার কাছে মনে হয়, প্রতিপক্ষ দলও তার ব্যাটিং উপভোগ করত। আর বোলিংয়ে শেন ওয়ার্ন। প্রতিটি ডেলিভারিকেই একটা ইভেন্ট বানানোর অবিশ্বাস্য স্কিল ছিল তার।
চরচা: শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কেমন?
টফেল: উজ্জ্বল। সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। প্রয়োজন শুধু ধারাবাহিকতার। আমার বিশ্বাস, এই বোর্ড ক্রিকেট, ক্রিকেটার বা আম্পায়ার সবার উন্নতির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই করবে।