চরচা ডেস্ক

মস্কোর ‘হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্স’-এর গবেষণা অধ্যাপক দিমিত্রি ট্রেনিন তার একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি নিয়ে এক গভীর মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। আরটি ডট কমে লেখা এই নিবন্ধে তার মূল বক্তব্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ইরানের সাথে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি মূলত বিশ্বমঞ্চে মার্কিন একাধিপত্য ও ক্ষমতার এক বড় ধরনের পরাজয়কে নির্দেশ করে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত জুয়া বা হিসাব-নিকাশ যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আমেরিকার হাত থেকে কতটা দূরে সরে গেছে।
গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে ইরানের ওপর প্রথম আক্রমণ চালিয়েছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যে একটি কৌতুক প্রচলিত ছিল যে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান– সব পক্ষই জয়ী হয়েছে। কিন্তু এক বছর পরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রেনিনের মতে, এবারের এই দ্বিতীয় ইরান যুদ্ধে স্পষ্টত একজনই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, আর সে হলো ইরান। অন্যদিকে এই যুদ্ধ ও তার ফলাফলে আমেরিকা ও ইসরায়েলসহ একাধিক পক্ষ নিশ্চিতভাবে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
দিমিত্রি ট্রেনিন তার বিশ্লেষণে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এই যুদ্ধবিরতির অর্থ এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যুদ্ধের মূল ও জটিল সমস্যাগুলো ভবিষ্যতের আলোচনার টেবিলে সমাধানের জন্য তোলা রইল এবং সেই আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ফল দেবে বা যেকোনো চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংঘাতটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কোনো সাধারণ বিরোধ নয়। এটি আসলে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক লড়াইয়ের অংশ, যেখানে আমেরিকা তার ক্ষয়িষ্ণু বৈশ্বিক একাধিপত্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুনভাবে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক বৈশ্বিক ধারাকে উল্টে দিতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে ট্রেনিন একটি অলিখিত ‘বিশ্বযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার কয়েকটি প্রধান রণক্ষেত্র রয়েছে। এর একটি হলো পূর্ব ইউরোপ, যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে পরাজিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়টি হলো পূর্ব এশিয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনকে অবদমিত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ হলো এই মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে ওয়াশিংটন ইরানের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। এই বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার লড়াই এখনই থামছে না এবং একটি নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্য আসার আগে সামনে আরও বহু যুদ্ধ অনিবার্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মোড় হলো, ইরান এখন একটি অপরাজেয় ও শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। ওয়াশিংটন যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ‘পিষে ফেলতে’ ব্যর্থ হলো, তখনই তারা এই যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক সমঝোতার পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। আমেরিকার এই পিছুটানই প্রমাণ করে যে ইরানের মর্যাদা ও শক্তি আগের চেয়ে কতটা বেড়েছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ওয়াশিংটন বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখন আর তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো আওয়াজ তোলা হচ্ছে না।
ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত করা, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের (প্রক্সি নেটওয়ার্ক) সাথে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো যে মূল লক্ষ্যগুলো নিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েল মাঠে নেমেছিল, তার প্রতিটি ফ্রন্টে তারা চরমভাবে পরাস্ত হয়েছে। কোনো লক্ষ্যই অর্জিত না হওয়া মার্কিন আধিপত্যের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
সাময়িক দিক থেকে বিচার করলে, এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং সংকটের উপশম ঘটবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালির এই ঘটনাটি পুরো বিশ্বকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার এই রূপান্তরকালীন যুগে যেকোনো আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট যেকোনো সময় বৈরী শক্তির আগ্রাসনে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা প্রমাণিত হলো।

ইরানি নেতৃত্ব এই যুদ্ধ থেকে একটি বড় শিক্ষা লাভ করেছে। প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর যে ভীতি, তা তেহরানের জন্য যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় এবং কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। এই সফলতার পর তেহরান এখন ওমানের সাথে যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের বাণিজ্যিক ও নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রসঙ্গে ট্রেনিন উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সাথে যদি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তিও হয়, তবুও তেহরান তাদের পারমাণবিক গবেষণা ও কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে চালু রাখবেই। আর যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে ইরান আগের মতোই স্বাধীনভাবে এই কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাবে, কারণ তারা তাদের কষ্টার্জিত পারমাণবিক উপাদান বা প্রযুক্তি অন্য কোনো পক্ষের কাছে কখনোই হস্তান্তর করবে না। তবে পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের শিক্ষা কিছুটা মিশ্র।
একদিকে, উত্তর কোরিয়ার মতো উদাহরণ সামনে রেখে বলা যায়, ইরান যদি আগে থেকেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হতো, তবে হয়তো আমেরিকা বা ইসরায়েল তাদের ওপর সরাসরি আক্রমণ করার সাহস পেত না। অন্যদিকে, ইসরায়েল নিজে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও এবং ইরানের একের পর এক ব্যালেস্টিক মিসাইল ও ড্রোনের আঘাত সইবার পরও তেহরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা নাকচ করা হয়। ফলে, ইরানের জন্য পারমাণবিক বোমার চেয়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার প্রথাগত সামরিক ও ভৌগোলিক ক্ষমতাই বেশি ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে।
আমেরিকা এখন ইরানের জব্দকৃত অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়গুলোকে তেহরানের আচরণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত জয় না পেলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সহজে ছেড়ে দেবে না। ওয়াশিংটন হয়তো আশা করছে যে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হলে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে ঢেকে থাকা ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যকার ফাটলগুলো আবার প্রকাশ পাবে, যা পরবর্তীতে আমেরিকার জন্য অভ্যন্তরীণ কূটচাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
ইরানের জ্বালানি ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করার যে প্রস্তাব এসেছে, তা আসলে ইরানিদের পুনরায় পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার জালে ফিরিয়ে আনার একটি ফাঁদ মাত্র। এই কারণে ইরানের জন্য এই যুদ্ধকালীন বিজয়কে ধরে রাখতে হলে এমন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা রক্ষা করে এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায়।

তবে পুরো চুক্তির ক্ষেত্রে লেবানন পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের ‘ডিল-ব্রেকার’ হয়ে উঠতে পারে। তেহরান সফলভাবে ট্রাম্পকে এই চুক্তির মধ্যে লেবানন ফ্রন্টকেও অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি করিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার সামরিক অভিযানে অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর গোয়ার্তুমির প্রতি ট্রাম্পের ক্ষোভ প্রকাশ আসলে মার্কিন রাজনীতি ও সমাজের একটি বড় পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। আমেরিকার রাজনৈতিক মহলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং সাধারণ জনগণ এখন ইসরায়েলের ওপর থেকে তাদের ধৈর্য হারাচ্ছে এবং তাদের প্রতি সমর্থন ক্রমশ শীতল হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েল দিন দিন একঘরে হয়ে পড়ছে।
বাস্তবতা হলো, এই সামগ্রিক যুদ্ধে ইসরায়েলই সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, পশ্চিম তীর, সিরিয়া, ইরাক এবং সর্বোপরি ইরানের মতো সাতটি ভিন্ন ফ্রন্টে একযোগে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হুমকি নির্মূল করার যে নতুন ইসরায়েলি কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা দেশটিকে কোনো নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা দিতে পারছে না। বরং এটি তাদের একটি অন্তহীন ও চিরস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক সক্ষমতাও ইরানকে তাদের ভূখণ্ডে সরাসরি মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে ইসরায়েলকে একটি কঠিন সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে একদিকে নেতানিয়াহুর নীতির প্রতি তীব্র জনঅসন্তোষ এবং অন্যদিকে দেশটির অতি-ডানপন্থী উগ্র নীতিগুলোর প্রতি এক শ্রেণির অন্ধ সমর্থনের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা যাবে।
পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোর অবস্থানও এই যুদ্ধে ভালো যায়নি। নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে নিজেদের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার যে কৌশল তারা নিয়েছিল, তা এক বিপর্যয়কর চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই ঘাঁটিগুলো আরব দেশগুলোকে রক্ষা করার পরিবর্তে উল্টো ইরান ও তার মিত্রদের পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগের জন্য যে অত্যন্ত নিরাপদ ও আরামদায়ক জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই আন্তর্জাতিক ইমেজে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এই ধাক্কা সামলে উঠে যদি তারা আবার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে পেতে চায়, তবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মতো একজন ব্যর্থ ও অক্ষম রক্ষাকর্তার ওপর একক নির্ভরতা ছেড়ে দিয়ে একটি স্বাধীন, বাস্তবসম্মত এবং উন্নত আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি গড়ে তুলতে হবে।
দিমিত্রি ট্রেনিনের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েল জোটের এই যুদ্ধটি বিশ্বশক্তির রূপান্তরের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। বিশ্বের একসময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি ইসরায়েল– উভয়ে মিলেও সময়ের চাকা এবং ক্ষমতার এই পরিবর্তনকে রুখে দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তার প্রধান মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে স্পষ্টত হেরে গেছে। তবে ট্রেনিন সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পরাজয়ই বিশ্ব সংকটের শেষ নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র, যার রেশ ধরে আগামী দিনে আরও বড় ধরনের কৌশলগত সংঘাতের জন্ম হতে পারে।

মস্কোর ‘হায়ার স্কুল অব ইকোনমিক্স’-এর গবেষণা অধ্যাপক দিমিত্রি ট্রেনিন তার একটি বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈশ্বিক অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি নিয়ে এক গভীর মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। আরটি ডট কমে লেখা এই নিবন্ধে তার মূল বক্তব্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এবং ইরানের সাথে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি মূলত বিশ্বমঞ্চে মার্কিন একাধিপত্য ও ক্ষমতার এক বড় ধরনের পরাজয়কে নির্দেশ করে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত জুয়া বা হিসাব-নিকাশ যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দেয় যে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য এখন আমেরিকার হাত থেকে কতটা দূরে সরে গেছে।
গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে ইরানের ওপর প্রথম আক্রমণ চালিয়েছিল, তখন মধ্যপ্রাচ্যে একটি কৌতুক প্রচলিত ছিল যে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান– সব পক্ষই জয়ী হয়েছে। কিন্তু এক বছর পরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রেনিনের মতে, এবারের এই দ্বিতীয় ইরান যুদ্ধে স্পষ্টত একজনই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, আর সে হলো ইরান। অন্যদিকে এই যুদ্ধ ও তার ফলাফলে আমেরিকা ও ইসরায়েলসহ একাধিক পক্ষ নিশ্চিতভাবে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
দিমিত্রি ট্রেনিন তার বিশ্লেষণে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এই যুদ্ধবিরতির অর্থ এই নয় যে মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। যুদ্ধের মূল ও জটিল সমস্যাগুলো ভবিষ্যতের আলোচনার টেবিলে সমাধানের জন্য তোলা রইল এবং সেই আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক ফল দেবে বা যেকোনো চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে, তারও কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা নেই।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংঘাতটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক কোনো সাধারণ বিরোধ নয়। এটি আসলে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক লড়াইয়ের অংশ, যেখানে আমেরিকা তার ক্ষয়িষ্ণু বৈশ্বিক একাধিপত্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুনভাবে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক বৈশ্বিক ধারাকে উল্টে দিতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিকে ট্রেনিন একটি অলিখিত ‘বিশ্বযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার কয়েকটি প্রধান রণক্ষেত্র রয়েছে। এর একটি হলো পূর্ব ইউরোপ, যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে পরাজিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়টি হলো পূর্ব এশিয়া, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চীনকে অবদমিত ও নিয়ন্ত্রণে রাখার নীতি গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ হলো এই মধ্যপ্রাচ্য, যেখানে ওয়াশিংটন ইরানের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। এই বিশ্বব্যাপী ক্ষমতার লড়াই এখনই থামছে না এবং একটি নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্য আসার আগে সামনে আরও বহু যুদ্ধ অনিবার্য। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক মোড় হলো, ইরান এখন একটি অপরাজেয় ও শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। ওয়াশিংটন যখন সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানকে সম্পূর্ণভাবে ‘পিষে ফেলতে’ ব্যর্থ হলো, তখনই তারা এই যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক সমঝোতার পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছে। আমেরিকার এই পিছুটানই প্রমাণ করে যে ইরানের মর্যাদা ও শক্তি আগের চেয়ে কতটা বেড়েছে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ওয়াশিংটন বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এখন আর তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো আওয়াজ তোলা হচ্ছে না।
ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত করা, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা কিংবা আঞ্চলিক মিত্রদের (প্রক্সি নেটওয়ার্ক) সাথে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো যে মূল লক্ষ্যগুলো নিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েল মাঠে নেমেছিল, তার প্রতিটি ফ্রন্টে তারা চরমভাবে পরাস্ত হয়েছে। কোনো লক্ষ্যই অর্জিত না হওয়া মার্কিন আধিপত্যের জন্য একটি বড় ধাক্কা।
সাময়িক দিক থেকে বিচার করলে, এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং সংকটের উপশম ঘটবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালির এই ঘটনাটি পুরো বিশ্বকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার এই রূপান্তরকালীন যুগে যেকোনো আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট যেকোনো সময় বৈরী শক্তির আগ্রাসনে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা প্রমাণিত হলো।

ইরানি নেতৃত্ব এই যুদ্ধ থেকে একটি বড় শিক্ষা লাভ করেছে। প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে তাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর যে ভীতি, তা তেহরানের জন্য যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় এবং কার্যকর প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছে। এই সফলতার পর তেহরান এখন ওমানের সাথে যৌথভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের বাণিজ্যিক ও নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা করছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রসঙ্গে ট্রেনিন উল্লেখ করেছেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সাথে যদি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তিও হয়, তবুও তেহরান তাদের পারমাণবিক গবেষণা ও কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে চালু রাখবেই। আর যদি আলোচনা ব্যর্থ হয়, তবে ইরান আগের মতোই স্বাধীনভাবে এই কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাবে, কারণ তারা তাদের কষ্টার্জিত পারমাণবিক উপাদান বা প্রযুক্তি অন্য কোনো পক্ষের কাছে কখনোই হস্তান্তর করবে না। তবে পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই যুদ্ধের শিক্ষা কিছুটা মিশ্র।
একদিকে, উত্তর কোরিয়ার মতো উদাহরণ সামনে রেখে বলা যায়, ইরান যদি আগে থেকেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হতো, তবে হয়তো আমেরিকা বা ইসরায়েল তাদের ওপর সরাসরি আক্রমণ করার সাহস পেত না। অন্যদিকে, ইসরায়েল নিজে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও এবং ইরানের একের পর এক ব্যালেস্টিক মিসাইল ও ড্রোনের আঘাত সইবার পরও তেহরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই বিকল্প নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা নাকচ করা হয়। ফলে, ইরানের জন্য পারমাণবিক বোমার চেয়ে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার প্রথাগত সামরিক ও ভৌগোলিক ক্ষমতাই বেশি ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে।
আমেরিকা এখন ইরানের জব্দকৃত অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়গুলোকে তেহরানের আচরণ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত জয় না পেলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সহজে ছেড়ে দেবে না। ওয়াশিংটন হয়তো আশা করছে যে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হলে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাময়িকভাবে ঢেকে থাকা ইরানি সমাজের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এবং রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যকার ফাটলগুলো আবার প্রকাশ পাবে, যা পরবর্তীতে আমেরিকার জন্য অভ্যন্তরীণ কূটচাল দেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
ইরানের জ্বালানি ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করার যে প্রস্তাব এসেছে, তা আসলে ইরানিদের পুনরায় পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার জালে ফিরিয়ে আনার একটি ফাঁদ মাত্র। এই কারণে ইরানের জন্য এই যুদ্ধকালীন বিজয়কে ধরে রাখতে হলে এমন অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা রক্ষা করে এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায়।

তবে পুরো চুক্তির ক্ষেত্রে লেবানন পরিস্থিতি একটি বড় ধরনের ‘ডিল-ব্রেকার’ হয়ে উঠতে পারে। তেহরান সফলভাবে ট্রাম্পকে এই চুক্তির মধ্যে লেবানন ফ্রন্টকেও অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি করিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবাননে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার সামরিক অভিযানে অনড় অবস্থান নিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর গোয়ার্তুমির প্রতি ট্রাম্পের ক্ষোভ প্রকাশ আসলে মার্কিন রাজনীতি ও সমাজের একটি বড় পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে। আমেরিকার রাজনৈতিক মহলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং সাধারণ জনগণ এখন ইসরায়েলের ওপর থেকে তাদের ধৈর্য হারাচ্ছে এবং তাদের প্রতি সমর্থন ক্রমশ শীতল হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েল দিন দিন একঘরে হয়ে পড়ছে।
বাস্তবতা হলো, এই সামগ্রিক যুদ্ধে ইসরায়েলই সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ। গাজা, লেবানন, ইয়েমেন, পশ্চিম তীর, সিরিয়া, ইরাক এবং সর্বোপরি ইরানের মতো সাতটি ভিন্ন ফ্রন্টে একযোগে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হুমকি নির্মূল করার যে নতুন ইসরায়েলি কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা দেশটিকে কোনো নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা দিতে পারছে না। বরং এটি তাদের একটি অন্তহীন ও চিরস্থায়ী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক সক্ষমতাও ইরানকে তাদের ভূখণ্ডে সরাসরি মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে পারেনি। অদূর ভবিষ্যতে ইসরায়েলকে একটি কঠিন সাধারণ নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে একদিকে নেতানিয়াহুর নীতির প্রতি তীব্র জনঅসন্তোষ এবং অন্যদিকে দেশটির অতি-ডানপন্থী উগ্র নীতিগুলোর প্রতি এক শ্রেণির অন্ধ সমর্থনের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ দেখা যাবে।
পারস্য উপসাগরের আরব দেশগুলোর অবস্থানও এই যুদ্ধে ভালো যায়নি। নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে নিজেদের মাটিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করার যে কৌশল তারা নিয়েছিল, তা এক বিপর্যয়কর চুক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই ঘাঁটিগুলো আরব দেশগুলোকে রক্ষা করার পরিবর্তে উল্টো ইরান ও তার মিত্রদের পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলার প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল।
এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই উপসাগরীয় দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনিয়োগের জন্য যে অত্যন্ত নিরাপদ ও আরামদায়ক জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই আন্তর্জাতিক ইমেজে বড় ধরনের ধস নেমেছে। এই ধাক্কা সামলে উঠে যদি তারা আবার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে পেতে চায়, তবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের মতো একজন ব্যর্থ ও অক্ষম রক্ষাকর্তার ওপর একক নির্ভরতা ছেড়ে দিয়ে একটি স্বাধীন, বাস্তবসম্মত এবং উন্নত আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতি গড়ে তুলতে হবে।
দিমিত্রি ট্রেনিনের এই বিশ্লেষণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ইরান বনাম মার্কিন-ইসরায়েল জোটের এই যুদ্ধটি বিশ্বশক্তির রূপান্তরের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। বিশ্বের একসময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি ইসরায়েল– উভয়ে মিলেও সময়ের চাকা এবং ক্ষমতার এই পরিবর্তনকে রুখে দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তার প্রধান মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ে স্পষ্টত হেরে গেছে। তবে ট্রেনিন সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পরাজয়ই বিশ্ব সংকটের শেষ নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সূচনা মাত্র, যার রেশ ধরে আগামী দিনে আরও বড় ধরনের কৌশলগত সংঘাতের জন্ম হতে পারে।