ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের আর একদিন বাকি। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন কি না, বলা শক্ত। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট অচেনা হয়েও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। কে এই গাদি আইজেনকোট? কীভাবে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে এত ওপরে চলে এলেন?
গাদি আইজেনকোট একজন ‘মিজরাহি-মরোক্কান’ বংশোদ্ভূত, যাকে ‘আশকেনাজি অভিজাতরা’ নিয়ন্ত্রণ করছে। ইসরায়েলে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অসমতা চলে আসছে। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকোট মরক্কো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান। তিনি ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা (জেনারেল) হয়েছিলেন এবং দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর বাইরে–তিবেরিয়াস ও ইলাতে–বেড়ে উঠেছেন। জেরুজালেমের অভিজাত মহলে নেতানিয়াহুর বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তার জীবনের গল্পের আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স
আইজেনকোট নিজের জাতিগত পরিচয় নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না। বিশ্লেষকদের মতে, এটিই তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ানোর অন্যতম কারণ। এক বছর আগেও জনমত জরিপে তার সমর্থন ছিল ১০ শতাংশের নিচে; অথচ এখন তিনি ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে বিরোধী শিবিরের প্রধান প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ইসরায়েলে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি প্রধানমন্ত্রী হননি। আইজেনকোট যদি জয়ী হন, তবে সেটি হবে এক নতুন ইতিহাস।
আইজেনকোট জিততে কী লাগবে?
আইজেনকোট বিরোধীদের শক্তিশালী প্রার্থী হিসাবে চূড়ান্ত হওয়ার পথে আছেন। সাম্প্রতিক অধিকাংশ জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেসেট-এর ১২০টি আসনের মধ্যে আইজেনকোটের ‘ইয়াশার’ পার্টি ২০ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে, যা লিকুদ পার্টির সম্ভাব্য আসনের চেয়ে বেশি। এ ছাড়া, কে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত–এমন জরিপেও নেতানিয়াহুর চেয়ে এগিয়ে আছেন আইসেনকোট।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন লিখেছে, ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায়, আইজেনকোটের দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও প্রেসিডেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন না। বরং সরকার গঠনের দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়, যার পক্ষে জোট গড়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। আর এখানেই শুরু হয় আসল হিসাব-নিকাশ।
জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নেতানিয়াহুর জোট–যার মধ্যে কট্টর ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স দলগুলো অন্তর্ভুক্ত–অথবা নেতানিয়াহু-বিরোধী জোট, কোনোটিরই ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা নেই। রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টির জোরাল আশঙ্কা রয়েছে।
আইজেনকোটের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাব্য পথটি জড়িয়ে গেছে বাম, ডান ও মধ্যপন্থী দলগুলোর সঙ্গে। এমনকি কিছু পরিস্থিতিতে তা আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপরও নির্ভর করতে পারে! আইজেনকোট বলেছেন, ৬১টি আসন না থাকলেও তিনি সরকার গঠনের চেষ্টা করবেন। এর অর্থ হলো, তিনি এমন একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করছেন, যা বাইরে থেকে আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর টিকে থাকবে। তবে ডানপন্থী দলগুলো–যাদের তার জোটের অংশ হওয়া প্রয়োজন–তারা হয়তো এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
নেতানিয়াহুর চেয়ে আইজেনকোট কতটা আলাদা?
সাবেক সামরিক পরিকল্পনাবিদ আইজেনকোট চরিত্র, কর্মশৈলী এবং স্বভাবের দিক থেকে নেতানিয়াহুর চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার নির্বাচনী প্রচারের বিলবোর্ডগুলোতে তাকে তুলে ধরা হয়েছে ‘একজন যোদ্ধা, একজন নেতা এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধকারী’ হিসেবে। তার দলের নাম ‘ইয়াশার’ (হিব্রু ভাষায় যার অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সরাসরি’)। ৭ অক্টোবরের ঘটনায় জিম্মি হওয়া এলি শারাবির একটি উক্তি থেকে এই নামটি অনুপ্রাণিত–তিনি বলেছিলেন, “এটি ডানপন্থীও নয়, বামপন্থীও নয়; এটি হলো সোজা পথ।”
তার নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলো অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং জবাবদিহিতার ওপর কেন্দ্র করে। তিনি ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার ঘটনা তদন্তের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটির বিরোধিতা করে আসছেন নেতানিয়াহু। এছাড়া, তিনি সকল নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রস্তাব দিয়েছেন। অথচ বর্তমান জোট সরকার এমন কিছু দলের ওপর নির্ভরশীল, যারা অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের জন্য সামরিক সেবা থেকে পুরোপুরি অব্যাহতির দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে তিনি একজন কট্টরপন্থী (হক), যার অবস্থানের সাথে নেতানিয়াহুর অবস্থানের অনেক মিল রয়েছে। নেতানিয়াহুর প্রায় সব প্রতিদ্বন্দ্বীর মতোই, তিনি গাজা, লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতি মোটামুটি সমর্থন জানিয়েছেন। ইরানের ক্ষেত্রে, তিনি নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্যগুলোর সাথে একমত–অর্থাৎ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা এবং তেহরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ককে দুর্বল করা। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশলের অভাব নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে, সামরিক অর্জনের পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থাকা প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে তার নীতি কেমন হতে পারে?
আইজেনকোট নিরাপত্তা কাঠামোর পটভূমি থেকে এসেছেন। তার জোটসঙ্গীদের মধ্যে এমন কিছু ডানপন্থী দল থাকতে পারে, যারা ইসরায়েলের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন মেনে নিতে আগ্রহী নয়। গাজার ক্ষেত্রে, তিনি ১৮ মাসের মধ্যে হামাসের শাসনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন–হয় ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে, অথবা তার ভাষায় ‘সৃজনশীল’ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে।
বাস্তবিক অর্থে, নেতানিয়াহুর ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এর বড় মিল রয়েছে। তবে আইজেনকোটের যুক্তি হলো, “নেতানিয়াহু যতদিন ক্ষমতায় আছেন, হামাসও ততদিন ক্ষমতায় টিকে থাকবে।”
রাজনীতিতে আসার আগে আইজেনকোট সতর্ক করেছিলেন যে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত নিয়ন্ত্রণ একটি দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্র সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করে–যাকে তিনি “জায়নবাদী স্বপ্নের সমাপ্তি” বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে ৭ অক্টোবরের পর থেকে তিনি ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’-এর ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যারা এখনও এই সমাধানের পক্ষে কথা বলেন, তারা “বিভ্রান্ত” (বা অবাস্তব কল্পনায় বাস করছেন)। অথচ তিনি নিজে এর কোনো বিকল্প রূপরেখাও তুলে ধরেননি।
ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন হবে?
ট্রাম্প তার পছন্দ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে “পূর্ণ ও সর্বাত্মক সমর্থন” জানিয়েছেন এবং তাকে একজন “মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে তিনি হবেন “ভুল নেতা”। যার অর্থ দাঁড়ায়, সেক্ষেত্রে ইরানকে মোকাবিলা করার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকেই এককভাবে নিতে হবে।
ইসরায়েলি সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আইজেনকোট এবং অন্যান্য বিরোধী দলীয় নেতারা রিপাবলিকান দলের বড় দাতা মিরিয়াম অ্যাডেলসনসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে হোয়াইট হাউসকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যেন তারা এই নির্বাচনী লড়াই থেকে দূরে থাকে। তবে তাতে কোনো কাজ হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক রাভিদ যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করতে পারবেন কি না, তখন ট্রাম্প উত্তরে বলেন: “হয়তো পারব, আবার হয়তো পারব না—কে আর এই ঝুঁকি নিতে চায়!”