ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের প্রায় সাত মাস পেরিয়েছে। সামনে মার্কিন মিডটার্ম ইলেকশন। এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পারমাণবিক বোমার বাইরে সবচেয়ে শক্তিশালী বোমা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে তারা।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতে পারে।
স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না। তবে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট’ (সংক্ষেপে এমওএবি) অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
নিউজম্যাক্সকে ট্রাম্প বলেন, “আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। এর প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।”
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছিল। তবে সংঘাতের সাত মাস পরে এসে প্রথমবারের মতো ট্রাম্প স্পষ্ট করলেন, ইরানে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন না।
তবে তার এই বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যুদ্ধের আরেকটি পর্যায় শিগগিরই শুরু হতে পারে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এমনটা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প আসলে কী বলেছেন?
ট্রাম্প নিউজম্যাক্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। বিশেষ করে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ এলাকায় হামলার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, তেহরান সেখানে গ্রানাইট পাথরের অনেক গভীরে একটি পারমাণবিক স্থাপনা লুকিয়ে রেখেছে।
তবে ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র কিংবা ছোট আকারের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত বোমাটি ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, বোমাটি পারমাণবিক নয়। তবে ইরানে এই বোমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, শিগগিরই ইরানে আবারও হামলা চালানো হতে পারে। তার ভাষ্য, এখনই যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব নয়। কারণ, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে দেশটি সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যবহার করত বলে মনে করেন তিনি। আবার এও বলেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ কিংবা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে খুব শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে। এরপর তেলের দামও কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
ইরানে স্থলসেনা পাঠানো হবে কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, “না, আমার তেমনটা মনে হচ্ছে না। এর কোনো প্রয়োজন আমি দেখছি না।
”যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প ইরানে সেনা পাঠানোর বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে সেখানে স্থলযুদ্ধে অংশ নিলে মার্কিন সেনাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
মাদার অব অল বোম্বস কতটা শক্তিশালী?
আল জাজিরা জানিয়েছে, মাদার অব অল বোম্বস নামে পরিচিত বোমাটির আনুষ্ঠানিক নাম এমওএবি। এতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি বা সাড়ে আট টন বিস্ফোরক থাকে।
বোমাটির মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি বা প্রায় ১০ টন। অর্থাৎ, ওজনের দিক থেকে এটি চারটি গাড়ির সমান। এর দৈর্ঘ্য ৯ মিটারের কিছু বেশি।
আকারে বড় হওয়ায় স্টেলথ বোমারু বিমান দিয়ে এটি বহন করা যায় না। এর পরিবর্তে লকহিড সি-১৩০ হারকিউলিসের মতো বড় পরিবহন বিমান দিয়ে বোমাটি বহন করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, বোমাটি মাটি থেকে কয়েক মিটার ওপরে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য তৈরি। বিস্ফোরণের ফলে প্রচণ্ড আগুনের গোলার সৃষ্টি হয়। এতে প্রায় এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা ভবন ও শক্ত কাঠামো ধ্বংস হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার সময় এই বোমার বিস্ফোরণে তৈরি মাশরুম আকৃতির ধোঁয়ার মেঘ ৩২ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এগলিন বিমানঘাঁটিতে পরীক্ষার সময় বিস্ফোরিত হচ্ছে জিবিইউ-৪৩/বি, যা ‘মাদার অব অল বম্বস’ (এমওএবি) নামে পরিচিত। ছবি: রয়টার্স
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও অস্ত্রবিশেষজ্ঞ এলিয়াস ম্যাগনিয়ার আল জাজিরাকে বলেন, “বোমাটির বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক খোলা জায়গায় থাকা মানুষ, সামরিক সরঞ্জাম এবং দুর্বল কাঠামোর ওপর ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো একটি বিস্তৃত এলাকায় অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করা।”
তবে ইরানের মাটির অনেক গভীরে থাকা পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে এত বড় বোমা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলে জানান ম্যাগনিয়ার। তার মতে, ইরানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে বড় পরিবহন বিমানের চলাচলও কঠিন হতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আগে কী বলেছিলেন ট্রাম্প?
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশ কয়েকবার পারমাণবিক অস্ত্রের আলোচনা সামনে এলেও ট্রাম্প কখনো স্পষ্টভাবে বলেননি যে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন। আবার এর ব্যবহার পুরোপুরি নাকচও করেননি।
গত এপ্রিলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে অবরোধ আরোপের পর ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ইরান যদি শান্তিচুক্তিতে রাজি না হয় এবং প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে ওই রাতের ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংস করার হুমকি দেন।
এ ছাড়া ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করারও হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, ইরানে এমনভাবে বোমা হামলা চালানো হবে, যাতে একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা তার এসব বক্তব্যকে পারমাণবিক হামলার হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন। তবে এসব হুমকির পরও ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্য কিছুটা কমে আসে। তবে গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি আবারও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে কী হতে পারে?
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বলছে, ট্রাম্প মাদার অব অল বোম্বস ব্যবহার করার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। এ কারণে বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আবারও ব্যাপক বোমা হামলা চালাতে পারে। এমনকি এটি যুদ্ধের শেষ বড় হামলাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন এলাকায় থাকা পারমাণবিক স্থাপনা বিশেষ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে পারাপার করানোর উদ্যোগও নিতে পারে দেশটি।
অন্যদিকে, ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা আরও বাড়ালে তারা পাল্টা আঘাত হানবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল অবকাঠামো ও ডিজিটাল অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এগলিন এয়ার ফোর্স আর্মামেন্ট সেন্টারে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) বোমা। ছবি: রয়টার্স
ইরানের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান শুরু করলে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাতে পারে। তবে ট্রাম্প আপাতত স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
আল জাজিরা বলছে, যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র স্থলসেনা পাঠাতে পারে। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের দাবি, ইরান এই ইউরেনিয়াম ভূগর্ভে লুকিয়ে রেখেছে।
এ ছাড়া গত মার্চে ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করা কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপের খবর প্রকাশিত হয়। এরপর ধারণা করা হয়েছিল, ইরানে স্থল অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ওই গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি।