দক্ষিণ লেবানন, উত্তর ইসরায়েল, গাজা কিংবা কুয়েত- মানচিত্রের নামগুলো ভিন্ন হলেও চলতি সপ্তাহে তাদের ভাগ্যটা একই সুতোয় গাঁথা ছিল। আর তা হলো আকাশ থেকে ধেয়ে আসা অবিরাম বোমাবর্ষণ আর সাইরেনের আর্তনাদ। অথচ কাগজে-কলমে এই প্রতিটি অঞ্চলেই আমেরিকার মধ্যস্থতায় তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর থাকার কথা!
বাস্তবতা হলো, গাজা ও লেবাননে এখনো সক্রিয়ভাবে মোতায়েন রয়েছে ইসরায়েলি সেনা, চলছে বিমান হামলা। জবাবে উত্তর ইসরায়েলে আছড়ে পড়ছে হিজবুল্লাহর রকেট। আর ওদিকে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হেনেছে ইরান। যুদ্ধবিরতির এই নির্মম পরিস্থিতি দেখে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই মন্তব্য করে বসেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি মানে যুদ্ধ পুরোপুরি থামা নয়, বরং আরেকটু পরিমিতভাবে একে অপরকে গুলি করা! ট্রাম্প প্রশাসনের সমঝোতায় হওয়া তিনটি যুদ্ধবিরতির লক্ষ্য ছিল রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের অবসান ঘটানো, কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে অন্য কথা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বড় আকারের মুখোমুখি যুদ্ধ কিছুটা কমলেও, এখনো আকাশ থেকে গোলা বারুদ ঝরছে, প্রতিনিয়ত মরছে সাধারণ মানুষ।
এবার একটু পেছনে ফিরে দেখা যাক কীভাবে শুরু হয়েছিল এই শান্তি প্রক্রিয়া, আর কোথায় গিয়েই বা তা আটকে গেল?
গত বছরের ১০ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধের আপাত অবসান ঘটেছিল। চুক্তির শর্ত ছিল- সব ধরনের লড়াই বন্ধ হবে, হামাস তাদের কাছে থাকা বাকি সব জিম্মিকে মুক্তি দেবে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বন্দিদের ছাড়বে, পর্যায়ক্রমে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং মিশরের সীমান্ত খুলে দিয়ে গাজায় ত্রাণের পরিমাণ বহুগুণ বাড়ানো হবে।
পরবর্তীতে ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতিকে আরও স্থায়ী রূপ দিতে একটি বড় পরিকল্পনা করেন। যেখানে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, হামাসমুক্ত নতুন গাজা সরকার গঠন, গাজার পুনর্গঠন এবং ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ছবি: রয়টার্সকিন্তু খাতা-কলমের সেই হিসাব বাস্তবে রূপ নেয়নি। হামাস সব জিম্মিকে মুক্তি দিলেও গাজায় ত্রাণের পরিমাণ তেমন একটা বাড়েনি। হামাস অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, গাজা পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয়নি। উল্টো ইসরায়েল এই উপত্যকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৯০০-র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে গত বৃহস্পতিবারও প্রাণ গেছে ৯ জনের। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের বিক্ষিপ্ত পাল্টা হামলায় গাজায় চার ইসরায়েলি সেনার মৃত্যু হয়েছে।
লেবাননের গল্পটাও প্রায় একই। ২০২৪ সালের লড়াইয়ের পর ইসরায়েল ও ইরানের সমর্থনপুষ্ট হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধবিরতিটি কেবল আংশিকভাবে কার্যকর হয়েছিল, যেখানে দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে। এরপর গত মার্চ মাসে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে লেবানন সীমান্ত আবারও অশান্ত হয়ে ওঠে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে, আর ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের বিশাল অংশ দখল করে নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিমান হামলা চালায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ১৬ এপ্রিল ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে এক বিরল আলোচনার পর ১০ দিনের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন ট্রাম্প। এই সময়ে বৈরুতে বড় কোনো হামলা না হলেও দক্ষিণ লেবাননে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ঠিকই চলেছে। লেবানন কর্তৃপক্ষের হিসাব মতে, গত ২ মার্চের পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়েছে । অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, মার্চের পর থেকে হিজবুল্লাহর হামলায় তাদের ২৬ জন সেনা এবং ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
ইরান অবশ্য পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে তাদের চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার যেকোনো চুক্তিতে লেবাননের যুদ্ধবিরতিকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহ পিছু হটলে নতুন একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে ইসরায়েল ও লেবানন সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও তারা সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে পারবে। আর হিজবুল্লাহ তো এই চুক্তি সরাসরি প্রত্যাখ্যানই করেছে। ফলে মাঠের লড়াই থামার কোনো লক্ষণ নেই।
ছবি: এআইএই পুরো সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু আসলে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যে দেশটির ওপর যৌথ হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। দুই দেশেরই আশা ছিল, এর মাধ্যমে হয়তো ইরানের বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। এর আগে গত বছর এক ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও আমেরিকা ইরানের বহু পারমাণবিক স্থাপনা ও সামরিক নেতাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল।
ইরানের শীর্ষস্থানীয় বহু নেতা নিহত হওয়া সত্ত্বেও তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি রপ্তানি স্থবির হয়ে পড়েছে, যা বড় ধাক্কা দিয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিলের শুরুতে ইরানের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে আমেরিকা। কথা ছিল এরপর পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানি বন্দরের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা হবে। কিন্তু দফায় দফায় আলোচনার পরও কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। কারণ যেকোনো চুক্তিতেই পারমাণবিক ইস্যুটিকে পরের ধাপের জন্য তুলে রাখার কথা বলা হচ্ছে। আর এই অচলাবস্থার মাঝেই চলতি সপ্তাহে কুয়েতসহ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে ইরান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকার করা তিনটি শান্তি ব্যবস্থাপনাই আসলে প্রথম ধাপেই হোঁচট খেয়েছে। কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনাই স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দিকে এগোতে পারছে না। এর মূল কারণ, প্রথম ধাপের জটিলতা কাটিয়ে ওঠার জন্য যে ধরনের বড় বা কঠিন ছাড় দিতে হয়, যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কেউই তা মেনে নিতে রাজি নয়।
বরং চুক্তির টেবিলে বসার সময় বাধ্য হয়ে যে লক্ষ্যগুলো তারা ত্যাগ করেছিল, যুদ্ধবিরতির ফাঁকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তারা এখন সেই লক্ষ্যগুলোই পূরণ করতে চাইছে। সহজ কথায়, প্রত্যেকেই এখন পরখ করে দেখছে যে যুদ্ধবিরতির সীমারেখাটা ঠিক কতদূর পর্যন্ত ভাঙা সম্ভব! আর এই ক্ষমতার লড়াইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি অধরাই রয়ে গেছে।