চলতি মাসে রাজধানী নয়াদিল্লীতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে ভারত। সম্মেলনে অনুপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভারত সরকার বলেছে, তারেক রহমানকে দুটি আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল। একটি ছিল বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের একটি বিশেষ বৈঠকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ। অন্যটি ছিল ভারত সফরের জন্য দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণ।
আমন্ত্রণ, নাকি অবজ্ঞা?
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের (ডিডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা এই আমন্ত্রণকে ‘অবজ্ঞা’ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে মূল ব্রিকস সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাকে শুধু বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এমন করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও, আগের ব্রিকস সম্মেলনগুলোতে তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
এ ঘটনাটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের আরেকটি উদাহরণ। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে যান। পরে গত বছর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার অনুপস্থিতিতে বিচারের মাধ্যমে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। দেশে এনে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
ডয়েচে ভেলে বলছে, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছায়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ বেড়েছে।
পুশ-ইন করা বেশিরভাগই মুসলিম ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহামনের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছুটা ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়। জুনে ভারত আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করে। একই সময়ে ঢাকায় নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেয় ভারত।
তবে নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে আলোচনা হলেও, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এখনো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অজয় বিসারিয়া ডয়চে ভেলেকে বলেন, বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তিনি বলেন, “শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, বিশ্বের অন্যান্য নেতার সঙ্গেও যোগাযোগের সুযোগ ছিল। তবে এই ঘাটতি সহজেই পূরণ করা সম্ভব।”
ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কি আগের মতো নেই?
অজয়ের মতে, ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশকেই সামলাতে হবে। চলতি বছরের শেষ দিকে দুই দেশের মধ্যে একটি ইতিবাচক বৈঠক হলে সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশি সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির ডয়েচে ভেলেকে বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দুই দেশের সম্পর্ক নেই এখন আর আগের মতো নেই। তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের আগে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল একতরফা। এখন ঢাকা ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক চায়। সেখানে মর্যাদা ও সমতা থাকতে হবে।”
হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে। তবে তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য নয়াদিল্লিকে একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এর মধ্যে শেখ হাসিনাকে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত রাখা এবং তার বিরুদ্ধে দেওয়া আদালতের রায়কে স্বীকার করার বিষয়টিও রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাফর সোবহান ডয়চে ভেলেকে বলেন, এখন থেকে বাংলাদেশ সমতার ভিত্তিতেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়। তিনি বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক ভালো করবে। কিন্তু দুই দেশেরই কঠোর অবস্থান নেওয়া পক্ষগুলোর কারণে সেই সুযোগ সীমিত হয়ে গেছে।
সোবহান বলেন, বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আবার আস্থা তৈরি করতে ভারতের সবচেয়ে ভালো পদক্ষেপ হবে শেখ হাসিনাকে ‘উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ না দেওয়া’
তবে কেউ কেউ তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার বিষয়টিকে আরও কঠোরভাবে দেখছেন।
কৌশলগত গবেষণাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান মন্ত্রায়া ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা শান্তি মারিয়েট ডি’ সুজা এটিকে ‘স্পষ্ট অবজ্ঞা’ বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও ঢাকা আমন্ত্রণ নিয়ে কিছু প্রক্রিয়াগত সমস্যার কথা জানিয়েছে। তার মতে, বিষয়টিকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে অমীমাংসিত পরিস্থিতি, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে থেমে থাকা আলোচনা এবং চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা সম্পর্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
ডি’ সুজা ডয়চে ভেলেকে বলেন, চীনের বাড়তে থাকা আগ্রহ এবং ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণে বিএনপি স্পষ্টভাবেই বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় করার পথে এগোচ্ছে। তার মতে, এটি ভারত থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার চেষ্টা নয় বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা।
তবে ভারতের জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞ শ্রীধারা দত্ত বিষয়টিকে কিছুটা সতর্কভাবে দেখছেন। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, বাংলাদেশের জন্য ভারত সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হয়ে থাকবে। তবে ঢাকাকে খুব বেশি প্রভাবিত করার মতো অবস্থানে নেই নয়াদিল্লী।
শ্রীরাধা বলেন, দুই প্রতিবেশী এক অপরের থেকে সরে যাচ্ছে, এমনটা বলার সময় এখনই এসেছে বলে মনে করেন না তিনি। বরং দিল্লি ও ঢাকা দুপক্ষই একে অপরের দিকে সতর্কভাবে এগোচ্ছে বলে মত তার।
চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে যোগ দেওয়ার পর গত এক দশকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়িয়েছে বেইজিং। বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই চীনের উপস্থিতি রয়েছে।
বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের অন্যতম বড় সরবরাহকারী।
জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে চীনে যান তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের তিস্তা প্রকল্পেও চীন সমর্থনের কথা জানিয়েছে। এই অবকাঠামো প্রকল্পের লক্ষ্য হলো তিস্তা নদীর পানি নিয়ন্ত্রণ, বন্যা কমানো এবং পানির সরবরাহ উন্নত করা।
তিস্তা নদী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। বহু বছর ধরে আলোচনা চললেও বাংলাদেশ ও ভারত তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে কোনো চুক্তি করতে পারেনি।
জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে চীনে যান তারেক রহমান। সেখানে তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে বিভিন্ন চুক্তি করেন।
মন্ত্রায়া ইনস্টিটিউটের ডি’ সুজা বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি মাঝারি আকারের দেশের জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা স্বাভাবিক। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে ঢাকা আরও বেশি চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে।
ডি’ সুজার পরামর্শ, নয়াদিল্লির উচিত দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্কের বিষয়গুলোকে হাসিনা ইস্যু থেকে আলাদা রাখা। একই সঙ্গে পানি, বাণিজ্য ও যোগাযোগ নিয়ে তারেক রহমানকে বাস্তব ও নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া। সেই সঙ্গে শিলিগুড়ি করিডোর ও বঙ্গোপসাগরের কাছে চীনের সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে নিজেদের কঠোর অবস্থান ধরে রাখা।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক গবেষক শাহাব এনাম খানের মতে, সম্পর্ক উন্নত করা শুধু বাংলাদেশের স্বার্থেই প্রয়োজন–বিষয়টি এমন নয়। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, “এই সম্পর্ক নিয়ে যদি কারো চিন্তা করার কারণ থাকে, তাহলে সেটা নয়াদিল্লির।” তিনি এর কারণ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ভারতের উদ্বৃত্ত এবং নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের সহযোগিতার ওপর ভারতের নির্ভরতার কথা উল্লেখ করেন।
তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে প্রতিবেশী দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে না দেখে, নিজেদের ঘনিষ্ঠ একজনকে হারানো হিসেবে দেখেছে ভারত। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখা, স্থলবন্দর বন্ধ করা এবং হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়গুলোর প্রসঙ্গ টানেন।
শাহাব খানের মতে, দুই দেশের মধ্যে আবার আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে দিল্লিতে হাসিনার দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে, দুই দেশের বিরোধগুলো সমাধান করতে হবে এবং ২০২৪ সালের পর আরোপ করা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে।
ভারতের হাতে এখনো যা আছে
ডয়চে ভেলে বলছে, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ-ভারত সহজে আলাদা হতে পারে না। দুই দেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। বাণিজ্যপথ, পণ্য পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, চিকিৎসার জন্য যাতায়াত এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো ভারতের ওপর নির্ভরশীল। দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদীও রয়েছে।
তবে এসব নির্ভরতাই আবার দুই দেশের মধ্যে বিরোধের কারণ হতে পারে। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধের এখনো মীমাংসা হয়নি। এছাড়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে পুশ-ইনের অভিযোগও দুই দেশের সম্পর্কের একটি বড় সমস্যা।
অজয় বিসারিয়ার মতে, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশের কিছুটা ভারসাম্য রাখা স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ভারত বিষয়টি মেনে নিতে পারে, যেমনটি তারা তাদের অন্য প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রেও মেনে নেয়।
তাহলে আসল প্রশ্ন হয়তো এটা নয় যে, ভারত পুরোপুরি বাংলাদেশকে হারাচ্ছে কি না। বরং প্রশ্ন হলো, ক্রমেই বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত আগের মতো একতরফাভাবে নিজের শর্তে চাপিয়ে দিতে পারবে কি না।