শনিবার সকালে যন্তর মন্তরের কাছে অবস্থিত ঔপনিবেশিক আমলের চত্বর ‘কনট প্লেস’-এর আশেপাশের রাস্তাগুলো পুলিশের কঠোর ব্যারিকেডে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে; পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসা বিভিন্ন দলের বিক্ষোভকারীদের পুলিশ আটক করতে শুরু করেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারা ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন—তা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জেরে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে সোচ্চার প্রভাবশালী ‘জেন-জি’ আন্দোলন এবং ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকরাই এখানে সমবেত হয়েছেন।
আপাতত মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার শহরটিকে একটি দুর্গে পরিণত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং রাস্তায় প্রায় ৪৩ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে। অথচ এই সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় থাকার ২৫ বছর মহাসমারহে পালন করেছে বিজেপি।
নরেন্দ্র মোদি ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। অর্থাৎ গত ২৫ বছরে তাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে যেতে হয়নি।
‘ককরোচ মুভমেন্ট’-এর দাবি, মোদি সরকার দমন-পীড়ন জোরদার করায় সারা দেশে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও, বিক্ষোভকারীরা অবিচল এবং তারা বারবার রাজপথে ফিরে আসার অঙ্গীকার করেছে।
ভারতের রাজধানীতে বর্তমানে বলবৎ বিধিনিষেধ এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে দমন-পীড়নের ঘটনা ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে; সে সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত করেছিলেন, সংবাদমাধ্যমের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কারারুদ্ধ করেছিলেন।
বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর জাতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা মোদি সরকারকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সাথে তুলনা করেছেন—যে শক্তি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনের ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিল। তিনি সাধারণ মানুষকে এই প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে কনট প্লেসের বাইরের দিকের রাস্তায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ২৯ বছর বয়সী সন্তোষ কুমার আল-জাজিরাকে বলেন, পুলিশি ব্যারিকেডের কাছে কিশোর-তরুণদের আটক হতে দেখে তিনি হতাশ বোধ করছেন। “এই ছেলেমেয়েদের আপনারা কীভাবে আটকাবেন? তারা ১০ জনকে আটক করছে তো আরও ৫০ জন এগিয়ে আসছে। স্বৈরাচারী মোদির সময় শেষ হয়ে এসেছে: ২০২৯ সাল (পরবর্তী নির্বাচনের সময়) পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় টিকতে পারবেন না।” ওই দেশগুলোতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “এখনই সময় দিল্লিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো করে গড়ে তোলার—তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশটাকে ফিরিয়ে আনার।”
গুরুগ্রামের বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী প্রকৌশলী সমীর ইরশাদ কনট প্লেসের কাছে পুলিশি ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে যান; এ সময় তিনি হুইলচেয়ারে করে তার ৫৭ বছর বয়সী মা শিবা আবদিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আবদি বলেন, “দিল্লিতে এমন দমন-পীড়ন আগে কখনো দেখা যায়নি, যেখানে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারছি না। সরকার কেন এই এলাকাটিকে দুর্গে পরিণত করেছে? আমার মতো নাগরিকদের দেখে তারা কেন এত ভীত?”
এসবের মধ্যে এই সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় থাকার ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে বিজেপি। মোদির শুরুটা হয়েছিল গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে (যেখানে তিনি ২০০২ সালের কুখ্যাত মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গার সময় দায়িত্বে ছিলেন) এবং পরবর্তীতে ২০১৪ সাল থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তবে বিশ্লেষক ও ভারতীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্ষমতায় থাকাকালীন মোদিকে এর আগে কখনোই এতটা দুর্বল মনে হয়নি।
গত জুলাই মাসে ‘ককরোচ’-এর নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভ নয়াদিল্লির প্রধান সড়কগুলোকে অচল করে দিয়েছিল এবং মোদির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল।
নরেন্দ্র মোদির জীবনীকার নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, এবার বিক্ষোভকারীরা যাতে মধ্য নয়াদিল্লিতে কোনোভাবেই অবস্থান নিতে না পারে, সেজন্য মোদি আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। কারণ তিনি এমন একজন নেতার ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চান যিনি কখনোই জনচাপের কাছে নতি স্বীকার করেন না এবং যিনি অপরাজেয়। তিনি আল জাজিরাকে আরও বলেন, “জনমতের বিচারে মোদি এখন (তার রাজনৈতিক জীবনের) সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছেন। বিষয়টি অত্যন্ত স্ববিরোধিতাপূর্ণ; কারণ দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্রের বড় একটি অংশ এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অঙ্গ তার কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তার নির্দেশেই কাজ করছে।”
নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় আরও বলেন, ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভের মুখে মোদি দ্রুতই সেই নেতার ভাবমূর্তি হারাচ্ছেন—যিনি জনগণকে জীবিকার সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখান।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী ও অধিকারকর্মী প্রশান্ত ভূষণ আল জাজিরাকে বলেন, “মোদি সরকারকে জনগণের কাছে বেশ ভীত বলে মনে হচ্ছে।” তিনি বলেন, “ভারতের মানুষ এখন জেগে উঠছে এবং জবাব দাবি করছে। আর সরকার যখন ভীত হয়ে পড়ে, তখন ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা কঠোর ও দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু দমন-পীড়ন যতই বাড়বে, ততই আরও বেশি মানুষ জেগে উঠবে।”