ভারতে গণ-আন্দোলন প্রায়শই রাষ্ট্রের সাথে সংঘাতের মুখে পড়েছে। কিন্তু ১০ অক্টোবর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) বিক্ষোভ এবং বিরোধী দলগুলোর অব্যাহত প্রতিবাদ এক অভূতপূর্ব অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। সিজেপি পরীক্ষা আয়োজন এবং এসআইআর পরিচালনা—জনগণের ক্ষোভের এই দুটি উৎসকে একত্রিত করে জন-আস্থার এক গভীর সংকটে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। কেবল নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই আস্থার সংকট নিরসন সম্ভব নয়। আস্থার এই সংকট কেবল সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন নির্বাচন কমিশন এবং এমনকি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গ্রাস করেছে। গণতন্ত্রের মৌলিক নিয়মকানুন রক্ষায় আদালতের ব্যর্থতারই একটি ফলাফল হলো এই বিক্ষোভ।
সুপ্রিম কোর্ট চাইলে এসআইআর পরিচালনা এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পদ্ধতি বিষয়ক তাদের আগের রায়গুলো পুনর্বিবেচনা বা পরিবর্তন করে এই সংকটের তীব্রতা কমাতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তন হবে নজিরবিহীন; তবে তা ঘটার সম্ভাবনা কম। কারণ, এমন পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশন ও সরকারের জন্য এক কঠোর ভর্ৎসনা বা অভিযোগ হিসেবে গণ্য হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদত্যাগের মাধ্যমেই কেবল এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, সুপ্রিম কোর্ট কোনো সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিলেও সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর ও নীতি-আদর্শ-ভিত্তিক অবস্থান নিতে অনিচ্ছুক থাকে। তাই বড়জোর কিছু সাময়িক ও আংশিক পদক্ষেপের আশা করা যেতে পারে। এতে হয়তো কার্যক্রম কোনোমতে চলতে থাকবে, কিন্তু আস্থার যে মূল সংকট রয়েছে, তার কোনো সুরাহা হবে না।
প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো সরকারের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ণ করেছে, ভয়ের পরিবেশ দূর করেছে এবং তরুণ নাগরিকদের উজ্জীবিত করেছে। কিন্তু এসব আন্দোলন এক অনড় রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। নরসিমা রাও বলতেন, ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা অনেকটা হাতির মতো; কোনো সমস্যা দূর না হওয়া পর্যন্ত এটি তার বিপুল ভার দিয়ে সমস্যাটির ওপর দীর্ঘ সময় বসে থাকতে পারে। ভিন্নমত দমনে ও নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র সেই ভারই প্রয়োগ করবে—যেমন ধরপাকড়, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও রাজধানীজুড়ে হাজার হাজার নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা; যেন রাষ্ট্র কোনো বিদেশি আগ্রাসী বাহিনীর মোকাবিলা করছে। অথচ বাস্তবে তারা যৌক্তিক ও প্রথাগত কাঠামোর বাইরের কোনো বৈপ্লবিক নয়—এমন দাবি নিয়ে আসা তরুণদেরই মোকাবিলা করছে। প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো এখন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে। সরকার এই বিষয়টির ওপর ভরসা করছে যে, একটানা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তাকর্মীরা বিক্ষোভকারীদের আটক করছেন। ছবি: রয়টার্স
কৃষকদের আন্দোলনটি সরকারকে কৃষি সংস্কার বিল প্রত্যাহারে বাধ্য করতে সফল হয়েছিল মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, এটি ছিল একটি নীতিগত পদক্ষেপ, কোনো সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংকট নয়। দ্বিতীয়ত, কৃষকরা দিল্লির সীমান্তে অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির মতো পরিস্থিতি আংশিকভাবে সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন এবং বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আর সবশেষে, আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে তার নির্বাচনী প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন ছিল। অর্থাৎ, ওই আন্দোলনের হাতে প্রকৃত দরকষাকষির ক্ষমতা ছিল।
এক্ষেত্রে তিনটি শর্তই ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করছে। সিজেপির প্রধান শক্তি হলো, তাদের দাবির যৌক্তিকতা এবং একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তরুণদের প্রচেষ্টা। এখানে বিভিন্ন পক্ষ ও রাজনৈতিক দল—যেমন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘আইসা’-নিজ নিজ অবস্থান থেকে কথা বলছে। এক দিক থেকে এটি একটি সুবিধাজনক বিষয়। এটি এমন একটি বার্তা দেয় যে, এটি কোনো দলীয় লড়াই নয়, বরং আস্থার এক সামগ্রিক সংকট, যা সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে অনুভব করছে। সিজেপি তাদের সমালোচনায় কঠোর হলেও সর্বদা অহিংস ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখেছে। কোনো সড়ক অবরোধ বা মহাসড়ক বন্ধ করার মতো ঘটনা তারা ঘটায়নি। বরং সরকারই সমাবেশের অধিকারের জন্য উপযুক্ত সুযোগ না দিয়ে কার্যত এক ধরনের অবরোধ পরিস্থিতি তৈরি করছে। কেবল আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণই সিজেপির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। যারা এসব বিষয় নিয়ে ভাবেন, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নির্বাচনী প্রভাবের দিক থেকে পরিস্থিতি মিশ্র। উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যগুলোতে সরকার বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে উত্তর প্রদেশের ওপর। সরকার যদি উত্তর প্রদেশে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারে, তবে তারা দাবি করবে যে তাদের জনসমর্থন বা কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার হয়েছে। সরকার হয়তো এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে, সমাজের ওপর চাপ অব্যাহত রেখে তাকে ক্লান্ত করে ফেলাই যথেষ্ট—যাতে তাদের নির্বাচনী যন্ত্রটি আবারও নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এসআইআর-এর সমালোচনার কাছে নতি স্বীকার করাটা কোনো নীতি পরিবর্তনের মতো সাধারণ বিষয় নয়; বরং এটি স্বীকার করে নেওয়া যে, রাষ্ট্র সেই আস্থার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে যার ওপর তার বিশ্বাসযোগ্যতা টিকে আছে। এটি সরকারের এমন এক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেবে যা থেকে তারা আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। এটি অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের বীজও বপন করবে: রাষ্ট্র যখন তার সবচেয়ে অনুগত সহযোগীদেরই বলি দিতে শুরু করে, তখন দলের ভেতরে আনুগত্য বজায় রাখার আগ্রহ বা প্রণোদনা কমে যায়।
সরকার ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব এবং নেপাল ও বাংলাদেশে কথিত বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গ টেনে এই আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির কারসাজি হিসেবে চিহ্নিত করে এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই, যারা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাদের কাছেই জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের গভীরতা স্পষ্ট ছিল। তবে বড় বিপদটি হলো, প্রকৃত অসন্তোষকে উপেক্ষা করে ভারত সরকার শেষ পর্যন্ত নিজের প্রচারণাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে বসতে পারে।
সরকার যদি নিশ্চিত হয় যে এর ফলে নির্বাচনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, তবেই হয়তো পরিস্থিতির মোড় ঘুরতে পারে। এখন পর্যন্ত তারা এই ধারণাতেই অটল যে, বিক্ষোভ আর নির্বাচনের যুক্তি এক নয়। পরিস্থিতির পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যদি সরকার বা এমনকি আরএসএস-এর ভেতরে এমন কোনো কণ্ঠস্বর ওঠে যারা নরেন্দ্র মোদির পরবর্তী সময়ের কথা ভাবছে। কিন্তু সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করার মতো পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা কম। আবার ভিন্নমত পোষণের মতো সাহসও হয়তো তাদের নেই। ইতিহাস বলে, সামাজিক আন্দোলনের গতিপথ প্রায়শই অপ্রত্যাশিত সব ঘটনার ওপর নির্ভর করে—যেমন রাষ্ট্রের কোনো সহিংস পদক্ষেপ যা তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, কিংবা সাহসিকতার এমন কোনো মুহূর্ত যা পুরো জাতির মনোযোগ কেড়ে নেয়। সুপরিকল্পিত বা নিয়ন্ত্রিত বিক্ষোভও একসময় নিজস্ব গতিপথ তৈরি করে নেয়। হয়তো আমরা সেই সন্ধিক্ষণ থেকে খুব একটা দূরে নই।
তাই আমরা হয়তো এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করতে চলেছি যেখানে গণ-আন্দোলনের মুখোমুখি হবে এক অনমনীয় রাষ্ট্র; কারণ, অত্যন্ত যৌক্তিক দাবিগুলোও অনেক সময় রাষ্ট্রের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা যদি ক্রমশ কমতে থাকে, তবে বিশ্বজুড়েই শাসনব্যবস্থায় এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী, ক্লান্তিকর এবং সম্ভাব্য অস্থিতিশীল এক অনিশ্চিত অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো—সমাজকে তার বক্তব্য জোরালো ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে, যাতে সরকারের পক্ষে সেই বার্তা এড়িয়ে যাওয়া বা বিষয়টির গুরুত্বকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার কোনো সুযোগ না থাকে। আপাতত রাষ্ট্র মনে করছে যে, নাগরিকদের উপেক্ষা করে কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের বাধ্য করা সম্ভব।
প্রতাপ ভানু মেহেতা: ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একজন কন্ট্রিবিউটিং এডিটর।
(এই লেখাটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার সৌজন্যে প্রকাশিত।)