Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৮ আগস্ট, ২০২৬
২৮ আগস্ট, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৮ আগস্ট, ২০২৬
২৮ আগস্ট, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

স্বত্ব © চরচা

Advertisement
Advertisement
> ভাবনা

বাংলাদেশের গণভোটের বৈধতার সংকট

ড. গোলাম রসুল

ড. গোলাম রসুল

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৩৮
বাংলাদেশের গণভোটের বৈধতার সংকট

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব থেকে শুরু করে জুলাই চার্টার এবং তার ভিত্তিতে ঘোষিত গণভোটের প্রক্রিয়া কীভাবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এক মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে।

সেখানে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে। এই ঐতিহাসিক ও নৈতিক সংকটই আমাদের সামনে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে-গণভোটের বৈধতা আসলে কতটা দৃঢ় ও গ্রহণযোগ্য।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

দ্বিতীয় পর্বে তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে গণভোটের প্রক্রিয়াগত বৈধতা। এখানে আমরা বিশ্লেষণ করব-গণভোটের কাঠামো কীভাবে নাগরিকদের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশ্য পক্ষপাত কীভাবে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার নীতি ভঙ্গ করছে, এবং ব্যালট প্রশ্নের ভাষা কীভাবে মৌলিক নীতির পরিবর্তনকে আড়াল করে নাগরিক সম্মতিকে বিভ্রান্ত করছে। অর্থাৎ, এই অংশে মূলত দেখা হবে-আইনি কাঠামো বজায় থাকলেও প্রক্রিয়াগত ঘাটতি কীভাবে গণভোটকে নৈতিক ও গণতান্ত্রিক বৈধতা থেকে বঞ্চিত করছে।

বাংলাদেশে আসন্ন গণভোটকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে। সরকার প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সিভিল সোসাইটি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি নিরপেক্ষতার নীতি ভঙ্গ করছে। যদিও সরকার দাবি করছে-আইন তাদের প্রচারণা নিষিদ্ধ করে না। নির্বাচন কমিশন পরে স্পষ্ট করেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো পক্ষের প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। কিন্তু সমস্যাটি কেবল আইনি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈধতা বহুমাত্রিক-আইনি, গণতান্ত্রিক ও নৈতিক। আইন মানা যথেষ্ট নয়; জনগণের আস্থা ও ন্যায়বোধ নিশ্চিত না হলে কোনো গণভোট গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ হয় না। বর্তমান প্রক্রিয়ায় সেই নৈতিক বৈধতার ঘাটতি স্পষ্ট।

সরকার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি নিরপেক্ষতা বজায়ও রাখে-অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীরা সরাসরি প্রচারণায় অংশ না নেন-তাতেই গণভোটের বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয়ে যায় না। কারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বৈধতা একটি বহুমাত্রিক ধারণা; তা শুধু আইনি আনুগত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর অন্তত তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত স্তর রয়েছে: আইনি বৈধতা, গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং নৈতিক বৈধতা।

সংবিধান সংস্কার কমিশন থেকে গণভোট: ইতিহাস ও কাঠামোর সংকটparliament house (3)

নিরপেক্ষতা কেবল প্রশাসনিক আচরণের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রকাশ। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা থাকলেও যদি রাষ্ট্র আদর্শিকভাবে পক্ষ নেয়, তবে সেই প্রক্রিয়া নৈতিক বৈধতা হারায়। আর সেখানেই বর্তমান গণভোটের প্রকৃত সংকট নিহিত। কেন নিরপেক্ষতা যথেষ্ট নয়, তা বুঝতে হলে বৈধতার বহুমাত্রিক ধারণা-আইনি, গণতান্ত্রিক ও নৈতিক স্তর-সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বৈধতা কেবল আইনি কাঠামোয় সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনগণের আস্থা, অংশগ্রহণ ও নৈতিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নৈতিক বৈধতা কোনো অনুভূতি নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মানদণ্ড-যার মাধ্যমে নাগরিকরা নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, এমনকি সেটি আইনসম্মত হলেও। ম্যাক্স ওয়েবার দেখিয়েছেন, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী গৃহীত সিদ্ধান্ত আইনি বৈধতা অর্জন করে, যেমন সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিল পাস হওয়া। কিন্তু আইন সবসময় ন্যায়সঙ্গত হয় না; তাই কেবল আইনি বৈধতা গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। ইউর্গেন হাবারমাস বৈধতার গণতান্ত্রিক মাত্রা সামনে এনেছেন-জনগণের অংশগ্রহণ, প্রতিযোগিতা ও সম্মতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। জন রলস বৈধতার নৈতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করেছেন; তার justice as fairness ধারণা অনুযায়ী বৈধতা তখনই পূর্ণতা পায় যখন সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত হয় এবং সমাজের দুর্বলতম অংশের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।

তিন দৃষ্টিকোণ থেকে স্পষ্ট, বৈধতা তিন স্তরে গঠিত-আইনি, গণতান্ত্রিক ও নৈতিক। আইনি বৈধতা কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে, গণতান্ত্রিক বৈধতা অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে, আর নৈতিক বৈধতা আস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। যেকোনো স্তরের ঘাটতি পুরো বৈধতাকে সংকটে ফেলে।

বাংলাদেশের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা এই তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগকে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী ভোট আয়োজন করলেও যদি প্রতিযোগিতা সীমিত হয় বা বিরোধী দল অংশ নিতে না পারে, তবে গণতান্ত্রিক বৈধতা দুর্বল হয়। আবার ভোটাধিকার থেকে জনগণ বঞ্চিত হলে নির্বাচন নৈতিক বৈধতা হারায়। ফলে বৈধতা কেবল প্রক্রিয়াগত নয়; বরং জনগণের আস্থা ও ন্যায়বিচারের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে বৈধতার কোনো স্তর ভেঙে পড়লে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত টেকসই থাকে না। যুক্তরাষ্ট্রে রিচার্ড নিক্সনের ১৯৭২ সালের পুনর্নির্বাচন আইনি দিক থেকে বৈধ ছিল, কিন্তু ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক পতনকে উন্মোচিত করে। এর ফলে জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭৪ সালের রায়বেরেলি আসনে জয় আইনগতভাবে বৈধ হলেও নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ এবং পরবর্তী জরুরি অবস্থার ঘোষণা গণতান্ত্রিক বৈধতাকে ধ্বংস করে দেয়। জনগণ অংশগ্রহণের সুযোগ হারায় এবং গণতন্ত্র গভীর সংকটে পড়ে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ। ২০১৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর বিরোধী দলের বর্জনে প্রতিযোগিতা হারায়; ২০১৮ সালে দমননীতি, ভয়ভীতি ও ব্যাপক কারচুপি গণতান্ত্রিক বৈধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; আর ২০২৪ সালে নির্বাচন কার্যত শুধু আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব ভেঙে পড়ে। এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে আইনি বৈধতা থাকলেও প্রতিযোগিতা ও প্রতিনিধিত্ব ছাড়া নির্বাচন গণতান্ত্রিক ও নৈতিক বৈধতা হারায় এবং দেশকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ঠেলে দেয়।

আসন্ন গণভোটের কাঠামোগত সংকট

এই ধারাবাহিক সংকটের পর গণভোটের প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের ঘাটতি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপি অংশ নিয়েছিল এবং কিছু বিষয়ে ভিন্নমত নথিভুক্ত করেছিল; কিন্তু সেই ভিন্নমতগুলো চূড়ান্ত জুলাই চার্টারে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে বিএনপি অভিযোগ করেছে যে আলোচনার মাধ্যমে গঠিত ঐকমত্যের সঙ্গে জুলাই চার্টারের বিষয়বস্তু সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একইভাবে বামপন্থী দলগুলোর মতামতও কার্যত উপেক্ষিত হয়েছে।

সংবিধান সংস্কার কমিশন বামপক্ষের আপত্তি উপেক্ষা করে বিদ্যমান সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলো পরিবর্তন ও পুনর্লিখনের খসড়া প্রস্তাব দেয়; এতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাদ দেওয়া এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলিক নীতি থেকে সরানোর সুপারিশ ছিল। এসব প্রস্তাব প্রথমে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত হলেও পরে গণভোটের প্রশ্নপত্র থেকে বাদ পড়ে।

পুরো আয়োজনেই একটি সুস্পষ্ট পক্ষপাতমূলক চরিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। দেশের ৫২টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ২৫টি দল জুলাই চার্টারে স্বাক্ষর করেছে। চার্টারের ৫০ জন প্রতিনিধির মধ্যে একজনও নারী ছিলেন না এবং মাত্র একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং বৈধতার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।

এই প্রতিনিধিত্বগত ও প্রক্রিয়াগত ঘাটতিগুলো একত্রে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে-এই গণভোট আদৌ নাগরিকদের অবহিত সিদ্ধান্তগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় গণভোটের ব্যালট কাঠামো ও প্রশ্নপত্রের ভাষায়। কারণ এখানেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নৈতিক বৈধতার চূড়ান্ত পরীক্ষায় দাঁড়ায়।

এবারের গণভোটও কি বিতর্কিত হতে যাচ্ছে, ইতিহাস কী বলেগণভোট-২

গণভোটের প্রশ্ন, ব্যালট কাঠামো এবং নৈতিক ছদ্মাবরণ

এই বৈধতার সংকট সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে গণভোটের প্রশ্নপত্রের কাঠামোয়। ব্যালটে নাগরিকদের সামনে কোনো নির্দিষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনী আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং ভোটারদের জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে: “জুলাই সনদ এবং তার Schedule 1–এ অন্তর্ভুক্ত সংস্কারসমূহের প্রতি আপনি সম্মতি দেন কি না।”

অর্থাৎ জনগণকে একটি সমগ্র সংস্কার-প্যাকেজের প্রতি একক ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে বলা হচ্ছে। এই Schedule 1 কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সংবিধানের মৌলিক রাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন-ধর্মনিরপেক্ষতার অপসারণ, তার স্থলে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ প্রতিস্থাপন, এবং একইসঙ্গে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা।

এটাই এই গণভোটের মূল নৈতিক সংকট। ভোটারদের সামনে প্রশ্ন উপস্থাপন করা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভাষায়-দ্বিকক্ষ সংসদ, ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার। কিন্তু সেই একই প্যাকেজের ভেতরে নীরবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের আদর্শিক পরিচয়ের মৌলিক রূপান্তর। অর্থাৎ নাগরিকরা যখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে ভোট দিচ্ছেন, তখন তারা একইসঙ্গে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের সম্মতিও দিয়ে ফেলছেন—অনেকে তা না জেনেই।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আড়ালে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি পাল্টে দেওয়া হচ্ছে-এটি informed consent‑এর লঙ্ঘন এবং গণতান্ত্রিক প্রতারণার সমতুল্য। যদি নাগরিক জানতেই না পারেন কোন আদর্শিক রূপান্তরকে তিনি অনুমোদন করছেন, তবে সেই সম্মতি গণতান্ত্রিক অর্থে সম্মতি নয়-তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদনমাত্র। ফলে সেই সম্মতি প্রক্রিয়াগতভাবে বৈধ হলেও নৈতিক ও গণতান্ত্রিক অর্থে সম্মতি নয়।

আরও গভীর সংকট হলো-ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে জনপরিসরের বিতর্ক থেকে সরিয়ে দেওয়া। তার জায়গায় ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ শব্দটি বসানো হয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট ও নরম ধারণা। এর ফলে রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় না হয়ে একটি প্রশাসনিক সংস্কারের অংশে রূপ নিয়েছে।

কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সমার্থক নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা কার্যকর হয় কেবল তখনই, যখন রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ থাকে। রাষ্ট্র নিরপেক্ষ না হলে ধর্মীয় স্বাধীনতা সংখ্যাগরিষ্ঠের সুবিধায় পরিণত হয়, আর সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কাঠামোগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই গণভোট তাই কেবল একটি সাংবিধানিক সংস্কার নয়; এটি একটি নৈতিক ছদ্মাবরণ, যার আড়ালে রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শিক ভিত্তি নীরবে পুনর্গঠিত হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার করে রাষ্ট্রের আদর্শিক পরিচয় রূপান্তর করা হচ্ছে। এটি গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামোর ভেতরে একটি কাঠামোগত প্রতারণা। ইতিহাস আমাদের শেখায়-যেখানে নৈতিক বৈধতা নীরবে ভেঙে পড়ে, সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নৈতিক বৈধতা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়-এটি রাষ্ট্রীয় স্থায়িত্বের অপরিহার্য শর্ত। বাংলাদেশের আসন্ন গণভোট সেই বৈধতার সংকটকে উন্মোচিত করেছে নির্মম স্পষ্টতায়। জাতীয় ঐকমত্যের ভিন্নমত উপেক্ষা, প্রতিনিধিত্বের কাঠামোগত পক্ষপাত, এবং ব্যালট পেপার থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার ইচ্ছাকৃত অপসারণ পুরো প্রক্রিয়াকে নাগরিক আস্থার সংকটে নিক্ষেপ করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভাষার আড়ালে রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শিক ভিত্তি পুনর্গঠনের এই প্রয়াস শুধু গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতাকেই নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও কাঠামোগতভাবে দুর্বল করছে।

আইন রাষ্ট্রকে বৈধ করে, কিন্তু নৈতিকতা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। এই গণভোটে নৈতিক বৈধতার ঘাটতি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

বিষয়:

বৈধতাজুলাই সনদআইনগণভোটভোটমতামতসংবিধান
১

ক্রিকেটের উন্নয়নে ওয়ালটনের সহযোগিতা প্রত্যাশা তামিমের

২

পূর্ণ সংস্কারের দাবিতে সংসদ থেকে বিরোধীদের ওয়াকআউট

৩

একীভূত ৫ ব্যাংক: চেক বই, ডিপিএস, এফডিআর ও শাখার কী হবে

৪

চেক জালিয়াতির মামলায় ববির প্রশাসনিক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

৫

আমেরিকা–কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধে চীনের লাভ

সম্পর্কিত

কেমন হবে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন

কেমন হবে সংসদের তৃতীয় অধিবেশন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেও সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না বিরোধী দল গতিমুখ বদলাতে পারবে, সেটা আগে থেকে বলা কঠিন। সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার বিরোধ কীভাবে ও কতদিনে মীমাংসা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হে সরকার, একটু শান্তি যে দরকার!

হে সরকার, একটু শান্তি যে দরকার!

এই দেশে মানুষ মোটা দাগে দুই ধরনের। একটি হলো ‘সাধারণ’, অন্যটি হলো ‘অসাধারণ’। কে সাধারণ বা অসাধারণ এবং কেন, সেই ব্যাখ্যায় যাওয়া হবে শিগগিরই। তবে তার আগে জানানো যাক যে, শিরোনামে যে ‘শান্তি’র খোঁজ করা হয়েছে, তা আদতে এই সাধারণদের হিসাব থেকেই বলা। সাধারণদেরই একটু শান্তি দরকার। সেই প্রয়োজনের কথা আর কাক

স্বাস্থ্যে আমরা ‘কোথায়’ যাচ্ছি?

স্বাস্থ্যে আমরা ‘কোথায়’ যাচ্ছি?

গেল আগস্টের ১৫ তারিখ নেত্রকোনা জেলায় আমার একমাত্র ছোট বোনের ব্রেইন স্ট্রোক করে। দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নিউরোসায়েন্স বিভাগে রাতে ভর্তির পর সকালে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। এর কয়েক মিনিট পর তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

প্রথম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অজানা গল্প

প্রথম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অজানা গল্প

মিয়ানমার সরকার তার দেশের একটি প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠী—রোহিঙ্গাদের নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু তারা তাতে সাড়া দেয়নি। ২০২৫ সালের ঘটনা এটি, যা ২০১৬-১৭ সালে ঘটে যাওয়া রোহিঙ্গা ঢলের প্রায় নয় বছর পরের কথা।