একই দিনে ঢাকা শহরে এতগুলো অঘটনের নজির নিকট অতীতে নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাণ্ডব থেকে শুরু করে স্টুডিওতে হামলা। চাঁদার দাবিতে অ্যাপার্টমেন্টে চড়াও হওয়া থেকে রাজনৈতিক দলের অফিসে সাঁড়াশি অভিযান। এর কোনোটা আইনের শাসনের সঙ্গে যায় না।
গত বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুর বিএনপির সাবেক এক নেতা ৫২ বছরের পুরনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের দখলদারত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। শনিবার জাসদ অফিসে সরকারের পূর্বানুমতিক্রমে আয়োজিত প্রতিনিধি সভায় ঢুকে তাণ্ডব চালালেন জাতীয়তাবাদী যুবদল নেতা ও তার সহকর্মীরা। পরে পুলিশ ডেকে সেখানে উপস্থিত সবাইকে গ্রেপ্তারও করালেন। সরকারি দলের কোনো নেতার নির্দেশে যখন ডিএমপি এসব কাজ করে তখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে আসলে তারা কি দলের অনুগত বাহিনী হিসেবে কাজ করছেন না রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে?
মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (মিডিয়া) মো. আক্তার হোসেন চরচাকে বলেন, “জাসদ অফিস থেকে আটক ২৯০ জনের মধ্যে ২৯ জন ছাড়া বাকিদের গতকাল রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২৯ জনের বিষয়েও আমরা যাচাই বাছাই করছি, যদি আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা না থাকে তাদেরও ছেড়ে দেব।” এটা হলো আগে শাস্তি দিয়ে পরে কাউকে নির্দোষ প্রমাণ করা। এই যে প্রায় তিন শ নেতা–কর্মীকে যেভাবে হেনস্তা করা হলো তাতে কি বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল হয়েছে?
শনিবার দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত জাসদের প্রতিনিধি সভা চলাকালে চার দফায় ২৯০ জনকে আটক করা হয়। ওইদিন সকালে গুলিস্তানের কার্যালয়ে জাসদের প্রতিনিধি সভা শুরু হয়। বেলা ১১টার পর যুবদলের নেতা-কর্মীরা জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হন। যুবদল নেতা-কর্মীদের দাবি সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা ‘গোপন বৈঠক’ করছিল।
যুবদল কর্মীদের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে ডিএমপি দলীয় অফিসে হানা দিয়ে যে প্রায় তিন শ লোককে পাকড়াও করল তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না। সবাই জাসদের নেতা–কর্মী। হয়তো চক্ষুলজ্জার কারণে ২৯ জনকে আটক রাখা হয়েছে। সবাইকে ছেড়ে দিলে ‘ইজ্জত’ থাকে না।
জাসদ নেতারা বলেছেন, তারা দলের প্রতিনিধি সভা ডেকেছিলেন। সারা দেশ থেকে তাদের নেতা–কর্মীরা এসেছেন। এর সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ যুবদল নেতা ভিডিও বার্তায় বলেছেন, জাসদ অফিসে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের লোকেরাই ষড়যন্ত্র করেছিলেন। সভাস্থল থেকে ‘জয় বাংলা স্লোগান’ শোনা গেছে।
জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ হয়েছে বলে জানা নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জোর করে সবাইকে জয় বাংলা বলানোর চেষ্টা চলছিল। সেটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, এখন জয় বাংলা বলার কারণে কাউকে ধরে নেওয়াটাও সমানভাবে অন্যায়।
গণতন্ত্রে আপনি কাউকে জোর করে কিছু করাতে পারেন না। ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান হলেও এই স্লোগান না দিয়েও অনেকে যুদ্ধ করেছেন। আবার আওয়ামী লীগের যেই তরুণেরা একাত্তরে জয় বাংলাকে মূলমন্ত্র বলে ধরে নিয়েছিলেন, বাহাত্তরেই তারা নতুন স্লোগান সামনে এনেছিল।
রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানও বদলায়। বিএনপি যে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে দলের মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়েছে, তার প্রবক্তা বিএনপি নয়। সাংবাদিক খন্দকার আবদুল হামিদ।
বাংলাদেশে বামপন্থীরা এক সময় ইনকিলাব জিন্দাবাদকে মূলমন্ত্র হিসেবে নিয়েছিলেন, এখন ডানপন্থীরাই সেই স্লোগানটি বেশি বেশি দেন। ইনকিলাব জিন্দাবাদ বললেই যেমন বিপ্লব হয়ে যায় না, তেমনি জয় বাংলা বললেই ক্ষমতাসীনদের শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
এই প্রজন্মের বিএনপির নেতারা না জানলেও তাদের পূর্বসুরিদের জানার কথা যে ১৯৬৯ সালে জয় বাংলা স্লোগানটি যিনি প্রথম দিয়েছিলেন, সেই আবতাব আহমেদ, পরবর্তীকালে বিএনপির রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও হয়েছিলেন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবেই স্লোগান দেওয়া হতো। স্বাধীনতার পর স্বাভাবিকভাবে এর গুরুত্ব কমে যায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ‘জয় বাংলা’ বা ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান কেউ দিতে পারবেন না।
আসলে সরকারি দলের নেতারা ভাবতেই পারেননি যে এই বৈরি পরিবেশে বহুধা বিভক্ত জাসদের একাংশ তিন শ সাড়ে তিন শ নেতা–কর্মীকে একত্র করতে পারবে। তাদের এই ভাবনা যে কত অসার গুলশানসহ বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলই তার প্রমাণ।
জাসদ অফিসে অভিযান চালানোর পর ডিএমপির একজন কর্মকর্তা যেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়েছেন, তা আওয়ামী লীগ আমলের পুলিশ কর্মকর্তাদের অতি আগ্রাসীর কথাই মনে করিয়ে দেয়। সে সময়ে তারা বিএনপি-জামায়াতের যে কোনো পূর্বঘোষিত সভা পণ্ড করে দিতে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করতেন।
সমস্যা হলো, বিরোধী দল বা ভিন্নমতের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার কথা বললেই সরকারি দলের একশ্রেণির নেতা–কর্মীরা গত পনের বছরের হিসেব দেন, পুলিশের হাতে কোথায় কে কতটা মার খেয়েছেন, তার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু সেই ইতিহাস ব্যবহার করে যদি বিএনপি সরকার একই কাজ করে, তাহলে তাদের সঙ্গে অতীত সরকারের আর পার্থক্য কোথায়?
যে দলটির কার্যক্রম করতে কোনো আইনি বাধা নেই, সে দলটির সভায় এসে যে বিপুল সংখ্যক নেতা–কর্মীকে হেনস্তা করা হলো, সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্যের হাতে কড়া পরানো হলো, তার জবাব কী। আওয়ামী লীগ আমলে সাংবাদিকেরা হেনস্তা হয়েছেন বলে বিএনপি আমলেও হতে হবে? আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পুলিশকে সহায়তার নামে নানা অঘটন ঘটাতো। এখন বিএনপির একশ্রেণির নেতা–কর্মী একই কাজ করছেন।
যুবদলের নেতারা পুলিশকে জাসদ অফিসে নিয়ে গেলেও মিরপুরে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। কেন্দ্রটির চিকিৎসক ও কর্মীদের সাধুবাদ জানাই তারা খোলা আকাশের নিচে শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।
মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় যাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে হানিফ নামে এক ব্যক্তিকে, তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির আত্মীয়। এমপির আত্মীয়তার জোরে যদি একজন সাবেক বিএনপির সাবেক সদস্য এই কাণ্ড করতে পারেন, তাহলে দেশে আইনকানুন থানা পুলিশ থাকার দরকার কি? গত বৃহস্পতিবার রাতে যখন এই তাণ্ডব চালানো হয় তখন সেখানে পুলিশের একাধিক যানও ছিল। শাহআলী থানার দূরত্বও ঘটনাস্থল থেকে এক কিলোমিটারের বেশি নয়।
মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা আড়াল করতেই জাসদ অফিসে প্রথমে দলীয় হানা ও পরে পুলিশি অভিযান চালানো হয়েছে কি না সেই প্রশ্নও উঠেছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বলেই আমরা জানতাম। কিন্তু সেখানে ক্ষমতাসীন যুবদল নেতারাই ‘পথ প্রদর্শকের’ ভূমিকা নিয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে যুবলীগ ও ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরাও একই কাজ করতেন।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা