রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয় থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রায় তিন শ নেতাকর্মীকে আটকের দাবি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
আজ শনিবার সকাল থেকে সেখানে জাসদের একটি প্রতিনিধি সভা চলছিল। জাসদ জানিয়েছে, এই প্রতিনিধি সভার অনুমতি নিতে ডিএমপিকে দুই দফা চিঠি পাঠিয়েছিল তারা। তবে যুবদল নেতা-কর্মীদের দাবি সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘গোপন বৈঠক’ করছিল। আর পুলিশ বলছে, নাশকতার উদ্দেশ্যে সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়েছিল কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।
শনিবার দুপুর আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত চার দফায় প্রায় তিনশতাধিক নেতা কর্মীকে আটক করা হয়ছে। একই স্থান থেকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যকেও আটক করা হয়েছে। পরে আটক ব্যক্তিদের পল্টন থানায় নেওয়া হয়।
সকালে সেখানে জাসদের প্রতিনিধি সভা শুরু হয়। বেলা ১১টার পর যুবদলের নেতা-কর্মীরা জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হন।
সেখানে গিয়ে দেখা যায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের নেতা কর্মীরা কার্যালয়ের নিচে রেখেছিল। ঢাকা মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম এবং সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন পুলিশের সাথে কার্যালয়ের ভেতরে গিয়ে সেখানে উপস্থিত ‘আওয়ামী লীগ’ নেতাকর্মীদের বের করে পুলিশের গাড়িতে তুলে দেন।
দুপুরে জাসদ কার্যালয়ের সামনে মাটিতে রাস্তায় বসে পড়া একজনকে টানা হেঁচড়া করতে দেখা যায়। যারা তাকে হেনস্তা করছিলেন তারা সবাই যুবদলের নেতা-কর্মীর। পরে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয় চরচা। তার নাম আনসার আলী। তিনি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক।
কার্যালয়ে জাসদের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলছিল। ছবি: জাসদ
ঘটনাস্থলে উপস্থিত যুবদলের একাধিক নেতাকর্মীদের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, সকাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জাসদ কার্যালয়ের নিচে জড়ো হন। পরে তারা উপরে গিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়। স্লোগান শুনে তারা পুলিশকে খবর দেন। তারা আরও দাবি করেন ভিতরে অনেক ক্রিকেট স্ট্যাম্প এবং হাত বোমা রয়েছে। তবে পুলিশ বলেছে, এ ধরনের কিছু তারা পায়নি।
২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদল নেতা মাসুদ রানা ছবি চরচাকে বলেন, “ভিতরে তারা নাশকতা করার পরিকল্পনা করছে। আমরা বিষয়টি বুঝে এখানে অবস্থান নিলে তারা জয় বাংলা স্লোগান দেয়। এবং ককটেল ছুড়ে মারে। এরপর একটা টাকার ব্যাগ ছুড়ে মারে। যা নিয়ে নিচে দাড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের লোকজন পালিয়ে যায়।”
তবে এই বিষয়ে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা ‘কিছু জানেন না’ বলে দাবি করেন।
এর আগে জাসদ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়ো হয়েছেন এমন অভিযোগে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং পল্টন থানা যুবদলের নেতাকর্মীরা কার্যালয়টি ঘিরে রাখেন।
আটকের সময় ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রবিউল ইসলাম নয়ন। তিনি দাবি করেন, “আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগীরা যাতে ঢাকার কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে, সে বিষয়ে ঢাকা মহানগর যুবদলের প্রতিটি ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যুবদলের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের মিটিং করার উপস্থিতি টের পান। এরপর তারা ঘটনাস্থলে অবস্থান নেন। পরে জানতে পারেন, জাসদ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সেখানে একত্র হয়ে সভা করছেন।”
তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক ব্যক্তিদের থানায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তারা সহযোগিতা করছেন, যাতে ঘটনাস্থলে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হয়।”
এর আগে, যুবদল নেতা নয়নসহ আরও কয়েকজন জাসদ কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকতে দেখা যায়। এরপরই জাসদ কার্যালয়ের ওপরের কিছু কাচ তারা ভেঙে ফেলে। এ সময় নিচে থাকা নেতা-কর্মীরা ভাঙতে মানা করেন। কারণ, তাদের গায়ে কাচ পড়ার আশঙ্কা ছিল। এই ঘটনার সময় কলাপসিবল গেটে এ পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিল। সাংবাদিকদের ঢুকতে দেওয়া না হলেও বিএনপির নেতা-কর্মীদের তারা বাধা দেয়নি।
বিএনপি সমর্থকরা জাসদ কার্যালয় ঘিরে রাখার পর সেখানে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য উপস্থিত হয়। বিকেল ৪টার দিকে জাসদ কার্যালয় থেকে একে একে অনেককে হাতকড়া পরিয়ে বের করে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার এই জাসদ নেতাকে হেনস্তা করে যুবদল নেতা-কর্মীরা। ছবি: চরচা
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন বলেন, “জাসদের প্রধান কার্যালয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল এবং সেখানে বহিরাগত অনেকে অবস্থান করছিলেন। সেখানে বৈঠক চলছিল বলেও সন্দেহ করা হয়। এ কারণে ক্রাইম ও গোয়েন্দা পুলিশের যৌথ অভিযান চালিয়েছে।”
জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন চরচাকে বলেন, “আমাদের প্রতিনিধি সভা চলছিল। সভায় বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়।’’
জাসদের বৈঠকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মিথ্যা কথা, আমাদের প্রতিনিধি সভা চলছিল। আওয়ামী লীগ থাকবে কেন? প্রায় সাড়ে তিন শ মানুষ ছিল আমাদের। সবাইকে অ্যারেস্ট করছে।”
সাজ্জাদ বলেন, “আমাদের যে মিটিং আছে সেটা জন্য দুই দফা ডিএমপিকে চিঠি দিয়েছি। চিঠি দিয়ে কেউ অন্য দলের মিটিং করবে?”
পুলিশের এক কর্মকর্তা চরচাকে বলেন, “জাসদের আড়ালে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা নাশকতার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছে-এমন তথ্যে আমরা আসি। প্রত্যেককে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”