“ইমপিচমেন্ট বা অভিশংসনের যোগ্য বিবেচিত হতে হলে সিইসি-কে আর কী করতে হবে?”—জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আনা অভিশংসন প্রস্তাবের সমর্থনে আমি এই কলামেই এমন প্রশ্ন তুলেছিলাম।
আমার ধারণা ভুল ছিল। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন—যা ইদানীংকালের অন্যতম সেরা সাংবাদিকতার নিদর্শন—প্রকাশ করেছে যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) যা করেছেন, তা কারও কল্পনারও অতীত ছিল। আর যদি কোনো সন্দেহের অবকাশ থেকেও থাকে, তবে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব বিবৃতিই আনুষ্ঠানিকভাবে তা দূর করে দিয়েছে।
২৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচন কমিশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি আসলে দোষ স্বীকারেরই একটি আনুষ্ঠানিক দলিল। দুই পৃষ্ঠার এই বিজ্ঞপ্তিটি সিইসি-কে অভিশংসিত করার জন্য একটি জোরালো আইনি ভিত্তি জোগায়। একইসঙ্গে, যে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার এই বিজ্ঞপ্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন, তাদেরও অপসারণের জন্য এটি যথেষ্ট।
সংক্ষেপে বিষয়টি হলো: সংবিধান (অনুচ্ছেদ ৩২৪(৫) এবং ১২৪(৪)-এর যৌথ পাঠ অনুযায়ী) ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতা’র কারণ ছাড়া অভিশংসন প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে সিইসি-কে অপসারণের অনুমতি দেয় না। সুতরাং, অভিশংসনের জন্য কোনো ‘ফৌজদারি অপরাধ’ প্রমাণের প্রয়োজন না হলেও, ‘অসদাচরণ বা অক্ষমতা’ বলতে যেকোনো ধরনের সাধারণ অসদাচরণ, সাধারণ ভুল বা সরল বিশ্বাসে করা ভুল ব্যাখ্যাকে বোঝায় না। অভিশংসন প্রক্রিয়া তখনই শুরু হওয়া উচিত যখন এমন কোনো গুরুতর অসদাচরণ ঘটে, যার মধ্যে ওই পদের মৌলিক রীতিনীতির ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন জড়িত থাকে।
‘অনুপ বারনওয়াল’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনারদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত আচরণবিধি বা মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। এছাড়া বিচারিক আচরণের ছয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ব্যাঙ্গালোর নীতি’ও রয়েছে: স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা, সততা, যথাযথ আচরণ, সমতা এবং দক্ষতা ও নিষ্ঠা। জ্ঞানেশ কুমারের মধ্যে কি এসব গুণের কোনোটির উপস্থিতি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন? আগের নিবন্ধে আমি আদর্শগত নীতি এবং এর বাস্তব ও গুরুতর পরিণতির ওপর ভিত্তি করে একটি যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলাম—যেমন চরম দলীয় পক্ষপাত, অনুচিত আচরণ এবং ব্যাপক হারে ভোটাধিকার হরণের উদ্দেশ্যে পদের অপব্যবহার। এখন এর সাথে আইনের একাধিক ও ইচ্ছাকৃত গুরুতর লঙ্ঘনের বিষয়গুলো যুক্ত করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো আইনি অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
নির্বাচন কমিশনের জারি করা প্রেস নোটের ১(৪) অনুচ্ছেদটি পড়ুন: “কমিশনের সব বৈঠকের ক্ষেত্রে আলোচ্যসূচি আগেভাগে প্রচার করা হবে এবং সভার কার্যবিবরণী প্রকাশ করা হবে।” এটি একটি বিস্ময়কর বিবৃতি। বিশেষ করে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সেই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে এটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছিল যে গত এক বছর ধরে কোনো আলোচ্যসূচি বা কার্যবিবরণী না থাকাটাই ছিল নির্বাচন কমিশনারদের একজন—বিবেক জোশীর—পক্ষ থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল উত্থাপিত অন্যতম একটি আপত্তি। অর্থাৎ, এটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া যে, এই সাংবিধানিক সংস্থাটি এমনভাবে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে আসছিল যা কোনো সাধারণ কমিটি, সমিতি বা এমনকি স্থানীয় ক্লাবের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম যে পদ্ধতি বা নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক, তার ধারেকাছেও ছিল না।
কমিশন যদি সেই বৈঠকগুলোর কার্যবিবরণী প্রকাশ না করে, তবে আমাদের ধরে নিতে হবে যে নির্বাচন কমিশনের নামে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর—বিশেষ করে এসআইআর–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর—সমর্থনে কোনো নথিপত্রই নেই। বেআইনি হওয়ার এই ধারণাটি এসআইআর সংক্রান্ত সেই তিনটি আদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যেগুলোকে বর্তমান নির্বাচন কমিশনাররা এখন ‘সর্বসম্মত’ বলে দাবি করছেন। প্রশ্নটি এটা নয় যে তৎকালীন বা বর্তমান কমিশনাররা ওই আদেশগুলোর বিষয়ে একমত কি না; বরং প্রশ্ন হলো, আদেশগুলো ঘোষণা ও কার্যকর করার আগে পুরো কমিশন কি আদৌ সেই সিদ্ধান্ত প্রস্তাব করেছিল, তা নিয়ে আলোচনা করেছিল, তাতে সম্মতি দিয়েছিল এবং তা যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করেছিল? এর বিপরীত কোনো প্রমাণ না থাকায়, আমাদের ধরে নিতে হবে যে এই গুরুতর বিচ্যুতি একই সঙ্গে কমিশনের অযোগ্যতা এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলারই প্রমাণ।
এরপর ১(৩) এবং ৩(৩) অনুচ্ছেদ দুটির দিকে নজর দেওয়া যাক, যা ‘ফর্ম ৬’-এ পরিবর্তন সংক্রান্ত বহুল আলোচিত বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসিআই-এর প্রেস নোটে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আইন লঙ্ঘনের তিনটি ইচ্ছাকৃত ঘটনার কথা স্বীকার করা হয়েছে। প্রথমত, এতে শীর্ষ আদালতের আদেশকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে বলা হয়েছে: “এসআইআর-এর জন্য ফর্ম ৬-এর সঙ্গে সংযুক্ত ঘোষণাপত্রটিকে মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে।”

অথচ, বেশ কয়েকজন আইনি বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেছেন যে, আদালত আসলে তেমনটা করেনি। দ্বিতীয়ত, এসআইআর-বহির্ভূত সময়ের জন্য পুনরায় মূল ‘ফর্ম ৬’-এ ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি স্পষ্টতই দুজন নির্বাচন কমিশনারের সেই আপত্তিরই ফল—যারা আইনিভাবে নির্ধারিত ফর্মে আনা এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তটি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয় যে, নির্বাচন কমিশন এতদিন যে সংশোধিত ফর্মটি ব্যবহার করছিল তা ছিল আইনের চরম লঙ্ঘন—বিশেষ করে যখন খোদ কমিশনের সদস্যরাই এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, গোয়ায় ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ পড়া ৯৭ জন ভোটারকে ‘ফর্ম ৬’ পূরণের মাধ্যমে পুনরায় ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি আইনের ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘনের আরেকটি প্রমাণ।
কমিশন এমন ভোটারদের দিয়ে মিথ্যা ঘোষণাপত্রে সই করাচ্ছে—যাদের অস্তিত্ব যে এসআইআর-পূর্ববর্তী ভোটার তালিকায় ছিল এবং যাদের নাম যে ভুলবশত বাদ দেওয়া হয়েছিল, তা খোদ কমিশনেরই জানা। তাদের এমন ভান করতে হচ্ছে যেন তারা নতুন ভোটার এবং তাদের এই মর্মে অঙ্গীকার করতে হচ্ছে যে: “আমি প্রথমবারের মতো ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করছি।” এছাড়া, মিথ্যা ঘোষণার জন্য এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে—এমন স্বীকারোক্তি সম্বলিত নথিতেও তাদের সই করানো হচ্ছে। ভুলবশত নাম বাদ পড়ার মতো নিজেদের ত্রুটি সংশোধনের কোনো পদ্ধতি উদ্ভাবনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে, গত এক বছরে ইসিআই লাখ লাখ ভোটারকে এই বেআইনি কাজ করতে বাধ্য করেছে।
নোটের ১(৪) অনুচ্ছেদে বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে—যা মূলত কমিশনের সদস্যদের আপত্তিরই ফল—যাতে ইসিআইনেট ব্যবস্থাটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধির বিধান মেনে চলছে কি না, তা পুনরায় যাচাই করে দেখা যায়। এটি আরেকটি বিস্ময়কর স্বীকারোক্তি: ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার কাজে ইতিমধ্যে যে অনলাইন পোর্টাল ও সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে, তা আইনসম্মত ছিল কি না—সে বিষয়েই এখন নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) নিশ্চিত নয়। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুজন কমিশনার নিশ্চিত ছিলেন যে এটি আইনসম্মত ছিল না।
এছাড়া, এই নোটে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের—যাদের মধ্যে রয়েছেন ইআরও-রা—কাজের ক্ষেত্রে আরও নমনীয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইআরও-রাই একমাত্র আইনি কর্তৃপক্ষের অধিকারী, অথচ তারা বারবার অভিযোগ করে আসছিলেন যে তাদের এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এখন তারা কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা উপভোগ করবেন ঠিকই, কিন্তু আইন অনুযায়ী তাদের যে প্রকৃত কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা পাওয়ার কথা, তা কিন্তু পাবেন না।
সবশেষে, আসুন দেখে নেওয়া যাক নির্বাচন কমিশন কোন বিষয়টি এখনও উল্লেখ করেনি: পশ্চিমবঙ্গে যেসব ভোটার ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১৬ লাখেরও বেশি আপিলের অনুমোদন কে দিয়েছিল? সম্ভবত আইন লঙ্ঘনের এই ঘটনাটি এতটাই গুরুতর বা আপত্তিকর ছিল যে, তারা এটি উল্লেখ করা সমীচীন মনে করেনি।
এখন আপনার কেবল ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০’-এর ৩২(১) ধারাটি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। এই ধারায় বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা প্রস্তুতির সময় কোনো নির্বাচন আধিকারিক যদি “যৌক্তিক কারণ ছাড়া এমন কোনো কাজ করেন বা কোনো কর্তব্য পালনে অবহেলা/ত্রুটি করেন যা তার দাপ্তরিক দায়িত্বের পরিপন্থী”, তবে তা একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আর নিজেকেই প্রশ্ন করুন, পুরো নির্বাচন কমিশন কি এই ফৌজদারি অপরাধের জন্য দায়ী নয়?
যোগেন্দ্র যাদব: স্বরাজ ইন্ডিয়া-র সদস্য এবং ভারত জোড়ো অভিযান-এর জাতীয় আহ্বায়ক। (এই লেখাটি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এর সৌজন্যে প্রকাশিত।)