ব্রিটিশ লেখক এডওয়ার্ড বুলওয়ের লিটন ‘অসির চেয়ে মসি শক্তিশালী’ বলে যে মতবাদ প্রচার করেছিলেন, সেটি সর্বজনীন হলেও বাংলাদেশের একশ্রেণির মানুষ মানতে চান না। কখনো রাজনীতির নামে, কখনো ধর্মীয় আদর্শের নামে অপর পক্ষের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে দিতেই তারা উদগ্রীব থাকেন। এ কারণে তারা মসি বা বইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ভিন্নমতের কিছু পেলে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
বাংলাদেশে বইয়ের ওপর আক্রমণ নতুন নয়। প্রায় সব সরকারের আমলেই ‘জনশৃঙ্খলা রক্ষার’ নামে বই নিষিদ্ধ করার অনেক ঘটনা ঘটেছে। আমরা ধারণা করেছিলাম, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর একটি মুক্ত সমাজ পাব, যেখানে সবাই নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারবেন। মসির বিরুদ্ধে অসির ঝনঝনানি শুনতে হবে না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশেও যে মৌলিক কিছু পরিবর্তন হয়নি, তার প্রমাণ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শিরোনামের বইটির বিক্রি জোরজবরদস্তি করে বন্ধ করে দেওয়া।
এর পেছনে কী রাজনীতি ছিল, তা আমরা এখনো জানতে পারিনি। দেখলাম, দুজন যুবক বাংলা বাজারে অবস্থিত বনেদি প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল-এর দোকানে গিয়ে অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি চাইলেন। বিক্রয়কর্মীরা হাতে বই তুলে দিতেই বললেন, ‘নিষিদ্ধ বই তারা বিক্রি করছেন কেন?’ তখন তারা বললেন, ‘না এটি নিষিদ্ধ নয়।’ এরপর ওই দুই যুবক তাদের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দেন, হেনস্তা করেন এবং বই বিক্রি করা যাবে না বলে জানিয়ে দেন। সেখানে আশপাশের লোক জড়ো হয়েও কিছু করতে পারলেন না। আগন্তুক দুই যুবক বিক্রয়কর্মীদের কাছের পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান। পরে অবশ্য তারা ছাড়া পান। থানা-পুলিশের দায়িত্ব এই দুই যুবক নিজের হাতে তুলে নিতেও দ্বিধা করেননি।
ইউপিএল-এর দোকানে গিয়ে এই তাণ্ডব করার কারণ কি? বইয়ের বিষয়বস্তু নয়। কারণ হলো, বইয়ের লেখক শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রধানপুরুষ। যেখানে ডাকসু ভবনে শেখ মুজিবের ছবি নামিয়ে জিন্নাহর ছবি টাঙানো হয়, সেখানে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ওপর এই তাণ্ডব হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো, যখন যে সরকার আসে, তাদের পছন্দ অনুযায়ী বই লেখানো হয়। আর যাদের পছন্দ নয়, তাদের বই প্রকাশ ও বিক্রি বন্ধ করে দিতে নানা ফন্দিফিকির চালানো হয়।
ইউপিএল থেকে অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি বের হয়েছে ২০১২ সালে, ১৪ বছর আগে। বইটি সম্পর্কে কারও আপত্তি থাকলে লিখিত জানাতে পারতেন। কোথায় কী ভুল তথ্য আছে, তা প্রকাশ করতে পারতেন। কিন্তু যারা বইটির বিক্রি বন্ধ করতে এসেছেন, তারা তো বইটি পড়েননি। তাহলে কেন বইটি তাদের কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছে, সেই প্রশ্ন না উঠে পারে না।
এ প্রসঙ্গে প্রয়াত লেখক আহমদ ছফার একটি কথা মনে পড়ল। তিনি গল্পটি আমাদের অনেকবার বলেছেন। এমনকি লিখেছেনও। একবার তসলিমা নাসরিনের বই নিষিদ্ধ করার দাবিতে ঢাকায় একটি বড়সড় মিছিল হয়। সেই মিছিলের একজনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কেন তারা মিছিল করছেন। ভদ্রলোক বললেন, তসলিমা নাসরিনের বই নিষিদ্ধ করার দাবিতে। তার কাছে দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ‘আপনি কি বইটি পড়েছেন? তিনি বললেন, ‘না, পড়েননি।’
না পড়েই অনেকে বই নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। ওই দুই যুবক বইটি না পড়লেও বইয়ের লেখককে পড়েছেন। তার রাজনীতি জানেন। এ কারণেই তারা বই বিক্রি বন্ধ করতে এসেছেন। তারা হয়তো মুজিবমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চান।
এই ঘটনায় ইউপিএল-এর পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাবাজারের শোরুমে গিয়ে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। তারা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে নিষিদ্ধ বই দাবি করে এর বিপণন বন্ধের কথা বলেন। এক পর্যায়ে শোরুমের শাটার বন্ধ করে ইউপিএলের দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানি করা হয়। পরে তাদের ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তী সময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।’
এ ঘটনাকে ‘জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার ও দুর্ভাগ্যজনক’ উল্লেখ করে প্রকাশনা সংস্থাটি বলেছে, প্রায় সব সরকারের আমলেই কোনো না কোনো চাপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। বিভিন্ন সময় সরকার, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বই নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ইউপিএল বলেছে, প্রকাশক হিসেবে তারা প্রতিটি বই ধারণ করেন।
এই অকপট বিবৃতির জন্য ইউপিএলকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কিন্তু তারা যখন ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিষিদ্ধ নয়, সরকার বা আদালত সিদ্ধান্ত নিলে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেবে’ বলে যে মন্তব্য করে, সেটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের দেশে কোন সরকারের আমলে বই নিয়ে কী কী কাণ্ড ঘটে, তা নিশ্চয়ই জানা।
বই বিক্রি বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আদর্শ প্রকাশনী বলেছে, আজ একটি বই বন্ধ হলে আগামীকাল ভিন্ন মতাদর্শের আরেকটি বইও একইভাবে আক্রান্ত হতে পারে। তখন প্রকাশকরা আইন দেখে নয়, সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও চাপের আশঙ্কা বিবেচনা করে বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন। বিগত সরকারের আমলে যা হয়েছিল। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজের জন্য এ রকম দৃষ্টান্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ইউপিএল-এর শোরুমে হামলা, বিক্রয়কর্মীদের হয়রানি এবং ভয়-ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেন, যেকোনো বইয়ের বক্তব্য বা পর্যালোচনার সঙ্গে দ্বিমত বা সমালোচনা করার অধিকার সবার থাকলেও, পেশিশক্তির জোরে অন্যের বই প্রকাশ, বিক্রি বা পাঠের অধিকার কেড়ে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো বই নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত কেবল আইনসম্মত প্রক্রিয়াতেই হতে পারে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নয়। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটিকে ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান উল্লেখ করে তারা বলেন, ভিন্নমত প্রকাশের একমাত্র পথ মুক্ত আলোচনা, গবেষণা ও যুক্তি—কোনো বইয়ের দোকানে হামলা নয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য। ছবি: চরচা
হামলার নিন্দা জানিয়ে ব্লাস্ট বলেছে, বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কোনো বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি বা ভিন্নমত থাকলে তা শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ উপায়ে প্রকাশ করা যেতে পারে। তবে বলপ্রয়োগ, হামলা বা হুমকির মাধ্যমে বই প্রকাশ ও বিক্রি বন্ধ করার অপচেষ্টা সরাসরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
কেবল একটি-দুটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বা নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি নয়, আমাদের সবাইকে প্রতিবাদ করতে হবে মসির বিরুদ্ধে অসিওয়ালাদের মাস্তানির বিরুদ্ধে। যুগে যুগে এরা নিজের মতকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। একইভাবে অন্যের মত প্রকাশেও বাধা দিয়ে থাকে।
আমাদের মনে আছে, যখন নব্বই দশকে এক শ্রেণির আওয়ামী লীগ সমর্থক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর বই সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এর প্রতিবাদ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, আমি যে মতের অনুসারী নই, সেই মত জানার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে সব মতের বই থাকা উচিত। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আফতাব আহমদ জাতীয় সংগীতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী তার কক্ষ ভাঙচুর করেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জাতীয় সংগীতের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েও আফতাব আহমদের কক্ষ ভাঙচুরের প্রতিবাদ করেছিলেন। এটাই হলো পরমত সহিষ্ণুতা বা গণতন্ত্র চর্চার উজ্জ্বল উদাহরণ।
আমরা যদি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি পাঠ করি, তাহলে সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় যখন এর পেছনে দলীয় রাজনীতি খুঁজতে যাই। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব রাজনীতি থাকতে পারে। থাকবেও। কিন্তু সেই রাজনীতির অর্থ এই নয় যে, এর বিপক্ষে যারা আছে, তাদের কথা ও লেখা অসির জোরে স্তব্ধ করে দিতে হবে।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রি বন্ধের ঘটনায় যখন বিভিন্ন মহলে প্রতিবাদ হচ্ছে, আমাদের লেখক ও সাংবাদিক বন্ধুদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগ আমলে বই নিষিদ্ধ করা ও বিক্রি বন্ধ করার প্রসঙ্গ তুলেছেন। অনেকে সেই সময় ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছেন। তাদের প্রতি আমাদের পূর্ণ সহমর্মিতা আছে। এসব মনে রেখেও বলতে চাই যে, অতীতের একটি মন্দ কাজের উদাহরণ দিয়ে আমরা যেন বর্তমানে আরেকটি মন্দ কাজকে জায়েজ করার চেষ্টা না করি।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা