মতিঝিলের মুদিখানার দোকানদার আব্দুল মোতালেবের কাছে ডিজিটাল লেনদেন ছিল একসময় অপরিচিত একটি ব্যবস্থা। একদিন দোকানে একটি ব্যাংকের প্রতিনিধি তাকে বাংলা কিউআর পদ্ধতির কথা জানান। তাকে বোঝান, এর মাধ্যমে ক্রেতারা সহজেই পণ্য কিনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে দাম পরিশোধ করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা, এই সেবা নিতে তার কোনো খরচ হবে না। বিষয়টি জানার পরই বাংলা কিউআর ব্যবহারে আগ্রহী হন তিনি।
মোতালেব চরচাকে বলেন, “বাংলা কিউআর সম্পর্কে আমি আগে জানতাম না। এখন অনেকেই এই কিউআরের মাধ্যমে আমাকে পেমেন্ট করে।”
মোতালেবের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলা কিউআর পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা চলছে। ক্রেতার হাতে নগদ টাকা না থাকলেও মোবাইল ব্যাংকিং বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কিউআর কোড স্ক্যান করে পণ্যের দাম পরিশোধ করা যাচ্ছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনেরই লেনদেন হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। এভাবেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হচ্ছে বাংলা কিউআর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুলাই-সেপ্টেম্বর তিন মাসে এই ব্যবস্থায় লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। টাকার অংকে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক গড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ লেনদেন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে গত ১ জুলাই থেকে একক মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ মার্চেন্ট পয়েন্টে নিজস্ব কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর ব্যবহারের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্টদের খরচ কমানো, তাৎক্ষণিক অর্থ নিষ্পত্তি এবং ব্যক্তিপর্যায়ে টাকা পাঠানোর সুবিধা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুরুটা যেভাবে হয়েছিল
বাংলা কিউআরের যাত্রা শুরু হয় একক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলা কিউআরের নির্দেশিকা জারি করে। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার মতিঝিলে পরীক্ষামূলকভাবে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআর পেমেন্ট চালু হয়। এর ফলে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা একই কিউআর কোড স্ক্যান করে মার্চেন্টকে টাকা দেওয়ার সুযোগ পান। আগে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিউআর কোডে শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরাই লেনদেন করতে পারতেন।
২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে বাংলা কিউআরে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান লেনদেনের পরিসর আরও বাড়ানো হয়। এতে বিভিন্ন ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়।
এরপর ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে মার্চেন্ট পয়েন্টে বাংলা কিউআর ব্যবহারের কার্যক্রম আরও জোরদার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর লক্ষ্য, দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক প্রতিষ্ঠানের আলাদা কিউআর কোডের বদলে একটি কোডের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপ থেকে পেমেন্টের সুযোগ সৃষ্টি করা।
দেশের অর্থনীতির কী সুবিধা হবে?
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলা কিউআরের প্রধান সুবিধা হলো, গ্রাহককে নগদ টাকা বহন না করেও পণ্য ও সেবার দাম পরিশোধ করতে পারবেন। একই কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাপ থেকে পেমেন্ট করা গেলে লেনদেন সহজ হয়। ছোট দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও কম খরচে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারে।
ডিজিটাল লেনদেনের আরেকটি সুবিধা হলো, অর্থ পরিশোধের রেকর্ড তৈরি হওয়া। এতে ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা সহজ হবে। নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরতা কমলে আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য সংরক্ষণ বাড়বে। তবে এর ফলে হিসাবের বাইরে থাকা অর্থ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবে কত মানুষ ও প্রতিষ্ঠান বাংলা কিউআর ব্যবহার করছে তার ওপর।
বাংলা কিউআর ব্যবহার বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর বাতিল করেছে। একই সঙ্গে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি শূন্য করেছে। এর আগে মার্চেন্টদের ওপর ন্যূনতম ১ শতাংশ এমডিআর ছিল। নতুন ব্যবস্থায় বাংলা কিউআর পেমেন্ট গ্রহণের খরচ কমেছে।
একই সঙ্গে লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর মার্চেন্টের হিসাবে অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগে অর্থ জমা হতে এক দিন পর্যন্ত সময় লাগত। নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত অর্থ হাতে পাওয়ায় দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা সহজ হচ্ছে।
বাংলা কিউআর ও ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার দেশের কর আদায়ের পরিধি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি চরচাকে বলেন, “ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সহজ হবে। এতে কর ফাঁকির সুযোগও কমে আসতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ভুয়া লেনদেন দেখিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা নেওয়া কিংবা অর্থ পাচারের মতো অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। চরচাকে তিনি বলেন, “বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেন ধীরে ধীরে বাড়ছে। এটা ইতিবাচক। এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হবে। বিশেষ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে বাংলা কিউআর সম্পর্কে সচেতন করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও উদ্যোগ নিতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রচার চালাতে হবে, যাতে ক্যাশলেস লেনদেনের বার্তা সবার কাছে পৌঁছায়।”
সবচেয়ে বেশি এজেন্ট কার?
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্ট পয়েন্টের হিসাবে বিকাশ এগিয়ে রয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ব্যাংক, এমএফএস ও পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া বাংলা কিউআর এর সংখ্যা প্রায় ৩৯ লাখ। জুলাইয়ের শুরুতে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। অর্থাৎ তিন মাসে বাংলা কিউআর নেওয়া ব্যবসায়িদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশে স্থাপিত বাংলা কিউআর কোডের মধ্যে বিকাশের কোড ছিল ৮ লাখ ৫ হাজার ৩৫৭টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির স্থাপন করা কোডের সংখ্যা ৪ লাখ ২৭ হাজার ৬৬৩। ইসলামী ব্যাংকের ৩ লাখ ১১ হাজার ৯৩৭টি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ২ লাখ ৭২ হাজার ৫০৭টি এবং অগ্রণী ব্যাংকের ২ লাখ ৬৮ হাজার তিনটি কিউআর কোড।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টালি-পের কোড ২ লাখ ৬ হাজার ১৮৯টি। রূপালী ব্যাংকের ১ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩৫টি, রকেটের ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬২৫টি এবং জনতা ব্যাংকের ১ লাখ ২১ হাজার ২০৯টি কোড।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলা কিউআরের প্রসার এমএফএস এজেন্ট ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থায় গ্রাহক এজেন্টের মাধ্যমে টাকা তুললে নির্দিষ্ট মাশুল দিতে হয়। কিন্তু কিছু মার্চেন্টের কিউআর ব্যবহার করে পণ্য না কিনেও নগদ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক মার্চেন্টের হিসাবে টাকা পাঠিয়ে নগদ অর্থ নিতে পারেন।
লেনদেন কতটা বাড়ছে?
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে তার আগের সময়ের চেয়ে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে তিন গুণ। লেনদেনের আর্থিক মূল্য বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার বাংলা কিউআর লেনদেন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। জুনে দৈনিক লেনদেনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ। আর্থিক মূল্য ছিল ২৮ কোটি টাকার কিছু বেশি।
লেনদেনের গড় অংকও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে বাংলা কিউআরে প্রতিটি লেনদেনের গড় আর্থিক মূল্য ৪ হাজার ১০১ টাকা। জুনে তা ছিল ২ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ, শুধু লেনদেনের সংখ্যাই বাড়েনি, প্রতিটি লেনদেনে গড় আর্থিক মূল্যও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে বলা যায়, আগস্টে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এমএফএসের মাধ্যমে বাংলা কিউআরে মোট ৭৪ লাখ ৮৪ হাজার ১৬৪টি লেনদেন হয়েছিল। এর আর্থিক মূল্য ছিল ২ হাজার ২৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। জুলাইয়ে এই দুই মাধ্যমে লেনদেন হয়েছিল ৫৬ লাখ ৫৮ হাজার ৪৮২টি। আর্থিক মূল্য ছিল ১ হাজার ২৪৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, “অনেক সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলেও মার্চেন্টের হিসাবে তা জমা হয় না। এ ধরনের সমস্যা দ্রুত সমাধান এবং প্রয়োজনে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর গ্রাহকের আস্থা কমে যেতে পারে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান চরচাকে বলেন, “বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ছে। এর মাধ্যমে দেশের লেনদেন ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে নগদবিহীন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আমরা চাই, দৈনন্দিন জীবনের কেনাকাটা থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতেও বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ুক। এতে লেনদেন সহজ হবে, সময় বাঁচবে এবং নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমবে।”
নভেম্বর থেকে নতুন যে সুবিধা চালু হবে
বাংলা কিউআর ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬ সালের ১ নভেম্বর থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে টাকা পাঠানোর সুবিধা চালুর পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পিয়ার-টু-পিয়ার বা পি-টু-পি লেনদেন চালু হলে একজন গ্রাহক অন্য গ্রাহকের বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে টাকা পাঠাতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট অ্যাপে কিউআর কোডের ছবি আপলোড করেও লেনদেন করা যাবে।
এত দিন বাংলা কিউআর মূলত দোকান বা মার্চেন্টকে পেমেন্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছিল। নতুন সুবিধা চালু হলে ব্যক্তির কাছেও এই ব্যবস্থায় টাকা পাঠানো যাবে। এতে ছোট অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার বাড়তে পারে।
বাংলা কিউআর লেনদেনে গ্রাহকের আস্থা বাড়াতে ফেইল ট্রানজেকশানের অর্থ ফেরত এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে নির্দেশনা জারি করা হয়। নির্দেশনাটি ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।