কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন করে আবার আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাং। হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের চার আসামির মধ্যে দুজনের বয়স ১৫ ও ১৬ বছর। বাকি দুজনের বয়স ১৯। দুজনকে গাজীপুর সংশোধনাগারে (শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র) পাঠানো হয়েছে। বাকি দুজনকে কুমিল্লা কারগারে রাখা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর সামনে আসতে থাকে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সম্পর্কিত নানা তথ্য। ঘটনায় জড়িত তিনজন ‘আরজেন্ড-৩৬’ নামের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানায় স্থানীয়রা। সম্প্রতি কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং বিরোধী পুলিশের অভিযানে ২০টি দলের তথ্য সামনে আসে।
রাজধানীতে এই সংখ্যাটা দেড় শতাধিক পেরিয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দেওয়া তথ্য বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ১৫৯টি। সদস্যের সংখ্যা ১ হাজার ২১৯ জন।
পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, মাদককারবারি, অস্ত্রের মহড়ার মতো ঘটনায় কিশোর গ্যাং প্রায়ই আলোচনায় থাকে। নিয়মিত বিরতিতে সংবাদমাধ্যমে খবরও হচ্ছে। পুলিশের অভিযানও হয়। কিন্তু গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস্ বিভাগের ডিসি মো. আকতার হোসেন বলেন, “গ্যাংয়ে কিশোরদের পাশাপাশি একটু সিনিয়ররাও থাকে। তারা এসব গ্যাং পরিচালনায় ভূমিকা রাখে। পুরোটাকে আমরা কিশোর গ্যাং বলি।”
রাজধানীর এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাং
২০২২ সালের ডিএমপির দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ৬৬টি। চার বছরে সংখ্যাটি দ্বিগুণ ছাড়িয়ে হয়েছে ১৫৯টি।
ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) নিয়াজ মেহেদী চরচাকে জানান, রাজধানীর ৫০টি থানার আওতাধীন এলাকায় সব থেকে বেশি কিশোর গ্যাং আছে মোহাম্মদপুরে। এই এলাকায় ২৭টি দল অপরাধ করছে। এরপর অপরাধের অভয়ারণ্যখ্যাত পল্লবীতে আছে ১৬টি কিশোর গ্যাং। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কিশোর গ্যাং রয়েছে, যাত্রাবাড়ীতে আটটি, খিলগাঁওয়ে সাতটি, হাজারীবাগে ছয়টি, চকবাজারে চারটি, কদমতলীতে চারটি, আদাবরে ছয়টি, দারুসসালামে ছয়টি, শাহআলীতে চারটি, বনানীতে ছয়টি, উত্তরা পূর্ব থানা এলাকায় চারটি, দক্ষিণখানে পাঁচটি, ধানমন্ডিতে দুটি, ডেমরা, মুগদা ও মিরপুর মডেল থানা এলাকায় রয়েছে তিনটি করে গ্যাং।
নেতৃত্বে কারা
২০২৪ সালে ৫ আগস্টের আগে কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনের ২১ জন কাউন্সিলর।
একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর ১১৮টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের ২০ জন, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ৩৫ জন এবং ১৬ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম চরচাকে বলেন, “আমরা তালিকা করেছি। তালিকায় যাদের নাম আসছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। এখানে কে, কোন দল করে, তা বিবেচনা করা হবে না। আমাদের প্রতিনিয়ত অভিযানে অনেকে আটক হচ্ছে।”
তোয়াক্কা করে না কাউকে
গত এপ্রিল মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে।
এতে দেখা যায়, চাপাতি হাতে মাথায় কাপড় মোড়ানো ১০ থেকে ১৫ জন যুবক মহড়া দিচ্ছে। তখন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে তারা সবাই ‘পাটালি’ গ্রুপের সদস্য। মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জায়গা দখল, মাদক কারবারে প্রায়ই নাম আসে ‘পাটালি’ গ্রুপের।
গত ১৫ মে এই গ্রুপ চাঁদার জন্য একই পরিবারের সাতজনে কুপিয়ে আহত করে। মাদক কারবার নিয়ে দ্বন্দ্বে গত ১৫ সেপ্টেম্বর ‘পাটালি’ গ্রুপের নেতা ফরহাদকে কুপিয়ে হত্যা করে ‘আরমান-শাহরুখ’ গ্রুপের সদস্যরা। ‘পাটালি’ গ্রুপ আরিফুর রহমান ওরফে চাপা আরিফের মাদক কারবার সহযোগিতা করে। পাটালি গ্রুপ এবং আর-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে।
চাপা আরিফের বিষয়ে কথা হয় পাটালি গ্রুপের এক সদস্যের সাথে। তিনি নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, “চাপা আরিফ হেরোইনের খুচরা কারবার করত। এখন বড় পরিসরে করে। তার মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে পাটালি গ্রুপের সদস্যরা। জেনেভা ক্যাম্প, বেড়িবাঁধ, রায়ের বাজার, মোহাম্মদপুরে তার কারবার রয়েছে। সে অনেকটা অদৃশ্যভাবে থাকে। এমনকি আমাদের অনেক সদস্য তাকে চেনে না।”
গত ১৫ সেপ্টেম্বর ফেসুবকে একটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে। ফুটেজে দেখা যায়, কামরাঙ্গীরচরে একটি সেলুনে চার যুবক চাপাতি এবং পিস্তল হাতে নিয়ে ঢোকার কিছুক্ষণ পর সেলুন থেকে দৌড়ে দুজন বের হয়ে পাশের গলিতে চলে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর আরেকজন রক্তাক্ত অবস্থায় বের হয়ে পালাতে চেষ্টা করলে অস্ত্রধারী যুবকরা তাকে কোপাতে থাকে। একসময় আহত যুবক মাটিতে পড়ে গেলে অস্ত্রধারীরা চলে যায়। পরে জানা গেছে, অস্ত্রধারীরা ছিল ‘আরামান-শাহরুখ’ গ্রুপের। আর আক্রান্ত ব্যক্তি ‘পাটালি’ গ্রুপের নেতা ফরহাদ।
‘পাটালি’ গ্রুপের হাতে ভুক্তভোগী মোহাম্মদপুর ৩৩ নং ওয়ার্ডের বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম অপু। চরচাকে তিনি বলেন, “পাটালি গ্রুপের ছেলেরা আমার বাড়ি ভাঙচুর করছে ২০২৩ সালে। এরা মাদকের স্পট, সরকারি জায়গা দখল করে নার্সারি, রিকশার গ্যারেজ চালায়। তাদের সাথে র্যাব-পুলিশের সাথে ভালো সর্ম্পক না থাকলে কীভাবে এগুলো চালায়? ওদের কোনো রাজনৈতিক শেলটার লাগে না। তারা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা কামায়।”
গত ১২ এপ্রিল বিকেলে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ সড়কের একটি সিসিটিভি ফুটেজ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, প্রকাশ্যে এক যুবককে রাস্তায় ফেলে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে পাঁচ যুবক। পরে ওই যুবকের মুত্যু হয়। নিহত যুবকের নাম এলেক্স ইমন, যিনি ‘এলেক্স’ গ্রুপের প্রধান। ‘আরমান-শাহরুখ’ গ্রুপের সাথে ‘এলেক্স’ গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।
১৫ মে উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরে প্রায় অর্ধশতাধিক কিশোর ও যুবককে বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে দেখা যায়। এ সময় তারা বিভিন্নভাবে তাদের হাতে থাকা অস্ত্র প্রর্দশন করে।
মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরে চাঁদ হাউজিংয়ের একটি ভবনে গিয়ে চাঁদা না পেয়ে মোস্তাকের রহমান খোকন নামের এক ব্যক্তি কিশোর গ্যাং দিয়ে একটি ভবনে ভাংচুর এবং দোকান লুট করান। মোস্তাকের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এই ব্যক্তি জমি কেনা-বেচার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর আদাবরে বড় ছুরি এবং চাপাতি হাতে কয়েকজন কিশোরকে মহড়া দিতে দেখা যায়। এ সময় তারা একটি বাড়ির সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করে।
গ্রেপ্তার-জামিন, আবার অপরাধ
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিং সোসাইটিতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ডেভেলপার কোম্পানি থেকে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে ৮-১০ জন যুবক। এ সময় তারা ওই কোম্পানির অফিসে ঢুকে কর্মচারীদের মারধর করে এবং হৃদয় নামের এক কর্মচারীর হাতে ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। ওই ঘটনার দুই দিন পর ছয় যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া যুবকদের মধ্যে রিফাত হোসেনের বয়স ২২ বছর। তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়। বাকিদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন অপরাধে মামলা রয়েছে।
১০ এপ্রিল ছিনতাই করার সময় মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে ২০ বছর বয়সী দুই যুবককে আটক করে পুলিশ। আটক বিল্লাল নামের একজনের বিরুদ্ধে থানায় চারটি মামলা রয়েছে, যার দুটিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। একটি মামলায় প্রায় ছয় মাসের সাজা খেটে জামিনে বের হয়ে আবারও ছিনতাইয়ে শুরু করে বিল্লাল।
মোহাম্মদপুরের একটি কিশোর গ্যাংয়ের লিডার পিচ্চি আবির। ২৪ বছর বয়সী এই তরুণের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ২২টি। বেশির ভাগই ছিনতাইয়ের মামলা। কিছুদিন সাজা খেটে জামিনে বের হয়েও আবার এই কাজে জড়ান আবির।
বেকারত্ব আর মাদকের কারণে বারবার কিশোর গ্যাং সদস্যরা অপরাধে জড়াচ্ছে বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী। তিনি চরচাকে বলেন, “এই যে কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্য, তাদের বেশির ভাগলেখাপড়া করে না, ড্রপ আউট। আবার তারা কোনো কাজও করে না। তাদের আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং মাদকের খরচ জোগাড় করতে বারবার তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মাদক ও বেকারত্ব কমিয়ে আনা গেলে তাদের গ্যাংগুলোর সংখ্যা কমে আসবে বলে আশা করছি।”
যেভাবে গড়ে ওঠে কিশোর গ্যাং
দক্ষিণ রামপুরার তিতাস রোডে থাকেন সিফাত (ছদ্মনাম)। পড়েন রয়েল ইউনিভার্সিটিতে। ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় সিফাত ও তার বন্ধুদের হাত ধরে এলাকায় গ্যাং তৈরি হয়। তাদের গ্যাংয়ে প্রতিনিয়ত জুনিয়র সদস্য বাড়ছে।
কীভাবে গ্যাং তৈরি হলো জানতে চাইলে সিফাত বলেন, “প্রথমে আমরা কোচিং শেষ করে খালি প্লটে আড্ডা দিতাম। আড্ডা দিতে দিতে ওই জায়গাটা আমাদের দখলে চলে আসে। আমরা বসলে এলাকার অন্য ছেলেরা এখানে আসত না। এই বিষয়টা আমাদের নিজেদেরকে পাওয়ারফুল ফিল করায়।”
সংঘর্ষ ও মারামারি নিয়ে সিফাত বলেন, “সংঘর্ষ বেশির ভাগ অন্য গ্রুপের ছেলেদের সাথে হতো। আমাদের গ্রুপের কেউ খিলগাঁও গেছে, বা তার সাথে ওখানে কোনো ঝামেলা হয়েছে–তখন আমরা তার জন্য ওই গ্রুপের সাথে সংঘর্ষে জড়াতাম। এ রকম গত বছর মালিবাগের একজনের পিঠে ছুরি দিয়ে পোঁচ দিসি। ওই ছেলের প্রায় ২৫টা সেলাই পড়ছে। এখন ওই গ্রুপের সদস্যরাও তো আমাদের খুঁজতেছে মারার জন্য।”
নিজেদের গ্রুপের অস্তিত্ব জানান দিতে পশ্চিম রামপুরার বিভিন্ন দেয়ালে নাম লিখে রাখা হতো জানিয়ে সিফাত বলেন, “আমাদের হ্যাডম দেখে এলাকার নেতারা আমাদের ডেকে তাদের নামে শোডাউন দিতে বলত। এক নেতার পিছনে থাকলে অন্য নেতার সাথে মনোমালিন্য হয়। মারামারি আমরা করি; কিন্তু থানায় গেলে বাইর করে নেতারা। ৫ আগস্টের পর আমাদের কোনো নেতা ছিল না। আমাদের কাছে কোনো দল নাই, গ্রুপের ভাই-ব্রাদাররাই সব।”
অন্য গ্যাংয়ের সাথে দ্বন্দ্বের আরেকটা কারণ ছিনতাই কিংবা ‘ফিটিং দেওয়া’ জানিয়ে সিফাত বলেন, “গ্রুপের অনেক ছেলেপেলে আছে অন্য এলাকার পরিচিত ভাই-ব্রাদারদের কট দেয় (ফাঁসানো)। তখন ওই এলাকার ছেলেরা হামলা করে। আবার দেখা যায়, অন্য এলাকার ছেলেপেলে এখানে এসে নেশা করে অথবা হ্যাডম দেখাতে চায়। তখন তাদের মোবাইল টাকা-পয়সা রেখে দিই পাওয়ার (ক্ষমতা দেখানোর) হিসেবে।”
অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে সিফাত বলেন, “নেতারা পিস্তল দেয় এক-দুই পিছ। সবাইকে দেয় না, যারা ভাইয়ের ক্লোজ, তাদের কাছে থাকে। এগুলো গ্যাঞ্জামের সময় ফাঁকা গুলি করতে লাগে। আবার ছুরি আমরাই বানাই। বিশেষ করে আমরা ছোট টিপ ছুরি (সুইচ গিয়ার) ব্যবহার করি।”
গ্রুপের সদস্যরা বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান–এমন দাবি করে সিফাত বলেন, “গ্রুপের পার্টি করতে জিনিস (অস্ত্র) কিনতে সবাই টাকা দেয় না। এই টাকা দেয় মধ্যবিত্ত পরিবারের যারা আছে, তারা। তারা বিনিময়ে শেল্টার পায়, হ্যাডম পায়, আবার নেশাও করে। মারামারির সময় বেশির ভাগ তারা থাকে, আগে যারা ছিনতাই করত, বিভিন্ন মামলা আসামি, কিংবা মারামরিতে যাদের হাত চালু আছে।”
সমাধানের পথ কী
‘কিশোর’ শব্দের সাথে ‘গ্যাং’ শব্দটা যোগ করার কারণে কিশোররা দিন দিন বিপথগামী হচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ তানভীর রহমান। চরচাকে তিনি বলেন, “সাধারণ সমাজে স্বীকৃতি না পেয়ে কিশোররা নিজেদের দল বা গ্যাংয়ের ভেতর হিরো বা গ্যাংস্টার হিসেবে স্বীকৃতি খোঁজে। ‘গ্যাংস্টার’ শব্দটি তাদের মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম ক্ষমতা জাহিরের অনুভূতি এবং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মানসিকতা তৈরি করে। ফলে নেতিবাচক লেবেলিং তাদের কাছে এক ধরনের আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।”
তানভীর রহমান বলেন, “কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের যে অংশ আবেগ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তা খুব দ্রুত বিকশিত হয়। কিন্তু যুক্তিনির্ভর চিন্তা ও পরিণাম বিবেচনার অংশ পুরোপুরি বিকশিত হয় ২৫ বছর বয়সের দিকে। ফলে কিশোর বয়সে যুক্তির চেয়ে ক্ষণিকের আবেগ বেশি কাজ করে। তাই প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা তাদের ব্যবহার করতে পারে।”
দলবদ্ধ হয়ে অপরাধ করার ফলে অপরাধবোধ কমে যায় উল্লেখ করে মনোবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “গ্যাং বা দলের অংশ হলে ব্যক্তির নিজস্ব নৈতিক দায়িত্ববোধ কমে যায়। তারা মনে করে, আমি একা নই, আমরা দলবদ্ধ।”
কিশোরদের অপরাধ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদযাপন করা বিষয়ে তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও বা ছবি পোস্ট করে তারা ক্ষণিকের জনপ্রিয়তা খোঁজে। প্রতিটি লাইক, কমেন্ট ও ভিউ তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত করে, যা এই অপরাধমূলক আচরণকে পুরস্কৃত করে। এই অনুভূতি তাদের অপরাধ করার পর অপরাধবোধ কমাতে এবং তা সামাজিক মাধ্যমে উদযাপনে উৎসাহিত করে।”
কিশোরদের জন্য ‘গ্যাং কালচার’-এর বিকল্প আত্মপরিচয় তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন তানভীর রহমান। খেলা, স্কাউটিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, থিয়েটার বা প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল কাজে কিশোরদের যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ চরচাকে বলেন, “আমরা মাদক এবং কিশোর গ্যাং নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছি। আমরা কিশোর গ্যাং এবং ছিনতাইপ্রবণ এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করব। তবে এটাও জানাচ্ছি, শুধু পুলিশের পক্ষে এসব সমস্যা নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ জন্য নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। জনতার প্রতিরোধ কিন্তু সবচেয়ে বড় শক্তি।”