ads

ওজন কমানোর ওমাড ডায়েট কী

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ওজন কমানোর ওমাড ডায়েট কী
দিনে একবেলা খেয়েও সুস্থ থাকা যায়। ছবি: ম্যাগনেফিক

ওজন কমানোর জন্য কত ধরণের ডায়েট আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ওমাড। এর মানে হলো ‘ওয়ান মিল অ্যা ডে (ওমাড)’। সম্প্রতি দিনে একবেলা খেয়ে ওজন কমানোর এই পদ্ধতি নিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনদের মধ্যে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বেশ কিছু পুষ্টিবিদ একে দিয়েছেন ‘সবুজ সংকেত’। তবে এই ডায়েট সবার জন্য নয় বলেও তারা সতর্ক করেছে।

ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে এই একবেলার খাবারের ধরন এবং সময়সূচিতে ভিন্নতা আসতে পারে। তবে যারা ওমাড অনুসরণ করেন, তারা সাধারণত তাদের দৈনিক ক্যালরি গ্রহণকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের বা স্বল্পস্থায়ী সময়ের খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন।

Advertisement

ওমাড-এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতাগুলো মূলত উপবাস বা রোজা রাখার সাথে সম্পর্কিত—যেখানে নির্দিষ্ট সময় জুড়ে ক্যালরি গ্রহণ বন্ধ রাখা হয় এবং সার্বিকভাবে দৈনিক খাবারের পরিমাণ কমিয়ে আনা হয়।

ওমাড যেভাবে কাজ করে

ওমাড ডায়েটের নানা উপায় আছে। যেমন-কেউ দিনে মাত্র একবার খেয়ে বাকি পুরো সময় উপোস থাকতে পারেন। আবার কেউ একবেলা পেট ভরে খাওয়ার পাশাপাশি উপবাসের সময়েও সামান্য পরিমাণে হালকা খাবার গ্রহণ করতে পারেন।

এই ধরনের খাদ্যভ্যাস শরীরে ক্যালরির ঘাটতি তৈরি করে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে।

একবেলা খাবার খাওয়ার অন্যান্য উপকারিতার মধ্যে রয়েছে—হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো, রক্তের শর্করার মাত্রা হ্রাস করা এবং শরীরের ইনফ্ল্যামেশন কমানোর সম্ভাবনা।

ওমাড অনুসরণকারী অধিকাংশ মানুষ রাতের খাবারকেই তাদের একমাত্র খাবার হিসেবে বেছে নেন। তবে অনেকে আবার সকালের নাস্তা বা দুপুরের খাবারকেও এখানে প্রাধান্য। এই ডায়েটের কিছু সংস্করণে মূল একবেলার খাবারের পাশাপাশি এক বা দুটি হালকা স্ন্যাক্স খাওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদেরা।

তবে ওমাড অনুসারীরা উপবাসের সময়ে ক্যালরিযুক্ত কোনো কিছুই গ্রহণ করেন না। তারা কেবল তাদের নির্ধারিত সময়ের খাবার থেকেই ক্যালরি গ্রহণ করেন।

হজমপ্রক্রিয়া উন্নত করে

দিনের অধিকাংশ সময় উপোস করলে আমাদের পরিপাকতন্ত্র পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়। এটি বিশেষ করে ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (আইবিএস) বা অন্যান্য পাকস্থলী বা অন্ত্রের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের খাদ্যের সংবেদনশীলতাজনিত ইনফ্ল্যামেশন ও অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে।

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বিহেভিওরাল মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় আইবিএস রোগীদের ফাস্টিং বা উপোস থেরাপি প্রভাব বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, এর ফলে পেটে ব্যথা ও অস্বস্তি, পেট ফাঁপা, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব, দুশ্চিন্তা এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্মের ব্যাঘাত ঘটার মতো উপসর্গগুলোতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে।

ইনফ্ল্যামেশন কমাতে সাহায্য করে

দীর্ঘ সময় উপোস থাকা শরীরে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেশনের প্রভাব ফেলতে পারে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।

শরীরে রোগজীবাণুর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক দূর করতে সাহায্য করে। কিন্তু ইনফ্ল্যামেশন যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে তা আর্থ্রাইটিস, অটোইমিউন রোগ এবং হৃদরোগের মতো নানাবিধ শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী সেল-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, উপবাসের ফলে রক্তে প্রদাহ সৃষ্টিকারী এই ‘মনোসাইট’ কোষের উৎপাদন ধীরে হয়। এজন্য ওমাড ডায়েট সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের উপসর্গ কমাতে ও সার্বিক সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে।  

ওজন কমাতে সাহায্য করে

দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ খুব বেশি না কমিয়েও ওমাড চর্বি পোড়ানোর গতি বাড়ায়, যা ওজন কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

শারীরতত্ত্ব বিষয়ক জার্নাল ফ্রন্টিয়ার্স ইন ফিজিওলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সমপরিমাণ ক্যালরিযুক্ত তিনটি খাবার খাওয়ার তুলনায় সন্ধ্যায় মাত্র একবেলা খাবার খেলে শরীরের মোট ওজন এবং চর্বির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি কমে।

এছাড়া, নির্দিষ্ট সময় বেঁধে খাবার খাওয়ার এই অভ্যাস সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে ‘ফ্যাট অক্সিডেশন’ বা চর্বি জারণ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি করে—যা জমানো চর্বি ভেঙে শক্তি তৈরির একটি মেটাবলিক প্রক্রিয়া।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়

ওমাডের কারণে শরীরে ‘অটোফেজি’ প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। এটি শরীরের এমন একটি টিকে থাকার কৌশল, যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলোকে ধ্বংস করে সেগুলোর কার্যক্ষম অংশ দিয়ে পুনরায় কোষের মেরামত করা হয়।

অটোফেজি প্রক্রিয়াটি কোষের দুর্বল কার্যকরিতার সাথে সম্পর্কিত রোগব্যাধি, যেমন—ক্যান্সার এবং অটোইমিউন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।

তাছাড়া এটি ‘জেনোফেজি’ নামক একটি জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করে, যা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে ধ্বংস করে এবং অণুজীবজনিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।

অটোফেজি সক্রিয় করতে এবং ভাইরাস, ছত্রাক, মোল্ড ও ইস্ট জনিত সংক্রমণের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করতে ওমাড অত্যন্ত কার্যকর একটি কৌশল।

শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি করে

ওমাড ফাস্টিং শরীরে ‘কিটোসিস’ প্রক্রিয়া সক্রিয় করে, যার ফলে শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

কিটোসিস প্রক্রিয়ার সময় শরীর প্রচুর পরিমাণে ‘কিটোন’ নির্গত করে, যা মূলত চর্বি পোড়ানোর একটি মেটাবলিক উপজাত। কিটোন অত্যন্ত কার্যকর একটি জ্বালানি উৎস—বিশেষ করে হৃদপিণ্ড, পেশি এবং মস্তিষ্কের কোষের জন্য। আর এই কারণেই ওমাডের মতো ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং শরীরে শক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে।

স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি কমায়

এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন থাকলেও, উপবাসের সাথে স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, দীর্ঘ সময় উপবাস থাকলে তা প্রাণীদের মস্তিষ্কের ক্ষতি কমায়, স্নায়ুক্ষয় ধীরগতির করে এবং প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিভিত্তিক কার্যক্ষমতা উন্নত করে।

এটি ইঙ্গিত দেয় যে, উপবাস বা ফাস্টিং ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার্স এবং পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

সবার জন্য ওমাড নয়

ওমাড ডায়েটের অনেক উপকারিতা থাকতে পারে। তবে এই ডায়েট সবার জন্য নয়। কারণ এটি খুব কঠোর ডায়েট পদ্ধতি। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা লাগে দেখে এটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা, শিশু ও কিশোর-কিশোরী, টাইপ-১ ও ইনসুলিন গ্রহণকারী ডায়াবেটিস রোগী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত বা নিয়মিত ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তিদের দিনে মাত্র একবেলা খাবার খাওয়া উচিত নয়।

এছাড়া যারা ওমাড ডায়েট অনুসরণ করতে চান তারা শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের পরামর্শ নেবেন।   

তথ্যসূত্র: হেলথলাইন, ড. বার্গ

সম্পর্কিত