প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিককে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে জমা দেওয়া ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
কমিশন বলেছে, রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশ ও ভৌগোলিক অঞ্চলে সক্রিয় এজেন্ট বা সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে ২৯টি দেশের নাগরিককে পাচার করেছে, যাতে তাদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া যায়—এ বিষয়ে জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
জাতিসংঘে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার এক সপ্তাহ পর গত সোমবার রাতে তা প্রকাশ করা হয়।
২৯টি দেশ হলো—বাংলাদেশ, আজারবাইজান, বেলারুশ, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, ভারত, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, শ্রীলঙ্কা, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে।
কমিশন জানায়, ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা গেছে, ২০২৪ সাল থেকে নির্দিষ্ট কিছু দেশ ও ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে বিদেশি নাগরিকদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের একটি সুস্পষ্ট ধারা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের পর এসব ব্যক্তিকে দ্রুত ভ্রমণের জন্য চাপ দেওয়া হতো। সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের যাত্রা করতে বলা হতো। নিয়োগকারী এজেন্টরা ভিসা ও বিমানের টিকিটের ব্যবস্থা করত, থাকার জায়গা বুক করত এবং অন্য আনুষঙ্গিক আয়োজন সম্পন্ন করত। সংশ্লিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের স্থানীয় নিয়মকানুন অনুযায়ী ভ্রমণের কাগজপত্রের ব্যবস্থা করা হতো।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্তদের কেউ ব্যবসায়িক ভিসা সংগ্রহ করত, কেউ স্বল্পমেয়াদি পর্যটন ভিসা পেত, আবার কারও ভিসার প্রয়োজনই হতো না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “উদাহরণস্বরূপ, কমিশন বাংলাদেশি নিয়োগপ্রাপ্তদের দেওয়া ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি পেয়েছে। এসব ভিসায় উল্লেখ ছিল, রাশিয়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।”
কেনিয়ার নাগরিকদের কাজের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা সত্ত্বেও দুই সপ্তাহ থেকে চার মাস মেয়াদি পর্যটন ভিসা দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র, কলম্বিয়া ও পেরুর নাগরিকদের নিয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্রে তুরস্ক বা রাশিয়ায় পর্যটনের উদ্দেশ্যে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। প্রায়ই তাদের মুঠোফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতো। তখন তারা জানতে পারে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেসামরিক কোনো কাজ নয়, বরং তাদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পরে এসব ব্যক্তিকে ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে মোতায়েন করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভুক্তভোগীদের দেশত্যাগ, নিখোঁজ হওয়া, আহত হওয়া, মৃত্যু বা আটক হওয়ার ঘটনা তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব ফেলে। স্বজনদের খুঁজে বের করতে পরিবারগুলোকে ব্যাপক তৎপরতা চালাতে হয়েছে।
তবে কতজন বাংলাদেশি নাগরিককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের কতজন নিহত বা আহত হয়েছে কিংবা কতজন নিখোঁজ রয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত প্রত্যেক বিদেশি নাগরিকই যে পাচারের শিকার হয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণও এতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।