Advertisement Banner

কাফকায়েস্ক আসলে কী?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কাফকায়েস্ক আসলে কী?
ছবি: এআই

“এভ্রিথিং ইউ লাভ ইজ ভেরি লাইকলি টু বি লস্ট, বাট ইন দ্য এন্ড, লাভ উইল রিটার্ন ইন আ ডিফরেন্ট ওয়ে”

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানি এই কথাটি কাফকা বলেছিলেন এক শিশুকে। খুব কাঙ্ক্ষিত কিছু না পেয়ে, কিছু হারিয়ে ফেলে কিংবা ভালোবাসার মানুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে আমরাও অহরহ এই লাইনটা বলি, কখনো নিজেকে বা কখনো অন্যকে বুঝ দিতে। আলাপ শুরু করার সুবিধার্থে আমিও এই লাইন দিয়েই শুরু করলাম। ১০২ বছর আগে আজকের দিনেই নিজের ৪১ তম জন্মদিনের মাসখানেক আগে ফ্রাঞ্জ কাফকা মারা যান।

১৮৮৩ সালের কথা। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের প্রাগ শহরে জন্ম হয় কাফকার। জীবিকার তাগিদে যোগ দেন এক বীমা কোম্পানিতে। দিনভর অফিসের ডেস্কে ফাইল চালাচালি শেষে তার আসল দিন শুরু হতো রাতে আর ছুটির দিনে। কলম হাতে বসতেন তিনি। অফিসের করিডোরে কান পাতলে যে ফিসফাস শোনা যেত, টেবিলে টেবিলে ফাইলের যে পাহাড় জমত সেসব গল্পই উঠে আসত তার লেখায়।

আমলাতন্ত্রের গোলমেলে ধোঁয়াশার আড়ালে কী লুকিয়ে থাকে? ফ্রাঞ্জ কাফকা ঠিক সেখানেই আলো ফেলেছিলেন। টেনে হিঁচড়ে সামনে এনেছিলেন লক্ষ্যহীন এক রাজনৈতিক শ্রেণী, দিশেহারা প্রশাসন আর টেবিলের ওপাশে বসে থাকা প্রতিহিংসাপরায়ণ কর্মকর্তাদের আসল রূপ।

তার বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দ্য মেটামরফোসিস’। গল্পের নায়ক সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ আবিষ্কার করে, সে একটা বিশাল পোকা হয়ে গেছে! অথচ নিজের এই ভয়ানক রূপান্তর নিয়ে ভাবার চেয়েও তার বড় দুশ্চিন্তা ছিল- হায় হায়, আজ অফিসে যেতে দেরি হয়ে গেল না তো!

ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

এই লেখাগুলো থেকেই জন্ম নিল এক নতুন শব্দ, ‘কাফকায়েস্ক’ (Kafkaesque)। এর মানে হলো গোলকধাঁধায় ঘেরা এক দুঃস্বপ্নের জগৎ। যেখানে ফর্ম, অনুমতিপত্র, দস্তখত আর চুক্তির অন্তহীন বেড়াজাল তৈরিই হয়েছে শুধু নিয়ম বাঁচিয়ে রাখার জন্য, মানুষের উপকারের জন্য নয়।

এরকম জুন মাসেই বিদায় নিয়েছিলেন এই সাহিত্যিক। তিনি বেঁচে আছেন তার সযত্নে রেখে যাওয়া গল্পগুলোর মাঝে, বেঁচে আছেন পল অস্টার, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, সালমান রুশদি কিংবা মার্গারেট অ্যাটউডের মতো লেখকদের রচনায়, যারা কাফকাকে গুরু মেনে নিজেদের কলম ধরেছিলেন।

কাফকা যখন লিখছেন, তখন তার সমসাময়িক ভার্জিনিয়া উলফ কিংবা টি এস এলিয়টরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের হাহাকার তুলে ধরছেন। তারা দেখাচ্ছেন এক বিধ্বস্ত মহাদেশ ও এক হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মকে। বিজ্ঞান মানুষকে একটা সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধ এসে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল। সাধারণ মানুষের মনে তখন প্রশাসনের প্রতি তীব্র অবিশ্বাস। ইউরোপের যে বুদ্ধিজীবীরা একসময় যুক্তি আর বিজ্ঞানের জয়গান গাইতেন, তারাই পড়ে গেলেন চরম খাদের কিনারে।

কাফকার গল্পগুলো এই হতাশার চাদরেই ঢাকা ছিল। তিনি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন- আধুনিকতার এই দেমাগ কতটা ফাঁপা। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের কথাই ধরা যাক। সেখানে এক সকালে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। অথচ বেচারা সারা জীবন পার করেও কখনোই জানতে পারল না তার অপরাধটা কী ছিল!

ছবি: স্ক্রিনশট
ছবি: স্ক্রিনশট

কাফকার লেখা নিয়ে অনেক আইনি লড়াইও হয়েছে। সবচেয়ে বড় আইনি লড়াইটি হয় ২০০৭ থেকে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে ইসরায়েলের আদালতে। প্রশ্ন ছিল- কাফকার পাণ্ডুলিপির মালিক কে? ইসরায়েল নাকি জার্মানি? ইসরায়েলের দাবি ছিল কাফকা ইহুদি লেখক, তাই লেখাগুলো তাদের প্রাপ্য। অন্যদিকে জার্মানির দাবি ছিল কাফকার ভাষা ছিল জার্মান। শেষ পর্যন্ত আদালত ইসরায়েলের পক্ষেই রায় দেয়।

২০২৪ শালে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এভ্রিওয়ান ওয়ান্টস আ পিস অব কাফকা, আ রাইটার হু রিফিউসড টু বি ক্লেইমড শীর্ষক লেখায় লেখক বেনিয়ামিন বালিন্ত লিখেছিলেন-

“তবে কাফকার লেখার আসল মর্ম বোঝা যায় পূর্ব জেরুজালেমের এক ক্লাসরুমে। সেখানকার ফিলিস্তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে এই মালিকানার লড়াইয়ের কোনো মূল্য ছিল না। ‘দ্য ট্রায়াল’ উপন্যাসের মূল চরিত্র জোসেফ কের বিনা অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া এবং আদালতের অন্তহীন চক্কর কাটার গল্পটিকে তারা নিজেদের জীবনের নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছিল।

এক ফিলিস্তিনি ছাত্রী বলেছিল, “আদালতে আমাদের উচ্ছেদ মামলাও কাফকার গল্পের মতো- কখনো সম্পূর্ণ খালাস পাব না, শুধু উচ্ছেদের সময়টা আজ থেকে কাল পিছিয়ে দিতে পারি।”

কাফকা নিজে কখনো কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা গণ্ডিতে আটকে থাকতে চাননি। তিনি সব কিছু থেকে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। তার এই সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিয়ে গত এক শতাব্দীর যুদ্ধ দেখলে এই নির্লোভ লেখক হয়তো নিজেই হেসে উঠতেন। কারণ তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “আমার যা কিছু আছে, তার সবকিছুই আসলে আমার বিরুদ্ধে চলে যায়।”

অবশ্য কাফকা নিজে কখনো কোনো নির্দিষ্ট দেশ, জাতি বা গণ্ডিতে আটকে থাকতে চাননি। তিনি সব কিছু থেকে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। তার এই সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার আইনি লড়াই দেখলে এই নির্লোভ লেখক হয়তো নিজেই হেসে উঠতেন। কারণ তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “আমার যা কিছু আছে, তার সবকিছুই আসলে আমার বিরুদ্ধে চলে যায়।”

সম্পর্কিত