রাত ১১টা। হোস্টেলের ঘরে আপনি একা বসে আছেন। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে অজস্র নোটিফিকেশন, অথচ চারপাশের এই কোলাহলের মধ্যেও মনজুড়ে নেমে এসেছে এক নিস্তব্ধ শূন্যতা। মনে হচ্ছে, চারপাশে শত মানুষ থাকা সত্ত্বেও আপনি যেন জনমানবহীন কোনো দ্বীপে একা দাঁড়িয়ে আছেন।
এটি কেবল কোনো একজন ব্যক্তির বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত নয়; বরং এটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জটিল এক জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে একজন প্রতিনিয়ত একাকিত্বের মধ্য দিয়ে যান। কিন্তু প্রযুক্তির এই যুগে, যেখানে যোগাযোগের হাজারো মাধ্যম আঙুলের ডগায়, সেখানে মানুষ কেন এত একা? একাকিত্ব কি কেবলই মানুষের মানসিক দুর্বলতা, নাকি আমাদের আধুনিক সমাজকাঠামোই মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে?
একাকিত্ব আসলে কী?
একাকিত্বের অনুভূতিকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে সম্পর্কের তিনটি ভিন্ন রূপকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন:
১. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (সোশ্যাল আইসোলেশন): এটি একটি পরিমাপযোগ্য বস্তুনিষ্ঠ অবস্থা। একজন মানুষের সামাজিক যোগাযোগ কতটা সীমিত এবং তিনি কতজন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তা দিয়ে এটি হিসাব করা হয়।
২. একাকিত্ব (লোনলিনেস): এটি সম্পূর্ণই একজন ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি। একে বলা যায় ‘উপলব্ধ সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’। অর্থাৎ, একজন মানুষ সম্পর্কে ঠিক কতটা আন্তরিকতা চান এবং বাস্তবে কতটা পাচ্ছেন—এই দুইয়ের ভেতরের গুণগত তফাত থেকেই একাকিত্বের জন্ম হয়।
৩. স্বেচ্ছা নিঃসঙ্গতা (সলিসিটিউড): এটি নিজের ইচ্ছায় একা সময় কাটানো। এই নিঃসঙ্গতা ইতিবাচক, যা মানসিক প্রশান্তি, আত্মপ্রতিফলন ও গভীর চিন্তার সুযোগ তৈরি করে।
চিকিৎসা ও আচরণগত বিজ্ঞানের সাময়িকী ‘অ্যানালস অব বিহেভিওরাল মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, একা কাটানো সময় আর একাকিত্বের অনুভূতির মধ্য সরাসরি সম্পর্ক বেশ দুর্বল। মানুষের ভিড়ে, ব্যস্ত অফিসে কিংবা শত শত সহপাঠীর ক্যাম্পাসে থেকেও গভীর একাকিত্ব অনুভব করা সম্ভব। কারণ সমস্যাটি মানুষের সংখ্যায় নয়, বরং সম্পর্কের গভীরতা ও অনুভূতির জায়গায়।
মস্তিষ্কের গঠন ও বেঁচে থাকার তাগিদ
মানুষ বিবর্তনীয়ভাবেই সঙ্গপ্রিয়। প্রাক-ঐতিহাসিক যুগে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা, খাবারের সন্ধান ও নিরাপত্তার তাগিদে মানুষ একসাথেবদ্ধ হয়ে বাস করত। বেঁচে থাকার এই প্রয়োজন থেকেই মানুষের মধ্যে ‘মিলেমিশে থাকার তাগিদ’ জন্ম নিয়েছে, যা মানবচরিত্রের এক মৌলিক ভিত্তি।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী জন কাসিওপোর মতে, ক্ষুধা বা তৃষ্ণার মতোই একাকিত্ব হলো শরীরের একটি জৈবিক সংকেত। খাবার না পেলে শরীর যেমন ক্ষুধার জানান দেয়, তেমনি একাকিত্ব আমাদের সতর্ক করে যে আমাদের নিরাপত্তা ও মানবিক সম্পর্কের জায়গায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
২০০৩ সালে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত ড. নাওমি আইজেনবার্গার এবং তার সহকর্মীদের গবেষণায় বলা হয়, মানুষ যখন সমাজ থেকে বর্জন বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতিতে ভোগে, তখন মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স ও ইনসুলা নামের দুটি অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, শারীরিক আঘাতের ব্যথা প্রক্রিয়াজাত করতেও মস্তিষ্কের এই অংশগুলো কাজ করে। অর্থাৎ, অবহেলা বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে আমাদের মস্তিষ্ক শারীরিক আঘাতের মতোই মারাত্মক মনে করে।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’-এ ২০০৯ সালের ৩১ আগস্ট শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-স্নায়ুবিজ্ঞানী জন টি. কাসিওপো এবং লুইস সি. হক্লির প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে উঠে আসে, দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভুগলে আমাদের মস্তিষ্ক এক অদ্ভুত অতি-সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। এর ফলে চারপাশের একেবারে সাধারণ ও স্বাভাবিক আচরণকেও মানুষ অবচেতনভাবেই সামাজিক হুমকি বা অবহেলা মনে করে ভুল করতে শুরু করে।
স্ব-বলবৎ চক্র। ছবি: চরচা গ্রাফিক্স
কাসিওপো ও হক্লি একাকিত্বকে একটি অদৃশ্য ‘স্ব-বলবৎ চক্রের’ ভেতর দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন একটি মানসিক ফাঁদ বা চক্র, যা সাধারণ একাকিত্ব দিয়ে শুরু হলেও মানুষের নিজের চিন্তাভাবনা এবং আচরণের কারণে ধীরে ধীরে আরও বড় আকার ধারণ করে এবং মানুষ নিজেই নিজেকে এর ভেতরে বন্দি করে ফেলে।
এই চক্রটি মূলত কয়েকটি ধারাবাহিক মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্বে ভুগলে মানুষের মনে অবচেতনভাবেই সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় তৈরি হয়, যার ফলে মস্তিষ্ক এক ধরনের অতি-সতর্ক অবস্থায় চলে যায় এবং চারপাশের একেবারে সাধারণ ও স্বাভাবিক আচরণকেও নেতিবাচক বা ক্ষতিকর বলে মনে করতে শুরু করে। এই ভুল বোঝাবুঝির কারণে কেউ হয়তো ব্যস্ততার জন্য স্বাভাবিক আচরণ করেছে, কিন্তু একাকী মন ধরে নেয় যে তাকে ইচ্ছা করেই এড়িয়ে চলা হচ্ছে বা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এভাবে বারবার আঘাত পাওয়া বা ছোট হওয়ার ভয় থেকে বাঁচতে ব্যক্তি তখন নিজেই সবার সাথে মেলামেশা বন্ধ করে দেয় এবং সামাজিক আড্ডা এড়িয়ে নিজের চারপাশে একটি আত্মরক্ষামূলক দেয়াল তুলে নেয়। মেলামেশা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তার জীবনে নতুন কোনো ভালো যোগাযোগ বা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ঘটার সুযোগ থাকে না, যা দেখে চারপাশের মানুষও একসময় স্বাভাবিক নিয়মে দূরে সরে যায়। মানুষের এই দূরে সরে যাওয়া ব্যক্তির মনে আগের সেই ভুল ধারণাকেই আরও সত্য প্রমাণ করে এবং তার একাকিত্বের অনুভূতিকে আরও গাঢ় করে তোলে। সহজ কথায়, একাকিত্ব মানুষকে এমন এক ভুল চশমা পরিয়ে দেয়, যার কারণে সে নিজেই মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যায় এবং সেই তৈরি হওয়া দূরত্ব তাকে পুনরায় আরও গভীর একাকিত্বের গোলকধাঁধায় বন্দি করে ফেলে।
তবে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সতর্কতা মনে করিয়ে দেন। একাকিত্বে থাকা মানুষের মস্তিষ্কে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া বা পরিবর্তন দেখা গেলেও, এটি মূলত একটি সহ-সম্পর্কভিত্তিক পর্যবেক্ষণ। অর্থাৎ, একাকিত্বই কি সরাসরি মস্তিষ্কের এই নেতিবাচক পরিবর্তনগুলো ঘটাচ্ছে, নাকি মস্তিষ্কের অন্য কোনো জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফলে মানুষ এভাবে একাকী বোধ করছে—তা চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনো নিশ্চিত কারণ বা প্রভাব হিসেবে গবেষণাধীন।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে একাকিত্বের প্রভাব
একাকিত্বের অনুভূতিটা আসলে কেমন? এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা, একটা শূন্য বারান্দা, আর বুকের ভেতর থমথমে নীরবতা। অনেকেই একে সাময়িক মন খারাপ বলে উড়িয়ে দেন। ভাবেন, একটা ঘুম দিলে বা দুটো গান শুনলেই বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। একাকিত্ব কেবল মন খারাপের গল্প নয়, এটি একটি শারীরিক সংকেত, যা সরাসরি শরীরের ওপর আঘাত হানে।
২০২৩ সালে 'নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার' সাময়িকীতে প্রায় ২২ লাখ মানুষের ওপর করা এক গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়। সেখানে দেখা যায়, সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মানুষের অকালমৃত্যুর ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় ৩২ শতাংশ বেশি। আর যারা প্রতিনিয়ত তীব্র একাকিত্বে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে ১৪ শতাংশ। হৃদযন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের ওপরও এর প্রভাব ফেলে; সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় ৩৪ শতাংশ, আর একাকিত্বের কারণে ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে প্রায় ৯ শতাংশ।
কিন্তু কেন এমন হয়? মানুষ যখন একা হয়ে পড়ে, শরীর অবচেতনভাবেই নিজেকে এক যুদ্ধক্ষেত্রে আবিষ্কার করে। রক্তের মধ্যে ‘কর্টিসল’ নামের স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। এর ফলে রাতের পর রাত ঘুম হয় না, আর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে থাকে।
এই মন খারাপের পথ ধরে মানুষ ধীরে ধীরে গভীর বিষণ্নতার দিকে চলে যায়। নরওয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা সংক্রান্ত জাতীয় জরিপ ‘শট’ স্টাডির অংশ হিসেবে ২০২২-২০২৩ সালে একটি গবেষণা করা হয়। নরওয়ের ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ এবং বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা যৌথভাবে এটি পরিচালনা করেন। এ গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র একাকিত্বের মধ্য দিয়ে যাওয়া একজন তরুণ বা তরুণীর পরবর্তী এক বছরে গুরুতর মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে ঠিক দ্বিগুণ—নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ২.০২ গুণ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ২.৬৪ গুণ।
তাই একাকিত্ব কোনো সাধারণ উদাসীনতা নয়। এটি মূলত শরীরের পানির তৃষ্ণার মতোই একটি জরুরি সংকেত। পানির অভাবে শরীর যেমন আকুল হয়, আমাদের মন ও অস্তিত্বও তেমনি আরেকটা মানুষের স্পর্শ, একটু ভরসা আর নিবিড় বন্ধুত্বের জন্য ব্যাকুল হয়। এই সংকেতকে অবহেলা করার অর্থ হলো নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
আধুনিক সমাজ, নগরজীবন ও অর্থনীতির প্রভাব
একাকিত্বকে কি শুধুই মানিয়ে নিতে না পারার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলা যায়? নাকি আমাদের আধুনিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণেই মানুষ দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে?
কার্ল মার্ক্সের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সামাজিক ‘বিচ্ছিন্নতা’ বা অ্যালিয়েনেশনের ধারণায় বলা হয়েছিল, পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থায় শ্রমজীবী মানুষ তার কাজের ফল, প্রক্রিয়া, নিজের অস্তিত্ব এবং সমাজের অন্য মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জীবন যখন কেবল বাজার ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন মানুষে মানুষে অকৃত্রিম মানবিক যোগাযোগের সুযোগ কমে আসে।
পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞানী এরিখ ফ্রম বলেন, আধুনিক মানুষের প্রধান সংগ্রাম হলো সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। কিন্তু সমাজ যদি ব্যক্তিস্বার্থ আর ভোগবাদকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়, তবে গভীর মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউমান তার ‘লিকুইড মডার্নিটি’ বা তরল আধুনিকতা ধারণায় ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে আধুনিক সমাজের বন্ধনগুলো দিন দিন ক্ষণস্থায়ী, ভঙ্গুর ও স্বার্থকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
অবহেলাও মস্তিষ্কে শারীরিক আঘাতের মতোই ব্যথা তৈরি করে। ছবি: চরচা গ্রাফিক্স
নগরজীবনের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানী জর্জ জিমেল দেখিয়েছিলেন, শহরের অতিরিক্ত কোলাহল, ভিড় ও গতির সঙ্গে তাল মেলাতে নাগরিকরা একধরনের ‘আত্মরক্ষামূলক উদাসীনতা’ তৈরি করে। ব্যস্ত নগরজীবনে টিকে থাকতে এই কৌশল সাহায্য করলেও, তা মানুষের মাঝে আন্তরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে দেয়াল তুলে দেয়।
বাস্তব জগতের কয়েকটি পরিবর্তনের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়:
নগরায়ণ ও কাজের প্রয়োজনে স্থানান্তর: গ্রামীণ চেনা সামাজিক পরিবেশ ছেড়ে কাজের জন্য শহরে গিয়ে মানুষ প্রায়ই একাকী হয়ে পড়ে। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে লাখ লাখ মানুষের ভিড় থাকলেও প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিবেশ বা অবসর সময় খুব সীমিত।
পরিবারের রূপান্তর: যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যা বাড়ায় দৈনন্দিন জীবনের মানসিক নিরাপত্তার জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
কাজের সংস্কৃতি ও অনিশ্চয়তা: দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ঘরে বসে কাজের (রিমোট ওয়ার্ক) সংস্কৃতি সামাজিক যোগাযোগের পথ অনেকটাই বন্ধ করে দিয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পুরোপুরি ঘরে বসে কাজ করেন, তাদের একাংশের মধ্যে দৈনন্দিন একাকিত্বের উপস্থিতি বেশি।
উন্মুক্ত স্থানের অভাব: ক্যাফে, লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, পার্ক বা কমিউনিটি সেন্টারের মতো অলাভজনক ও খোলামেলা জায়গাগুলো কমে আসছে। ফলে মানুষের স্বাভাবিক মেলামেশার সুযোগও কমে গেছে।
প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া: আমরা কি সত্যিই যুক্ত হচ্ছি?
আধুনিক প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়া কি আমাদের একা করে দিচ্ছে? সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোতে এর একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
‘অ্যানালস অব দ্য নিউ ইয়র্ক একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের পরিমাণের সঙ্গে একাকিত্ব বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক খুবই কম। অর্থাৎ, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করলেই মানুষ একা হয়ে যায়—এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সত্যি নয়।
এখানে মূল বিষয়টি হলো মানুষ কীভাবে এটি ব্যবহার করছে:
নিষ্ক্রিয় ব্যবহার: কেবল অন্যের সাজানো জীবনের ছবি বা ভিডিও দেখে যাওয়া, নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করা এবং ‘সবাই উপভোগ করছে কিন্তু আমি পিছিয়ে পড়ছি’ (ফোমো)—এমন মনোভাব তৈরি হলে একাকিত্ব আরও বাড়ে।
সক্রিয় ব্যবহার: কারো সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করা, সমমনা কোনো গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকা কিংবা পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলে তা একাকিত্বের বোধ কমাতে সাহায্য করে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যারা আগে থেকেই একাকিত্বে ভুগছেন, তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় কাটান। ফলে এটি একাকিত্বের মূল ‘কারণ’ না হয়ে একাকিত্বের ‘ফল’ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
জীবনের নানা ধাপে একাকিত্ব
একাকিত্ব জীবনের যেকোনো বয়সেই আসতে পারে, তবে বয়সভেদে এর কারণ ও রূপ আলাদা হয়।
তরুণ প্রজন্ম
সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে তরুণদের চারপাশে সবসময় বন্ধুবান্ধব থাকে। কিন্তু ‘জার্নাল অব অ্যাডোলেসেন্স’-এ প্রকাশিত চার দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তরুণদের মধ্যে একাকিত্বের হার ক্রমাগত বাড়ছে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, ভবিষ্যৎ ও ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা এবং সম্পর্কের ওঠানামা এর প্রধান কারণ।
বাংলাদেশেও তরুণদের একাকিত্ব নিয়ে করা গবেষণাগুলো বেশ উদ্বেগের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে করা গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী একাকিত্বের ঝুঁকিতে আছেন। গ্রামীণ এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থী, নিম্ন আয়ের পরিবার এবং একক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে এই হার বেশি। অন্যদিকে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ওপর করা আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২৭.৩ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চমাত্রার এবং ৫২.২ শতাংশ শিক্ষার্থী মাঝারি মাত্রার একাকিত্বে ভুগছেন।
প্রবীণ জনগোষ্ঠী
বয়স্ক মানুষদের একাকিত্বের কারণগুলো কিছুটা ভিন্ন। অবসর গ্রহণ, শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, জীবনসঙ্গী বা প্রিয়জনকে হারানো এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে তারা একা হয়ে পড়েন। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব অ্যাডভান্সড হিউম্যানিটিজ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, নওগাঁর একটি গ্রামীণ এলাকায় ৬৫.৮ শতাংশ প্রবীণ মানুষ একাকিত্বের কথা জানিয়েছেন। অন্যান্য গবেষণাতেও দেখা গেছে, ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণদের মধ্যে একাকিত্বের ঝুঁকি অন্যান্য বয়সের তুলনায় অনেক বেশি।
নারী ও পুরুষের পার্থক্য
ফ্রামিংহাম হার্ট স্টাডির ৪০ বছরের ডেটা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পুরুষদের (১৭.৫ শতাংশ) তুলনায় নারীরা (২৩.৭ শতাংশ) বেশি একাকিত্বের কথা প্রকাশ করেন। তবে এর মানে এই নয় যে পুরুষরা কম একাকী। গবেষকদের মতে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পুরুষরা নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে বা সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করেন। ফলে তাদের একাকিত্ব অনেকটাই অপ্রকাশিত থেকে যায়। তবে সার্বিক বিচারে নারী ও পুরুষের একাকিত্বের মাত্রায় তেমন বড় তফাত নেই, যদিও তা প্রকাশের ধরন ভিন্ন।
দর্শনের দৃষ্টিতে একাকিত্ব ও স্বাধীনতা
দার্শনিক আলোচনায় একাকিত্বের রূপটি নানাভাবে উঠে এসেছে। গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মানুষকে ‘সামাজিক জীব’ বললেও কিয়ের্কেগার্ড বা নিটশের চিন্তায় নিঃসঙ্গতার ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই ধরা পড়েছে। কিয়ের্কেগার্ড বা সার্ত্রের মতো অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের মতে, জীবনের আসল অর্থ ও নিজের স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করতে হলে মানুষকে নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়েই যেতে হয়।
রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ডট তার বিখ্যাত ‘দ্য অরিজিন্স অব টোটালিটারিয়ানিজম’ গ্রন্থে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখিয়েছেন। তার মতে, নিজের ইচ্ছায় নিঃসঙ্গ থাকা মানুষের চিন্তাশক্তি বাড়ায়। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার বিচারবুদ্ধি অবশ করে দেয়। ইতিহাসজুড়ে স্বৈরতান্ত্রিক মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের এই অসহায় একাকিত্বকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
একই সঙ্গে, আধুনিক সমাজে ব্যক্তি স্বাধীনতার বিকাশ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক। কাউকেই এখন বাধ্য হয়ে কোনো দমবন্ধ পারিবারিক বা সামাজিক নিয়মে আটকে থাকতে হয় না। তবে এই স্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিকভাবে যুক্ত থাকার অনুভূতি বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর উদ্দেশ্য গ্রামীণ বা পুরোনো সমাজব্যবস্থাকে নির্দোষ বলে দাবি করা নয়—কারণ সেখানেও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব কিংবা অতিরিক্ত নজরদারি ছিল। বরং মূল লক্ষ্য হলো, নিজের স্বাধীনতা বজায় রেখেও কীভাবে মানুষের সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়, তার পথ খোঁজা।
একাকিত্ব কাটানোর উপায়
আমাদের সমাজে একটি চেনা ধারণা আছে—কেউ একাকীত্বে ভুগলে মনে করা হয় সেটি তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। অনেকেই উপদেশ দেন, ‘‘ঘরে বসে না থেকে বাইরে যাও, মানুষের সঙ্গে মেশো!’’ কিন্তু বাস্তব জীবন এত সহজ নয়। কাজের চাপ, আর্থিক টানাটানি আর ইট-কাঠের এই যান্ত্রিক শহর যদি মানুষকে একটু নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ না দেয়, তবে কেবল ব্যক্তিগত চেষ্টায় একাকিত্বের প্রাচীর ভাঙা সম্ভব নয়।
তাই একাকিত্বের এই সমস্যা থেকে বের হতে হলে আমাদের তিনটি স্তরে কাজ করতে হবে:
১. ব্যক্তিগত স্তর: প্রথম পরিবর্তনটি আসতে হবে নিজের মধ্য থেকে। এখানে উদ্দেশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার ফ্রেন্ডলিস্ট বড় করা নয়; বরং শত মানুষের মাঝে অন্তত এমন একজনকে খুঁজে নেওয়া, যার কাছে মনের কথা নিঃসঙ্কোচে বলা যায়। সম্পর্কের সংখ্যার চেয়ে তার আন্তরিকতা ও গভীরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের অনুভূতি প্রিয়জনের সাথে ভাগ করে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে কোনো দ্বিধা ছাড়াই পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. সামাজিক স্তর: যুক্তরাজ্য বা সুইডেনের মতো দেশগুলোতে একাকিত্ব দূর করতে ‘সামাজিক প্রেসক্রিপশন’ (সোশ্যাল প্রেসক্রাইবিং) নামের একটি চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসকরা কেবল মানসিক অবসাদের ওষুধ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না; তারা প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন—বিকেলে ফুটবল খেলা, কোনো আর্ট ক্লাবে যুক্ত হওয়া কিংবা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই পদ্ধতির প্রশংসা করেছে। ওষুধ যেখানে কাজ করে না, মানুষের সঙ্গে সামাজিক সংযোগ সেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
৩. কাঠামোগত স্তর: নীতি নির্ধারকদের উদ্যোগে বড় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শহরগুলোকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার তাগিদ পায়। হাঁটার মতো ফুটপাত, ছায়াঘেরা পাবলিক পার্ক এবং পাড়ায় পাড়ায় কমিউনিটি সেন্টার গড়ে তোলা দরকার। এর পাশাপাশি কাজের সময়সীমার এমন ভারসাম্য আনতে হবে যেন মানুষ দিনশেষে পরিবার ও বন্ধুদের সময় দিতে পারে। রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যনীতিতে নাগরিকরা কতটা সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন, সেই সূচকটি যুক্ত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
একাকিত্বের এই অন্ধকার কোনো মানুষের পক্ষে একা দূর করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র যখন উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে, সমাজ যখন সহযোগিতার হাত বাড়াবে এবং ব্যক্তি যখন নিজের মনের দরজা খুলবে—তখনই কেবল একাকিত্বের এই বৈশ্বিক সংকট দূর করা সম্ভব।
নতুন করে ভাবনার সময়
একাকিত্ব মানুষের অভিজ্ঞতার এক জটিল অধ্যায়। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না। আমাদের বিবর্তন ও মানসিক গঠন আমাদের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে শেখায়; অন্যদিকে আধুনিক নগরজীবন, কাজের সংস্কৃতি ও পরিবর্তিত সামাজিক ব্যবস্থা সেই যুক্ত হওয়ার পথকে কঠিন করে তোলে।
একাকিত্ব একইসঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি ও সামাজিক ব্যবস্থার ফল। তাই এর সমাধান কেবল মানুষকে পরিবর্তনের উপদেশ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং এমন এক সমাজ ও পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব স্বাধীনতা বজায় রেখেও অন্যদের সাথে গভীর ও অর্থবহ সম্পর্কের বন্ধনে যুক্ত হতে পারে।