মহাকাশে অস্ত্র থাকা নতুন কোনো বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস বা অকার্যকর করার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তবে এবার প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, তাদের তৈরি একটি মহাকাশ অস্ত্র কক্ষপথে মোতায়েন রয়েছে। এই ঘোষণার পর মহাকাশের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ এবং সেখানে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা সামনে এসেছে। এই ঘোষণার পর মহাকাশে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা কতটা বাড়তে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
কেন মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র থাকার ঘোষণা আলোচনায়?
এই ঘোষণা মূলত প্রতিপক্ষকে সাবধান করার জন্যই। এমনটাই বলা হয়েছে মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসে প্রকাশিত ক্রিস ও’মার্নের লেখা এক নিবন্ধে। তাতে বলা হয়, মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ চীন ও রাশিয়াকে লক্ষ্য করেই এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। দেশ দুটি এরই মধ্যে স্যাটেলাইটবিরোধী (এএসএটি) অস্ত্র কর্মসূচি তৈরি করেছে।
গত মাসে দেওয়া এক ঘোষণায় মার্কিন এয়ার ফোর্সের সচিব ট্রয় মেইঙ্ক মহাকাশে সামরিকীকরণের দিকে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করেন। সেখানে অস্ত্র প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে সীমিত কিছু তথ্যও তিনি দিয়েছেন। মেইঙ্ক বলেন, “বিদ্যমান হুমকির বিরুদ্ধে আমরা প্রস্তুতি বাড়াচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথে থাকা এমন মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের হামলা থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম।”
কোন ধরনের অস্ত্রের কথা আসলে বলা হচ্ছে?
দেশগুলো সাধারণত এ ধরনের তথ্য গোপন রাখে। মেইঙ্কও কক্ষপথে থাকা অস্ত্রগুলোর ধরন, সংখ্যা ও অবস্থান সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।
তবে মেইঙ্ক ‘মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্রের’ কথা বলেছেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এমন নীতিকে বোঝানো হয়, যার লক্ষ্য মহাকাশে ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ বজায় রাখা। এর মধ্যে স্যাটেলাইটবিরোধী (এএসএটি) প্রযুক্তির ব্যবহারও রয়েছে। এসব প্রযুক্তিকে সাধারণত চারটি বড় শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
১. কাইনেটিক বা সরাসরি এএসএটি অস্ত্র: স্যাটেলাইটবিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র বা স্যাটেলাইটে সরাসরি আঘাত হানার পদ্ধতি। এর মধ্যে প্রজেক্টাইল, স্যাটেলাইট ধরে ফেলতে পারে এমন রোবোটিক অস্ত্র এবং রাসায়নিক পদার্থ ছড়ানোর যন্ত্র রয়েছে।
২. নন-কাইনেটিক বা পরোক্ষ এএসএটি অস্ত্র: এর মধ্যে লেজার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ রয়েছে।
৩. ইলেকট্রনিক এএসএটি অস্ত্র: স্যাটেলাইটে যাওয়া ও আসা সংকেতের আদান-প্রদান ব্যাহত করতে পারে এমন জ্যামিং যন্ত্র এবং এসব সংকেত জাল বা পরিবর্তিত করতে পারে এমন স্পুফিং যন্ত্র।
৪. মহাকাশ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সাইবার হামলা।
প্রযুক্তির ধরন অনুযায়ী, এসব অস্ত্র পৃথিবী থেকে, স্থল, সমুদ্র ও মহাকাশ থেকে অথবা কক্ষপথ থেকেও উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। এগুলো মাটিতে থাকা মহাকাশ অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা হতে পারে। এর মধ্যে স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড স্টেশনও রয়েছে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের নিবন্ধে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, মেইঙ্ক যে মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্রের কথা বলেছেন, সেগুলো কক্ষপথে থাকা অস্ত্র এবং সম্ভবত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও জ্যামিংয়ের প্ল্যাটফর্ম। তাদের ধারণা, এগুলো কাইনেটিক ও বেশি ধ্বংসাত্মক ধরনের অস্ত্র নয়। তবে এ ধরনের অস্ত্র থাকার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষদের কী প্রতিক্রিয়া?
এএসএটি অস্ত্রের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা। চীন মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। আর রাশিয়া বলেছে, মহাকাশে কোনো অস্ত্র থাকা উচিত নয়।
রাশিয়া মহাকাশে থাকা কোনো বস্তুর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ ঠেকাতে একটি ‘আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি’ করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে মহাকাশে অস্ত্র স্থাপন ও ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিতে আলাদা একটি চুক্তির বিষয়ে চীন ও রাশিয়ার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির যুক্তি, এ ধরনের কোনো চুক্তি মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
এই প্রতিক্রিয়াগুলোর মাধ্যমে চীন ও রাশিয়া প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র রাখার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, চীন ও রাশিয়া এখনও নিজেদের স্যাটেলাইটবিরোধী (এএসএটি) অস্ত্র তৈরি করে চলেছে।
কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা একমত যে, চীন ও রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইটবিরোধী (এএসএটি) সক্ষমতা তৈরি করছে। ইরান, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইসরায়েল এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশও বিভিন্ন মাত্রায় ও তুলনামূলক কম পরিসরে এ ধরনের সক্ষমতা তৈরি করছে।
মহাকাশে এএসএটি অস্ত্র মোতায়েন করা কি আন্তর্জাতিক আইনে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈধ?
শুধু মহাকাশে একটি অস্ত্র মোতায়েন করার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে, এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ওই অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত এর বৈধতা নির্ভর করবে।
১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটির (মহাকাশ চুক্তি) চতুর্থ অনুচ্ছেদে কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপন, মহাজাগতিক বস্তুতে এসব অস্ত্র স্থাপন বা অন্য কোনোভাবে মহাকাশে এসব অস্ত্র মোতায়েনের ওপর স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
চাঁদ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুকেও চতুর্থ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পুরোপুরি সামরিক কার্যক্রমের বাইরে রাখা হয়েছে এবং এগুলো শুধু শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে আন্তর্জাতিক আইনে অন্য ধরনের অস্ত্র, যার মধ্যে কক্ষপথে মোতায়েন করা প্রচলিত এএসএটি অস্ত্রও রয়েছে, তা নিষিদ্ধ করা হয়নি।
বর্তমানে এএসএটি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক আইন নেই। তবে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ঠেকাতে বহুপক্ষীয়ভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ চলমান রয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সব রাষ্ট্রকে ধ্বংসাত্মক এএসএটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ একতরফাভাবে এই প্রতিশ্রুতিতে সম্মত হয়েছে।
তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এএসএটি অস্ত্র মোতায়েন ও ব্যবহারের ওপর বহুপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এএসএটি অস্ত্রের ব্যবহার সীমিত করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এএসএটি অস্ত্র ব্যবহার রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও জনগণের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের নিবন্ধে । বিশেষ করে কাইনেটিক ধরনের এএসএটি অস্ত্র ব্যবহারের ফলে তৈরি হওয়া মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে। এতে কক্ষপথে থাকা অন্য সব স্যাটেলাইটের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। এসব স্যাটেলাইটের অনেকগুলোই বিশ্বজুড়ে সমাজ ও অর্থনীতির কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএসের কথাই ধরা যাক। অনেকেই এই প্রযুক্তিকে ম্যাপিং অ্যাপ ও ফিটনেস ট্র্যাকার হিসেবে ব্যবহার করলেও কৃষি, বিমান চলাচল, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড, জরুরি সেবা এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবায় জিপিএসের ভূমিকা রয়েছে।
তাই মহাকাশে সংঘাতের কারণে সাময়িক সময়ের জন্যও জিপিএস সেবা ব্যাহত হলে পৃথিবী ও মহাকাশে বেসামরিক মানুষ এবং রাষ্ট্রীয় কাজের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে এএসএটি অস্ত্র ব্যবহারের ফলে তৈরি হওয়া মহাকাশের ধ্বংসাবশেষকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে।
এএসএটি অস্ত্রের ঝুঁকি ঠেকানোর আইন কী বলে?
আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রগুলোকে আত্মরক্ষার সুযোগ দেয়। তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংঘাতের সময় প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু করলে কী ধরনের পরিণতি হতে পারে, রাষ্ট্রগুলোকে তা বিবেচনায় নিতে হয়।
ধ্বংসাত্মক এএসএটি অস্ত্র ব্যবহারের বদলে জ্যামিং, লেজার দিয়ে স্যাটেলাইটের কার্যক্রম ব্যাহত করা, স্পুফিং এবং সীমিত সাইবার অভিযানের মতো নন-কাইনেটিক পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ ও বেসামরিক মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে ধ্বংসাত্মক কাইনেটিক এএসএটি অস্ত্র সাধারণত ব্যবহার না করাই উচিত।
এ ছাড়া স্যাটেলাইটকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করার বদলে পৃথিবীতে থাকা স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের মতো স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও দেখিয়েছে, স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত স্থলভিত্তিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা সরাসরি স্যাটেলাইটে হামলার মতোই কার্যকর হতে পারে। এতে মহাকাশে যুদ্ধের ঝুঁকিও এড়ানো যায়।
সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মহাকাশ ও মহাকাশনির্ভর সেবাগুলোকে সুরক্ষিত রাখা সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা এই প্রয়োজনকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি তা নিশ্চিত করতেও সহায়তা করে।
সবশেষে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা শুধু দেশটির সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাকাশে সম্ভাব্য নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আইনে প্রচলিত এএসএটি অস্ত্র পুরোপুরি নিষিদ্ধ না হলেও এসব অস্ত্রের ব্যবহার মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ তৈরি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্যাটেলাইট সেবা ব্যাহত করার ঝুঁকি তৈরি করে। তাই মহাকাশকে সংঘাতের ক্ষেত্র হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করা এবং সামরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষতিকর প্রভাব সীমিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার পাশাপাশি মহাকাশে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার উদ্যোগই এই ঝুঁকি কমাতে পারে।