ব্রাজিলের রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা সিআইএ বহু দশক ধরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে আসছে, যা বর্তমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও স্পষ্ট ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণের পর বিশ্লেষণটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই নির্বাচনে দেশটির সাবেক ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে সেনেটর ফ্ল্যাভিও বলসোনারো এবং বর্তমান বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রথম দফার ভোটে কোনো প্রার্থীই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট না পাওয়ায় বিষয়টি ২৫ অক্টোবরের রান-অফ বা চূড়ান্ত পর্বের ভোটে গড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে আরটিতে প্রকাশিত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এসকোবার সাম্প্রতিক এক লেখায় দাবি করেছেন যে, মার্কিন অর্থায়ন ও হস্তক্ষেপ ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে, যার পেছনে সিআইএর সুদূরপ্রসারী কৌশল সক্রিয় রয়েছে।
এসকোবারের মতে, আমেরিকান প্রশাসন এই নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং এর মাধ্যমে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, সিআইএ কয়েক দশক ধরে ব্রাজিলের প্রভাবশালী ইভানজেলিকাল চার্চ বা খ্রিষ্টান ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন এবং লালন-পালন করে আসছে, যা বর্তমান নির্বাচনে সুফল দিতে শুরু করেছে।
২০০০ সালে ব্রাজিলের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৫ শতাংশ ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান হলেও বর্তমানে তা রেকর্ড ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বলসোনারোর এই শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনে এই ধর্মান্তরিত ও সংগঠিত ইভানজেলিকাল ভোটারদের সমর্থন একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এমনকি নির্বাচনের দুই দিন আগেই সিআইএ জানত যে ফলাফলে ফ্ল্যাভিও বলসোনারো এগিয়ে থাকবেন, যদিও স্থানীয় বিভিন্ন জনমত জরিপে লুলাকে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। এই পরিস্থিতি তদন্তের জন্য ব্রাজিলের ফেডারেল তদন্তের দাবি জানান এসকোবার।
ব্রাজিলের রাজনীতিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের অভিযোগ একেবারে নতুন নয়; দেশটির সরকার অতীতেও ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিল। সম্প্রতি ব্রাজিলের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশটির কেন্দ্রীয় পুলিশ মার্কিন হস্তক্ষেপের বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে চালিত বিভিন্ন প্রকল্পে মার্কিন তহবিল ব্যবহার করা হয়েছে।
অপরদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে অভ্যুত্থানের চক্রান্তের অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করার ঘটনাকে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি রাজনৈতিক নিপীড়ন বলে অভিহিত করেছেন। এসকোবার তুলে ধরেন যে, ফ্ল্যাভিও বলসোনারো ২০২৬ সালের মে মাসে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তার ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো ২০২৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট এদুয়ার্দোকে চার বছর দুই মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে, কারণ তিনি তার বাবার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম প্রভাবিত করতে মার্কিন প্রশাসনের রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন।
নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বের এই লড়াইকে ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের এক চরম মেরুকৃত যুদ্ধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভা তার মেয়াদে ব্রিকসে ব্রাজিলের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং চীনসহ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি অনুসরণ করেছেন। লুলা ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসেন, যখন তার বিরুদ্ধে থাকা পূর্বের দুর্নীতির সাজা বাতিল করা হয়।
অন্যদিকে, ফ্ল্যাভিও বলসোনারো ব্রাসিলিয়াকে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করার নীতিকে সমর্থন করছেন। এসকোবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বলসোনারো জয়ী হলে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন আসবে এবং দেশটি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং বিশেষ করে ব্রিকস জোটে ব্রাজিলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যে শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে, তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে এবং ব্রাজিল ব্রিকসে কেবল একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক বা সাধারণ নীতি-অনুসারীতে পরিণত হবে।