আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে ‘সামরিক বিজয়’ কথাটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি ধারণা। এর মধ্যে এমন একটি প্রতিশ্রুতি আছে—যুদ্ধ হবে দ্রুত, শত্রু পরাজিত হবে, তার সামরিক শক্তি ভেঙে পড়বে এবং বিজয়ী পক্ষ নিজের রাজনৈতিক শর্ত চাপিয়ে দিয়ে যুদ্ধ শেষ করবে। কিন্তু মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্সে স্টিফেন বিডল, স্যাম উইন্টার-লেভি ও ইউরি ঝুকভের লেখা এক নিবন্ধে এই ধারণা নিয়েই মৌলিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তাদের যুক্তি হলো, আধুনিক যুদ্ধের ক্ষেত্রে ‘সামরিক বিজয়’ বলে যে ধারণাটি নীতিনির্ধারকদের যুদ্ধ শুরু বা দীর্ঘায়িত করতে উৎসাহিত করে, সেটি মূলত একটি বিপজ্জনক অলীক কল্পনা বা মিথ। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে ভীষণভাবে দুর্বল করা সম্ভব, কিন্তু যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাপ্তি কখনোই শুধু অস্ত্রের শক্তিতে নিশ্চিত করা যায় না।
লেখকদের মূল বক্তব্যটি বোঝার জন্য প্রথমেই ‘বিজয়’ ও ‘সামরিক বিজয়’-এর মধ্যে পার্থক্যটি বুঝতে হয়। তাদের মতে, বিজয় অর্থ হলো যে রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কোনো পক্ষ যুদ্ধে প্রবেশ করেছে, তা অর্জন করা। কিন্তু ‘সামরিক বিজয়’ বলতে বোঝানো হয় আরও কিছু—যুদ্ধের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে পরাজিত পক্ষের সামনে বিজয়ীর শর্ত মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বাস্তব বিকল্প থাকে না। এই ধারণার আকর্ষণ এখানেই। আলোচনার টেবিলে বসলে আপস করতে হয়, সময় লাগে এবং রাজনৈতিক সমর্থন ক্ষয় হতে পারে। বিপরীতে, সামরিক বিজয়ের ধারণা মনে করায় যে যুদ্ধক্ষেত্রে এমন একটি চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব, যেখানে শত্রুর আর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না। কিন্তু নিবন্ধের লেখকেরা দেখাচ্ছেন, আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা সাধারণত এমন নয়।
তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—আধুনিক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত দর-কষাকষির মাধ্যমেই শেষ হয়। যুদ্ধের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা নয়; বরং সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ব্যয় সম্পর্কে প্রতিপক্ষের হিসাব বদলে দেওয়া এবং তাকে এমন একটি সমঝোতায় রাজি করানো, যা সে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করে। অর্থাৎ যুদ্ধ ও কূটনীতি পরস্পরের বিকল্প নয়। বরং যুদ্ধের সামরিক ফলাফল কূটনীতির দর-কষাকষির শক্তিকে প্রভাবিত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি নিজে যুদ্ধের সমাপ্তি নয়।
লেখকদের ঐতিহাসিক উদাহরণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো ১৯৯০–৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধকে প্রায়ই একটি আদর্শ সামরিক বিজয় হিসেবে দেখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকি বাহিনীকে কুয়েত থেকে বিতাড়িত করে এবং অত্যন্ত দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু লেখকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শেষ হয়নি ইরাকি সামরিক বাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার কারণে। যুদ্ধবিরতির সময়ও ইরাকি বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য জীবিত ছিল এবং তারা চাইলে আরও যুদ্ধ করতে পারত। বরং সামরিক লড়াই সাদ্দাম হোসেনকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে যুদ্ধ চালিয়ে গেলে ইরাকের ক্ষতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি একটি সংকেত দেয় যে, জোটও নির্দিষ্ট অবস্থানে থামতে প্রস্তুত। ফলে দুই পক্ষই একটি সমঝোতামূলক অবস্থান গ্রহণ করে।
এখানেই লেখকদের যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়। কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে একটি পক্ষ বিপুলভাবে এগিয়ে গেলেই প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ইচ্ছা শেষ হয়ে যায় না। ২০০৩ সালে ইরাকের ক্ষেত্রে এর আরও বড় প্রমাণ পাওয়া যায়। বাগদাদ পতনের পর ইরাকের প্রচলিত সামরিক বাহিনী কার্যত ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়নি। সাবেক বাথপন্থী যোদ্ধারা অস্ত্রধারণ করে অনিয়মিত যুদ্ধ চালিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে তুলনামূলকভাবে কম সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে বিদ্রোহ দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। অর্থাৎ রাজধানী দখল বা একটি রাষ্ট্রের নিয়মিত সেনাবাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়া মানেই যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাপ্তি নয়।
আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা এই যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে। ২০০২ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র তালেবানের সামরিক শক্তিকে পরাজিত করেছিল, কাবুল দখল করেছিল এবং তালেবান নেতৃত্বকে দেশছাড়া করেছিল। প্রচলিত অর্থে এটিকে একটি চূড়ান্ত সামরিক বিজয় হিসেবে দেখা যেত। কিন্তু তালেবান নেতৃত্ব ও যোদ্ধারা নতুন আফগান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান মেনে নেয়নি। তারা আবার অনিয়মিত যুদ্ধ শুরু করে এবং প্রায় দুই দশক পর ২০২১ সালে কাবুল পুনর্দখল করে। ফলে ২০০২ সালের সামরিক সাফল্য যুদ্ধের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। লেখকদের মতে, তালেবানকে তখন যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল, সেটি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না; তাই তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তালেবানরা সফলভাবে কর ব্যবস্থা, সীমান্ত ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ছবি: রয়টার্স
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদাহরণও এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। সাধারণভাবে নাৎসি জার্মানি ও সাম্রাজ্যবাদী জাপানের পরাজয়কে সামরিক বিজয়ের চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু লেখকদের বিশ্লেষণ হলো, এই যুদ্ধও কেবল শত্রুর সামরিক সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন করে শেষ হয়নি। জাপান আত্মসমর্পণের সময়ও তার হাতে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র সৈন্য ছিল। জাপানের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল যে তারা শেষ পর্যন্ত মিত্রবাহিনীকে পরাজিত করতে পারবে না, কিন্তু তারা এটাও জানত যে জাপান আক্রমণ করতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল প্রাণহানি হতে পারে। ফলে জাপানের হাতে কিছু দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল।
এখানে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর ধারণাটিও লেখকরা নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ১৯৪৩ সালের কাসাব্লাঙ্কা সম্মেলনে মিত্রশক্তি জাপানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর কথা বলেছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পটসডাম ঘোষণায় আত্মসমর্পণের সঙ্গে একাধিক শর্ত যুক্ত ছিল। জাপান তার চারটি প্রধান দ্বীপের ওপর সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার সুযোগ পায়, সামরিক সদস্যরা দেশে ফিরে যেতে পারত এবং শিল্প ও অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার দাবি আরোপ করা হয়নি। সম্রাট হিরোহিতোর ভবিষ্যৎ নিয়েও মিত্রশক্তি শেষ পর্যন্ত এমন একটি অবস্থান নেয়, যা জাপানের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল। ফলে লেখকদের মতে, জাপানের পরাজয় ছিল অত্যন্ত একপেশে একটি সমঝোতা, কিন্তু তা কোনো পক্ষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে সংঘটিত ‘শুদ্ধ সামরিক বিজয়’ ছিল না।
জার্মানির ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। ১৯৪৫ সালের মে মাসে আত্মসমর্পণের সময় জার্মানির হাতে তখনো বিপুলসংখ্যক সৈন্য ছিল। তারা আরও যুদ্ধ করতে পারত এবং জার্মান ভূখণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তোলার সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু জার্মান নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ তাদের কাছে মিত্রশক্তির প্রস্তাবিত শর্তে আত্মসমর্পণ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। লেখকদের মতে, এটিও প্রমাণ করে যে যুদ্ধের শেষ মুহূর্তেও পরাজিত পক্ষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে।
এই যুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, যুদ্ধের সমাপ্তির পরিকল্পনা যুদ্ধ শুরুর পরিকল্পনারই অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু লেখকদের অভিযোগ, অনেক সময় নীতিনির্ধারকরা যুদ্ধ শুরু করেন এমন একটি ধারণা নিয়ে যে সামরিক সাফল্য নিজেই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে। ফলে ‘জয়ের পর কী হবে’—এই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে কাবুল পতনের পর সাবেক শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল তারা ইতিমধ্যেই সামরিক বিজয় অর্জন করেছে এবং পরাজিত পক্ষের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন নেই। লেখকদের মতে, সেই সুযোগ প্রত্যাখ্যানের ফলেই পরবর্তী দুই দশকের যুদ্ধ, বিপুল প্রাণহানি ও বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত তালেবানের প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি হয়।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রসঙ্গেও নিবন্ধটি একই সমস্যাকে চিহ্নিত করেছে। লেখকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই সামরিক অভিযানকে এমনভাবে পরিকল্পনা করেছিল যাতে ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এ বাধ্য করা যায়। এর ফলে যুদ্ধের সামরিক কর্মকাণ্ডকে দর-কষাকষির ভিত্তি তৈরির পরিবর্তে আত্মসমর্পণ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। আগের সমঝোতা থেকে সরে আসা, চলমান আলোচনার মধ্যে আকস্মিক হামলা এবং অপেক্ষাকৃত আলোচনামুখী কর্মকর্তাদের হত্যা—এসব পদক্ষেপকে লেখকরা এমন কৌশল হিসেবে দেখিয়েছেন, যা সমঝোতার পরিবেশ তৈরির বদলে সামরিকভাবে চূড়ান্ত ফল আদায়ের ধারণাকে প্রতিফলিত করে। এর ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যুদ্ধের সমাপ্তির একটি কার্যকর তত্ত্ব ছাড়া ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান হামলার মধ্যে কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত একটি সুপারমার্কেটের গুদাম ভবনের সামনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য ও নিরাপত্তারক্ষীরা। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেন যুদ্ধেও লেখকরা একই ধরনের ভুল দেখতে পাচ্ছেন। তাদের মতে, ২০২২ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার একটি সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পরও মস্কো আলোচনার সম্ভাবনাকে কাজে না লাগিয়ে যুদ্ধ আরও বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের চারটি অঞ্চল নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা ও অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন—এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ সমঝোতার ক্ষেত্রকে আরও সংকুচিত করেছে। একই সঙ্গে লেখকদের বক্তব্য হলো, ইউক্রেনও এককভাবে সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করতে পারবে না, যেমন রাশিয়াও পারছে না। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সম্মতি ছাড়া যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি সম্ভব নয়।
এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সামরিক বাহিনীর কাঠামো ও প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার ওপর এই ভুল ধারণার প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সীমিত গোলাবারুদ মজুত, দক্ষ জনবল পুনর্গঠনের সীমিত প্রস্তুতি এবং রিজার্ভ অস্ত্র ও সরঞ্জামের দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ—এসব নীতির মধ্যে লেখকেরা এমন একটি অনুমান দেখতে পান যে উন্নত প্রযুক্তি ও বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তখন এই কাঠামো বড় সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য শুধু আধুনিক অস্ত্র নয়, শিল্প সক্ষমতা, মজুত, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতা প্রয়োজন।
তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-চীন সংঘাতের ক্ষেত্রে লেখকদের সতর্কতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। চীন যদি ধরে নেয় যে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে দ্রুত সামরিক অভিযান চালিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক ফল অর্জন করা যাবে, তবে সেটি বিপজ্জনক হিসাব হতে পারে। যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা শুধু চীনের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না; তাইওয়ানের প্রতিরোধের ইচ্ছা, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব এবং দীর্ঘ যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়—সবকিছু ফল নির্ধারণ করবে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও যদি ধরে নেয় যে উন্নত অস্ত্র ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত চীনা সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব, তাহলেও ভুল হিসাব হতে পারে।
নিবন্ধটির সবচেয়ে বড় কৌশলগত শিক্ষা এখানেই নিহিত। যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে শুধু কতটি যুদ্ধজাহাজ, বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বা সেনা রয়েছে—এই হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রতিপক্ষ কত দিন লড়াই করতে প্রস্তুত, তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব কতটা চাপ সহ্য করতে পারে, জনগণ কতটা ক্ষতি মেনে নিতে পারে এবং কোন শর্তে যুদ্ধ থামাতে রাজি হবে—এসব প্রশ্ন সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সামরিক শক্তির পাশাপাশি ‘রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি’ এবং ‘সমঝোতার সক্ষমতা’ও যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে।
স্টিফেন বিডল, স্যাম উইন্টার-লেভি ও ইউরি ঝুকভের বিশ্লেষণের মূল শক্তি তাই যুদ্ধকে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের দৃষ্টিতে না দেখে রাজনৈতিক দর-কষাকষির ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা।
ইরাক থেকে সেনা সরিয়ে নীল যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স
একটি সেনাবাহিনী অন্য সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে পারে, একটি রাজধানী দখল করতে পারে, একটি নৌবহর ধ্বংস করতে পারে কিংবা একটি সরকারের পতন ঘটাতে পারে; কিন্তু এরপরও যুদ্ধ চলতে পারে। কারণ রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সামরিক শক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা যায় না।
সুতরাং নিবন্ধটির কেন্দ্রীয় সতর্কবার্তা হলো, যুদ্ধ শুরু করার আগে শুধু ‘কীভাবে জিতব’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়; বরং ‘কীভাবে যুদ্ধ শেষ হবে’—এই প্রশ্নটির উত্তরও থাকতে হবে। যদি কোনো সামরিক অভিযান সফল হওয়ার জন্য প্রতিপক্ষকে দ্রুত আত্মসমর্পণ করতেই হয়, তাহলে সেই যুদ্ধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পণ না করলে সামরিক বিজয়ের পরিকল্পনা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধের শক্তি রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়; বরং রাজনৈতিক সমাধানের জন্য দর-কষাকষির শক্তি তৈরি করার একটি উপায়।
এই উপলব্ধি উপেক্ষা করলে সামরিক সাফল্যও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতায় পরিণত হতে পারে। তাই ‘সামরিক বিজয়’-এর মিথ আঁকড়ে থাকা কেবল একটি তাত্ত্বিক ভুল নয়—এটি এমন একটি ব্যয়বহুল অভ্যাস, যা রাষ্ট্রকে এমন যুদ্ধ শুরু করতে বা চালিয়ে যেতে পারে যার শেষ কোথায়, সে সম্পর্কে তার নিজেরই কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।