বছরের পর বছর কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি এবং সামরিকভাবে আক্রান্ত ইরানি শাসকগোষ্ঠী দুঃস্বপ্নের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তারা ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে নেমেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হতে পারে, এই পরিস্থিতি থেকে তারা বেঁচে গেছে। এও হতে পারে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জন্য এখন ভালো দিন।
যুক্তরাষ্ট্র ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে বোমাবর্ষণ শুরু করেছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সরকারকে ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু প্রতিটি লক্ষ্যেই তারা নজিরবিহীনভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বাস্তবে, যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় তেহরান এখন হয়তো আরও শক্তিশালী।
তারা সফলভাবে হরমুজ প্রণালি দখল করে তা বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। ভারী বোমাবর্ষণের মধ্যেও তাদের সশস্ত্র বাহিনী আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষতিসাধন অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধের প্রতি মার্কিন সমর্থন আগে থেকেই দুর্বল ছিল। সেটি আরও কমে গেছে এবং ওয়াশিংটনের প্রতি আন্তর্জাতিক ক্ষোভ বেড়েছে। তাই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আগামী বছরে তেহরান একই পথেই থাকবে–এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান যেভাবে টিকেছে তা নিয়ে ইরানি কর্মকর্তারা নিঃসন্দেহে গর্বিত। তারা প্রকাশ্যে তাদের সাফল্য নিয়ে গর্ব করেছে এবং এমনকি বিজয় ঘোষণাও করেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত আলোচনায় ইরানের শাসকগোষ্ঠীর অভিজাতরা বেশ উদ্বিগ্নই রয়েছেন। তারা জানেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর অনেক হাতিয়ার ও কৌশল আছে। যেসব বিষয়ে এখন ওয়াশিংটন পিছিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে, যেমন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ জনমত এবং আন্তর্জাতিক বিরোধিতা–এগুলো হয়তো চলে যেতে পারে, বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে, অথবা আমেরিকান কর্মকর্তাদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারে।
ওয়াশিংটনের কাছে এটি ইতিবাচক মনে হতে পারে যে, তেহরান যদি এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে সমীহ করে, তবে হয়তো তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিভিন্ন বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে। কিন্তু এমন ভাবনা আসলে ইরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও অভিজাতদের মনস্তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রে এক বিরাট ভুল।
সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে দেশটির শাসকগোষ্ঠীর মনোভাব আরও কঠোর ও আপসহীন হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধে তারা নিজেদের বহু স্বজন, সহকর্মী ও বন্ধুদের হারিয়েছেন। তারা গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাকে ঠিক সেভাবেই দেখছেন, যেভাবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের আক্রমণকে দেখেছিল ইসরায়েল। অর্থাৎ, তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, শত্রু তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে প্রস্তুত, তাই সেই শত্রুকে স্থায়ীভাবে পরাস্ত করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। আমেরিকান কূটনীতিক ও আলোচকদের প্রতি ইরানি নেতৃত্বের আস্থা আগে থেকেই খুব একটা ছিল না; এখন তা পুরোপুরি শূন্যে গিয়ে ঠেকেছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরান এখন ‘উত্তেজনা বৃদ্ধি ও নিরন্তর আক্রমণাত্মক’ এক নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। এর অর্থ হলো–তারা আগের অবস্থানে স্থবির থাকবে না। আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা আপসেও যাবে না। বরং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশগুলোর অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে তারা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবে। একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করা, আমেরিকান ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলা বা গুপ্তহত্যা চালানো এবং এমনকি উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি দখলসহ প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোতে স্থল অভিযান পরিচালনার পথও বেছে নিতে পারে তেহরান।
এই আগ্রাসী কৌশলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা সম্ভব হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তবে বর্তমানে কোনো পক্ষই যদি একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে এবং সাময়িক কোনো চুক্তিতে পৌঁছায়, তবুও সেই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ তেহরানের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে পিছিয়ে গেলেও সুযোগ বুঝে পুনরায় আক্রমণ চালাবে। তাই যেকোনো আমেরিকান উসকানিতে তো বটেই, এমনকি আগাম কোনো উসকানি ছাড়াই হামলা চালাতে প্রস্তুত ইরানের শাসকগোষ্ঠী। তারা মনে করে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি বজায় থাকলে নিজেদের টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে অঞ্চলটি থেকে বিতাড়িত করতে তারা পূর্ণ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সহজ কথায় ইরানের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থান করাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এতটাই ব্যয়বহুল ও যন্ত্রণাদায়ক করে তোলা, যাতে ওয়াশিংটন অধিকাংশ সেনা প্রত্যাহার করতে, হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের একক নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে এবং এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে অঞ্চলটির এক স্থায়ী পরাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ যখন শুরু হয়, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তখন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কার্যালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ছিলেন। গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন আরাগচি। কিন্তু এর আগের সপ্তাহগুলোতেই পারস্য উপসাগরে নিজেদের সামরিক বহর বাড়াতে শুরু করে ওয়াশিংটন এবং তেহরানকে সব ধরনের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধের চরমপত্র দেয়। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দেশটির সরকারকে উৎখাতের হুমকি দিচ্ছিলেন। বৈঠকে যখন আরাগচি এই নতুন পরিস্থিতি ও সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অবহিত করছিলেন, ঠিক তখনই আছড়ে পড়তে শুরু করে বোমা।
প্রথম দফার বোমাবর্ষণে খামেনির প্রধান কার্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যাতে সর্বোচ্চ নেতাসহ অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান আরাগচি। পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে হতবিহ্বল ও ধূলিধূসরিত অবস্থায় বেরিয়ে এসে তিনি রাস্তায় দৌড়ান। একটি চলন্ত গাড়ি থামিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছান তিনি। সেখান থেকেই বেঁচে যাওয়া অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন এবং সামরিক কমান্ডার ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে যুক্ত হন।
খামেনি এবং তার শীর্ষ সহকারীরা নিহত হতে পারেন–এমন আশঙ্কা ইসলামি প্রজাতন্ত্র আগেই করেছিল। ফলে আকস্মিক এই বিপর্যয় সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি তাদের ছিল। রাজনৈতিক ও সামরিক প্রশাসনকে প্রায় এক বছর আগেই বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছিল, যাতে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই প্রাদেশিক গভর্নর ও স্থানীয় সামরিক কমান্ডাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
সামরিক মহড়া চলাকালীন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
তা ছাড়া প্রতি পদে অন্তত দুজনকে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে রাখা হয়েছিল। এত প্রস্তুতি সত্ত্বেও ঘটনাটি ছিল নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর মর্মান্তিক। এক জায়গায় অবস্থান করার সুযোগ না থাকায় তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোটরসাইকেল বা গাড়িতে চড়ে বাঙ্কার থেকে বাঙ্কারে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। খোয়াতে হয়েছে ঘনিষ্ঠ সহকর্মী, বন্ধু ও পরিবারকে। হামলায় নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার বাবাকে হারানোর পাশাপাশি হারিয়েছেন স্ত্রী, বোন ও এক ভাগনিকে। মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, হামলায় তিনি নিজেও আহত হন।
ইসরায়েল যেমন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলাকে দেখে, ইরান ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলাকে ঠিক একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।
শুধু এই সামরিক ধাক্কাই নয়, ইরানের শক্তি ও জ্বালানি কেন্দ্রসহ নানা বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর মার্কিন হামলায় শাসকগোষ্ঠী আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এই লড়াই শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক নেতাদের ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি সামগ্রিকভাবে ইরান রাষ্ট্রটিকে ধ্বংসের এক সর্বাত্মক যুদ্ধ।
এই উপলব্ধির পর তারা অত্যন্ত আগ্রাসী কৌশল গ্রহণ করে। মোজতবা খামেনি নিহত কর্মকর্তাদের পদে কট্টরপন্থী সামরিক কর্মকর্তাদের বসিয়ে ‘শত্রুর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান’ চালানোর নির্দেশ দেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) প্রধান মোহসেন রেজাইকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সেক্রেটারি করা হয়। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি আমেরিকান অর্থনৈতিক সম্পদ ও তেল কোম্পানিগুলোতেও হামলা চালানো হবে।
আগে ইরান প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করত। তবে এবার তারা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর সরাসরি হামলা চালাতে শুরু করে। এমনকি আগাম সুরক্ষামূলক আক্রমণও শুরু করে তারা। উদাহরণস্বরূপ, গত জুলাইয়ে জর্ডানের এক মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায় তেহরান; তাদের দাবি ছিল–ওই ঘাঁটি ইরানে আক্রমণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। সেই হামলায় তিন আমেরিকান সেনা নিহত হন।
তেহরানের এই নতুন কৌশল শুধু ওয়াশিংটনকে মনস্তাত্ত্বিক চাপে রাখার জন্য নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতাকে পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে দেওয়ার অংশ। এটি এক অর্থে ইসরায়েলের অনুসৃত ‘লন কাটার’ কৌশলেরই ইরানি সংস্করণ। এই পদ্ধতিতে ধারাবাহিক ও সীমিত আঘাতের মাধ্যমে দুই বড় সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে শত্রুর শক্তি ক্ষয় করা হয়। তেহরানের আশা, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে নিজেদের ও মিত্রদের রক্ষা করতে অক্ষম হয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চল ছাড়তে বাধ্য হবে।
চলতি সংঘাত ও আঞ্চলিক উত্তেজনা যে গতিতে বেড়েছে, তার ফলে বেশ সন্তুষ্ট ইরানি নেতারা। তারা মনে করেন, পুরো অঞ্চলে হঠাৎ এই কঠোর প্রতিক্রিয়া ও সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার ফলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানের মূল বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মাত্রা কিছুটা হলেও কমিয়ে এনেছে।
তবে তেহরানের নীতিনির্ধারকরা নিজেদের এখনই চূড়ান্ত বিজয়ী ভাবছেন না। কারণ মার্কিন ও ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তারা কয়েক দশক ধরে তাদের পতন আসন্ন বলে দাবি করে আসছেন। ইরানের প্রত্যাশার চেয়েও শক্তিশালী সামরিক পারফরম্যান্সের পরও তারা ইরানকে দুর্বল হিসেবেই বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করে যাচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট মন্তব্য করেন, ইরান বর্তমানে মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে।
বাস্তবতা ও মার্কিন ধারণার মধ্যে এই ব্যবধানকে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করছে তেহরান। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর আগে সতর্ক করেছিলেন যে, মার্কিন নেতৃত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানের সামরিক শক্তিকে অস্বীকারের পথ খোলা পাবে, ততক্ষণ তারা ইরানকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। এরই ধারাবাহিকতায় গত আগস্টে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি মার্কিন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ার তাগিদ দিয়ে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।
অতীতে ইরানের কিছু উদারপন্থী নেতা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আশা করলেও বর্তমান নেতৃত্বের কেউই আর তেমনটা মনে করেন না। তেহরানের বর্তমান নীতীনির্ধারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই একটি বিশ্বাসযোগ্য বা সৎ অংশীদার হতে পারে না। কারণ, ওয়াশিংটনের ইতিহাসই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের। মাত্র তিন বছর পার না হতেই ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বেরিয়ে যাওয়া এর উদাহরণ। তা ছাড়া, ২০২৫ সালের জুন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর হামলা চালায়, তখনও উভয় পক্ষ আলোচনার টেবিলে ছিল। আবার গত জুনে স্বাক্ষরিত যৌথ সমঝোতা স্মারক ভেঙে হরমুজ প্রণালিতেতে নতুন আন্তর্জাতিক জলপথ খোলার প্রয়াস চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই শান্তি প্রক্রিয়া নস্যাৎ করেছে বলে মনে করে তেহরান।
ইরানি নীতিনির্ধারকরা এটাও জানেন যে, পারস্য উপসাগরে এখন তাদের যে কৌশলগত সুবিধা রয়েছে, তা চিরস্থায়ী নাও হতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প তেল পরিবহন রুট খুঁজে নিলে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ রাখার কৌশল তার ধার হারাতে পারে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে মার্কিন হাত আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে কিছুটা মাপা পদক্ষেপ নিলেও, নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট জনমতের তোয়াক্কা না করে আরও আগ্রাসী হতে পারেন। এমনকি ২০২৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের মধ্য থেকে কেউ প্রেসিডেন্ট হলেও চিত্র খুব একটা বদলাবে না বলেই মনে করে তেহরান। কারণ, এর আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও নির্বাচনী প্রচারে পারমাণবিক চুক্তিতে ফেরার কথা বললেও ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিই বহাল রাখার চেষ্টা করেছিলেন। বরং একজন মধ্যপন্থী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বব্যাপী বন্ধুরাষ্ট্রগুলোকে একত্র করে ইরানের ওপর আরও জোরালো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিতে পারেন, যা তেহরানের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ফলে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এখনই ওয়াশিংটনের ওপর বহুমুখী চাপ জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরানের শাসকগোষ্ঠী। এর অংশ হিসেবে পারস্য উপসাগরের মূল রুট হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করার পর যে কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ সরাসরি ভারত মহাসাগর বা লোহিত সাগর দিয়ে তেল পাঠাচ্ছে, তাদের তেল শোধনাগার ও বন্দরগুলোতে সরাসরি হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি প্রবাহ পুরোপুরি অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইয়েমেনের হুতি সহযোগীদের মাধ্যমে লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে সেই রুটও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এরই মধ্যে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর কাছ থেকে অতিরিক্ত এলাকা দখলের পর হুতিরা এই পথ অবরুদ্ধ করার শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে, যার জবাবে রিয়াদ সাময়িকভাবে তাদের জ্বালানি তেল সরবরাহের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অবকাঠামোতে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানোর কৌশল নেওয়া হচ্ছে, যেমনটা গত জুলাইয়ে মিনেসোটার পানি সরবরাহ অবকাঠামোতে হওয়া সাময়িক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল। ইরান পুনরায় বোমাবর্ষণের শিকার হলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রের পানি শোধনকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়ে পুরো অঞ্চলকে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলার হুমকিও রয়েছে। সর্বশেষ, মার্কিন ও ইসরায়েলি শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আবার গুপ্তহত্যার কৌশল ফিরিয়ে আনতে পারে তেহরান। ১৯৮০-র দশকে ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া মিত্রদের সহায়তায় ইরান যেমন একের পর এক হাই-প্রোফাইল গুপ্তহত্যা চালিয়েছিল, সেই পুরনো সক্ষমতা পুনরুজ্জীবিত করতে জোর দিচ্ছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। এমনকি মার্কিন সেনাদের হত্যা বা বন্দি করতে পারলে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরানের পক্ষে সিনিয়র মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের হত্যা করা কঠিন হবে। ইরানি সামরিক বাহিনীর কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানসহ উন্নত অস্ত্র এবং পরিশীলিত গোয়েন্দা তথ্য নেই। এগুলো দিয়ে ইসরায়েল ও ওয়াশিংটন ইরানি শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ ব্যক্তিদের হত্যা করে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, তেহরান ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য একজন ঘাতক নিয়োগের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমেরিকান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়।
কিন্তু দেশটির কাছে বিকল্প আছে। উদাহরণস্বরূপ, তারা গোপন অভিযান চালাতে পারে, অথবা আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে পারে। তারা কম পরিচিত কর্মীদের হত্যা করারও চেষ্টা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আগস্টে ইরানের সেনাবাহিনী ঘোষণা করে–যে কেউ একজন মার্কিন সেনাকে হত্যা বা বন্দি করবে, তাকে ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মোকাবিলায় তেহরান কেবল সামরিক জবাবে সীমাবদ্ধ না থেকে কৌশলগত নতুন পথ বেছে নিতে দ্বিধা করবে না। এর একটি বড় উদাহরণ হতে পারে বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থা অচল করে দেওয়া। হরমুজ প্রণালি কেবল জ্বালানি পরিবহনের রুট নয়, ইউরোপ থেকে দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবলের প্রধান মাধ্যমও। তেহরান তাদের নৌ-ডুবুরি, চালকহীন সাবমেরিন বা বিশেষ জলযানের সাহায্যে সমুদ্র তলদেশের এসব কেবল কেটে দিয়ে বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে, ভূখণ্ডগত নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির চেষ্টা করতে পারে ইরান। ইসরায়েল যেমন গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার ভূখণ্ড দখলকে নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে দেখায়, তেহরানও নিজের সীমান্তে সুরক্ষা অঞ্চল গড়ায় জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল আক্রমণ কিংবা খারগ দ্বীপে ইরানের মূল তেল টার্মিনাল দখলের আশঙ্কায় বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি দখলের প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির অনেক কট্টরপন্থী বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতা।
এই কৌশলগত অবস্থান উত্তর দিকেও বিস্তৃত হতে পারে। আজারবাইজান ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতা তেহরানের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। ইসরায়েলকে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে ইরানের সীমান্তে থাকা আজারবাইজানি ছিটমহল ‘নাখিচেভান’ দখল কিংবা তাদের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে পারে তেহরান। একইভাবে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি ঠেকাতে অগ্রিম স্থল অভিযান কিংবা সিরিয়া ও ইয়েমেনের মিত্রদের দিয়ে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার পরিকল্পনাও বাস্তবায়িত হতে পারে।
সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে তেহরানের নীতিনির্ধারকরা পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্রের দাবি অস্বীকার করে আসছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক আইনপ্রণেতা একেই একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ বলে মনে করছেন।
এমনকি পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন না করলেও, অত্যন্ত ব্যয়বহুল স্থল অভিযান চালানো ছাড়া কেবল আকাশপথে হামলা চালিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটিকে হারানো ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের পক্ষে অসম্ভব। তেহরানের মূল লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরো মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করানো। আর এর জন্য তারা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালাতেও প্রস্তুত। সুযোগ বুঝে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আমেরিকান বাহিনীকে দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য করার রণকৌশল তৈরি রাখা হয়েছে।
আবার টানা যুদ্ধের ফলে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের অসন্তোষ তীব্র হতে পারে, যা শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় হুমকি। ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে হেরে আর্জেন্টিনার জান্তা সরকারের পতনের ঘটনা ইরানি নেতাদের সামনে এক বড় সতর্কবার্তা।
তবে তেহরানের বিশ্বাস, বেসামরিক অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার পর সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে যে, এটি কেবল সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো ইরান রাষ্ট্রকে ধ্বংসের যুদ্ধ। ফলে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সমর্থন আগের চেয়ে সংহত হয়েছে। ১৯৮১ সালে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব বোমা হামলায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর থেকে টিকে থাকার যে কঠোর মনোভাব তারা অর্জন করেছিল, মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন নতুন সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই শিক্ষাকেই ধারণ করছেন।
সংঘাত বাড়ানো নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাজি, যা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ কিংবা অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ উসকে দিতে পারে। কিন্তু তেহরানের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, ওয়াশিংটন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, বিশ্ব জনমত এখন তাদের অনুকূলে এবং নাগরিকরাও সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুত। তাদের দৃষ্টিতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করার এটিই উপযুক্ত সময়।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বুশ স্কুল অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক সার্ভিস, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি