ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে? মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, খুব শিগগিরই। গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমার মনে হয় (নভেম্বরের) নির্বাচনের পরপরই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে।” ইরানি নেতারাও একমত যে, যুদ্ধের সমাপ্তি কাছাকাছি।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) প্রধান অধিনায়ক আহমদ ওয়াহিদি আগস্টে ঘোষণা করেন, তেহরান বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীকে হাঁটু গেড়ে বসাতে বাধ্য করেছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হবে এবং কোনো স্পষ্ট বিজয়ের বদলে আলোচনার মাধ্যমে শেষ হবে। কিন্তু সার্বিকভাবে, এক বা একাধিক উপায়ে লড়াইয়ের একটি সুরাহা শিগগিরই হবে বলেই একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। এমন চিন্তাভাবনা স্বাভাবিক।
সব যুদ্ধেরই শেষ আছে, এবং টানা কয়েক মাস তেলের দাম বাড়ার পর বিশ্ব এখন এই যুদ্ধ থামার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। তবে অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো–এই সংঘাত শেষ হওয়ার ধারেকাছেও নেই। যুদ্ধের মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না, তবুও দুটি পক্ষই মনে করছে, সামরিক হামলা আর অর্থনৈতিক চাপ–দুই পথেই একসঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই তাদের জন্য লাভজনক।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানি শাসনব্যবস্থা উৎখাত করতে পারছে না, তাদের মিসাইল কর্মসূচি বা পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করাতে পারছে না, কিংবা আঞ্চলিক সহযোগীদের সমর্থন করা থেকেও তাদের থামাতে পারছে না। কিন্তু ওয়াশিংটন ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্রমাগত ধ্বংস করতে এবং তাদের অর্থনীতিকে সংকুচিত করে রাখতে সক্ষম। অন্যদিকে, ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তিকে বিতাড়িত করতে পারছে না। তবুও তারা এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষতিসাধন, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর বোমাবর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটানো অব্যাহত রাখতে পারছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুটি দেশের কাছেই অনির্দিষ্টকালের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে এবং উভয় পক্ষই বিশ্বাস করে যে, এই সম্পদ ব্যবহার করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই। তারা মনে করে, তাদের দিক থেকে শিথিলতা দেখালে প্রতিপক্ষ চেপে বসবে। তারা পর্যায়ক্রমে আলোচনা চালালেও, কোনো পারস্পরিক আস্থা নেই। বাস্তবে তারা সন্দেহ করে যে, শত্রু পক্ষ স্রেফ পুনর্গঠিত হতে এবং পুনরায় গোলাবারুদ জোগাড়ের জন্য যুদ্ধবিরতিকে ব্যবহার করবে।
ইরানি সরকারের ভয়, হরমুজ প্রণালি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখন যদি তাদের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা আরও বড় বিপদে বা কঠিন চাপের মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ, ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে তেহরান তাদের সামর্থ্য পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় সময় ও সম্পদ পেয়ে যাবে। ইসরায়েল ভাবছে, আজ সংযম দেখালে তা ভবিষ্যতে কেবল একটি শক্তিশালী ইরান তৈরি করবে।
যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পদক্ষেপগুলো ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ার কারণ–এটি উভয় পক্ষকেই সাময়িকভাবে দুর্বল বা অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেয়। কাজেই, যুদ্ধ তার নিজস্ব গতিতেই চলতে থাকবে। কোনো সামগ্রিক সমাধান হবে না, কোনো দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তিও হবে না। তবে যেহেতু বিদ্যমান পরিস্থিতি উভয় পক্ষের জন্যই সহনীয়, এবং কোনো পক্ষেরই একক নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ক্ষমতা নেই। তাই হঠাৎ করে বড় কোনো চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও তৈরি হবে না। তেহরান বা ওয়াশিংটন কেউই পরাজিত হবে না; আবার কেউই জিতবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধটি এমন রূপ নেওয়ার কথা ছিল না। যখন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সাথে যুক্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে হামলা চালায়, তখন ওয়াশিংটন ভেবেছিল–তারা দ্রুত জয়লাভ করবে। সর্বোপরি, দুই দেশ মিলে ২০২৫ সালের জুনেই ইরানের বেশির ভাগ পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছিল এবং তাদের অসংখ্য মিসাইল ক্ষেত্র উড়িয়ে দিয়েছিল। ইসরায়েল ইরানের বহু জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী এবং দুই ডজনেরও বেশি সামরিক নেতাকে হত্যা করেছিল, আর লেবাননে হিজবুল্লাহকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। ইরানের দীর্ঘদিনের মিত্র সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতা হারিয়েছিলেন এবং রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভে ইরানের নিজস্ব সরকারও কেঁপে উঠেছিল। মার্কিন সামরিক বাহিনী ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের আকাশসীমায় একচ্ছত্র আধিপত্য উপভোগ করছিল। এক কথায়, মনে হচ্ছিল ইরানি শাসনব্যবস্থা পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
সংঘাতের প্রাথমিক দিনগুলোতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির অনেক শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে হত্যা করে। কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটবে বলে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়। এই শাসনব্যবস্থা দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করে এবং শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করে। তারা পারস্য উপসাগরে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জেটি, মিসাইল লঞ্চার ও রাডার সিস্টেম উড়িয়ে দেয়। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে তারা সমুদ্রপথের বাণিজ্যিক চলাচল স্থবির করে দেয়। এ ছাড়া মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে সহায়তার মাশুল হিসেবে ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালায় ইরানি বাহিনী।
ইরানের আবাদান রিফাইনারি এলাকায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ইরান, ১৪ জুন ২০২৫। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য এসব বিপর্যয়কে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে দাবি করছেন, আর মাত্র একটা জোরালো হামলা বা নিছক আরেকটা নিষেধাজ্ঞার ধাক্কাতেই তেহরান নতি স্বীকার করতে বাধ্য হবে। কিন্তু ইসরায়েল ও ওয়াশিংটন কোনো বড় ইস্যুতে তেহরানকে আপস করতে বাধ্য করতে পারবে–এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। তারা বারবার বিমান হামলা চালিয়ে এই শাসনব্যবস্থার কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মসূচি ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তেহরান বারবার তা গুছিয়ে নিচ্ছে। বিগত হামলাগুলো যা অর্জন করতে পারেনি, ভবিষ্যতের বিমান হামলা তা কীভাবে করবে, তা বোঝা কঠিন।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র তার পরিকল্পনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবরোধ এবং পর্যায়ক্রমিক বোমাবর্ষণের পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। বৈশ্বিক বাজারে ইরানের প্রবেশের পথ রুদ্ধ করা, তাদের বিভিন্ন পণ্য আমদানি এবং প্রধান পণ্য যেমন তেল রপ্তানির ক্ষমতা সীমিত করার ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ সফল হয়েছে। কিন্তু এতেও তেহরান নতি স্বীকার করবে–এমন সম্ভাবনা কম। সমুদ্রপথ বন্ধ হওয়া ও আকাশপথের সুযোগ কমে যাওয়াকে স্থলপথ এবং কাস্পিয়ান সাগর হয়তো পুরোপুরি পুষিয়ে দিতে পারবে না। তবে এই পথগুলোর উপস্থিতির কারণে ইরানকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চীন ও রাশিয়া ইরানকে বৈচিত্র্যময় পণ্য ও মূল্যবান সামরিক গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে। মার্কিন অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব বাস্তব হলেও ইরান সরকার সেই ক্ষতির চাপ সামরিক ও নিরাপত্তা খাতের খরচ না কমিয়ে জনগণের ওপরই চাপিয়ে দেবে। কারণ, বাহ্যিক শত্রু ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সামরিক খাতই তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। স্বাভাবিকভাবেই দেশটির সাধারণ মানুষকে ধসে পড়া মুদ্রা ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির সাথে সরাসরি লড়াই করতে হচ্ছে। সাধারণ ইরানিদের কাছে এই অবস্থাকে সহনীয় বলাটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর শোনাবে। কিন্তু যা ইরানি সমাজের জন্য অসহনীয়, তা রাষ্ট্রের জন্য নিখাদ সহনীয় হতেই পারে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির পুরো ইরানকে অর্থনৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচানোর প্রয়োজন নেই। তাদের কেবল নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান ও অংশীদারদের সুরক্ষিত রাখাই যথেষ্ট।
মার্কিন কর্মকর্তারা হয়তো আশা করছেন, ইরানের সাধারণ মানুষ যত বেশি দরিদ্র হবে, তেহরানের মনোভাবও হয়তো তত বদলাবে। কিন্তু ইরানি নেতারা বিশ্বাস করেন, তারা এক অস্তিত্ব রক্ষার সংকটের মুখোমুখি। আর এমন পরিস্থিতিতে নেতারা কোনো অর্থনৈতিক কষ্টকেই লড়াই থামানোর কারণ হিসেবে গণ্য করেন না। তাছাড়া এই শাসনব্যবস্থা এর চেয়েও ভয়াবহ এবং দীর্ঘমেয়াদী সংকট চোখের পলক না ফেলে মোকাবিলা করেছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দেশটি ইরাকের সাথে যুদ্ধ করেছিল, যেখানে শত শত কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি জীবন গিয়েছিল লাখ লাখ ইরানির। কিন্তু তাও তেহরানকে থামানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। বস্তুত, নিজস্ব ভূখণ্ড থেকে ইরাকি বাহিনীকে বিতাড়িত করার পরও অভ্যন্তরীণ চরম ক্ষয়ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে তেহরান উল্টো ইরাক আক্রমণ করে বসে এবং প্রতিপক্ষ প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের চেষ্টায় আরও ছয়টি বছর ব্যয় করে। অবশেষে ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্রের অগ্রগতি, উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য তেহরানের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির পর সেই সংঘাত থমকে দাঁড়িয়েছিল।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র তার সব চাল চালেনি। তারা মাটিতে সেনাও নামাতে পারত। কিন্তু তেমন অভিযান চালানো হলে বহু মার্কিন সেনা হতাহত হতো এবং জ্বালানি তেলের দাম আকাশে উঠত। এসব রাজনৈতিক কারণে এই ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ওয়াশিংটন চাইলে বড় বড় অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাতে পারে, যা ইরানের জ্বালানি নেটওয়ার্ক, পরিবহন, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অন্যান্য স্থাপনার ওপর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনবে। কিন্তু তেহরানও উপসাগরে থাকা মার্কিন মিত্রদের ওপর সমপরিমাণ শক্তিতে পাল্টা আঘাত হানবে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের এই সহনশীলতা উদ্যাপন করেছে ইরানের সরকার। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করার তাদের নিজস্ব সম্ভাবনাও ততটাই নিরাশাজনক। তেলের দাম বা অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে ইরানের কৌশলগত দুঃসাহসিকতা দেখানোর জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে। ফলে তারা সহজেই চাপ বাড়াতে পারবে না। দেশটির নেতৃত্ব হয়তো বিশ্বাস করে যে, তারা দীর্ঘমেয়াদী সংকট সহ্য করতে পারবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নতুন কোনো বড় সংঘাত তাদের এমনিতেই নড়বড়ে সামাজিক ভিত্তিকে আরও গভীর সংকটে ফেলবে। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–বড় ধরনের সংঘাতে ওয়াশিংটন পিছু হটবে–ইরানি কর্মকর্তারা এটি হয়তো কম বিশ্বাস করেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের খামখেয়ালি প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া ডেকে আনতে পারে। তাই আপাতত তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পরিমিত মাত্রায় ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া, নিজেদের শক্তি ধরে রাখা এবং বড় কোনো হামলার পরিস্থিতি তৈরি না করে আমেরিকানদের সহনশীলতার পরীক্ষা নেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেবে।
আর তেহরান যদি নাটকীয়ভাবে যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয়, তবুও তাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইরান হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল করতে পারে, এবং তারা ইতিমধ্যেই এই সংঘাতে ওয়াশিংটনকে বিপুল অর্থ (৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি) খরচ করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মূল বাজেট বহু ট্রিলিয়ন ডলারের, আর উন্নত মিসাইলের ঘাটতি দেখা দিলে ব্যবহার করার মতো বিপুল পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম আধুনিক বোমার মজুত তাদের রয়েছে। তারা সেনা হারিয়েছে সত্য, তবে তা আফগানিস্তান ও ইরাকে হারানো সেনার তুলনায় অতি সামান্য। তাছাড়া দূরে থেকে বা ইরানের সীমানার বাইরে থেকে মিসাইল ছুড়ে তারা যুদ্ধ চালাতে পারে বলে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যাও তুলনামূলক কম।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, তেহরান বা ওয়াশিংটন কোনো পক্ষই একচ্ছত্র জয় পাবে না। এই বাস্তবতাটি শান্তির জন্য ভালো লক্ষণ বলে মনে হতে পারে। দেশগুলো যখন উপলব্ধি করে যে, চূড়ান্ত বিজয় অসম্ভব, তখন তারা প্রায়শই আপসে পৌঁছায়। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই কিছু গৌণ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষ্য রয়েছে, এবং তারা বিশ্বাস করে যে, লড়াই চালিয়ে যাওয়া সেই লক্ষ্যগুলো অর্জনে সাহায্য করবে।
উদাহরণস্বরূপ, ওয়াশিংটন মনে করে, বিরতিহীন বা পর্যায়ক্রমিক হামলা নিশ্চিত করবে যে, তেহরান কখনোই যেন তার সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠিত করতে বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। ওয়াশিংটন তখনই হামলা চালায়, যখন ইরানি শাসনব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে। যেমন উদ্বেগজনক কোনো অস্ত্র ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ বা পারমাণবিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুনরায় শুরু করা। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, তারা ইরানকে রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে বা শাসন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা না করেই দুর্বল রাখতে পারবে।
সামরিক মহড়া চলাকালীন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
অন্যদিকে ইরান বিশ্বাস করে যে, লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাদের হারানো প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে। তারা ইরাকি মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সংগঠিত করছে, যাতে তারা শত্রুদের একাধিক দিক থেকে ব্যস্ত ও আক্রমণের মুখে রাখতে পারে। এ ছাড়া ইরানি শাসনব্যবস্থা এখন আগের চেয়ে বেশি নিজে থেকে প্রথম আঘাত হানতেও দ্বিধা করছে না। উদাহরণস্বরূপ, গত জুলাই মাসে দেশটি জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাটিতে মিসাইল হামলা চালায়। যদিও তার ঠিক আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রত্যক্ষ আক্রমণ ছিল না। এবং অবশ্যই, ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। আগে ইরানি কর্মকর্তারা এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়াকে একেবারে শেষ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতেন, যা কেবল চরম বা সর্বাত্মক যুদ্ধের পরিস্থিতিতেই প্রয়োগ করার কথা ছিল। তারা সেই সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্যই অপেক্ষা করেছিল। কিন্তু মাত্র এক দিনের মধ্যে তেহরান ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান প্রমাণ করেছে, তারা প্রণালীটি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, যা তাদের হাতে দরকষাকষির একটি নতুন শক্তি এনে দিয়েছে।
ইরান এও মনে করে, লড়াই চালিয়ে যাওয়া তাদের হারানো প্রভাব ফিরিয়ে আনতে পারে এবং সম্ভবত তা বাড়াতেও সাহায্য করবে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে আঘাত হানার পর ইরান অবিলম্বে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিধি বিস্তৃত করে তার জবাব দিয়েছিল। এমনকি উপসাগরীয় সেই দেশগুলোকেও ছাড়েনি, যারা সম্প্রতি তেহরানের সাথে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে সময় ব্যয় করছিল। সামগ্রিকভাবে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের এক ডজনেরও বেশি দেশে হামলা চালিয়েছে। তারা প্রমাণ করতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারত্ব ওই দেশগুলোকে অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই হিসাব-নিকাশ সঠিক হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে। তবে অব্যাহত যুদ্ধ থেকে দুটি পক্ষের কারোরই লাভ নেই–এটি দুই পক্ষ বুঝতে পারলেও ইরান-আমেরিকা একটি সমাধানে পৌঁছাতে চরম সংঘাতের মুখোমুখি হবে। কারণ ইরানি কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন যে, তাদের মার্কিন প্রতিপক্ষ ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। ফলে তারা চাইলেও লড়াই থামাতে পারবে না। ওয়াশিংটন একইভাবে আতঙ্কিত না হলেও তারা বিশ্বাস করে যে, নতি স্বীকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের চোখে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো উপহার দেয়, যেমন ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া, তবে তা শত্রুকে কেবল আরও শক্তিশালী করবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এখন স্থিতাবস্থায় আছে বলা যায়, যেখানে কারও সামনে বিজয়ের হাতছানি নেই, নেই পিছু হটার বিকল্পও। ছবি: আল জাজিরা
তাত্ত্বিকভাবে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতির মাধ্যমে এই উদ্বেগগুলোর সমাধান করতে পারত। কিন্তু বাস্তবে, কেউই স্থায়ী আপসে পৌঁছানোর মতো একে অপরকে বিশ্বাস করে না। উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে গত জুনে দুই পক্ষের স্বাক্ষর করা সমঝোতা স্মারকের কথা বিবেচনা করা যাক। চুক্তিটি ইরানের ওপর থেকে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরান ও তার সহযোগীদের ওপর হামলা বন্ধ করার বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া ও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করে উভয় দেশের অগ্রাধিকারমূলক দাবিগুলো মেটানোর জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিষয়ে একমত ছিলেন না।
ওয়াশিংটনের দাবি–এই চুক্তির অর্থ হলো জাহাজগুলো আগের মতোই অবাধে প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। অন্যদিকে তেহরানের যুক্তি ছিল–তারা এখনও চলাচলের ধরন নির্ধারণ করতে এবং মাশুল চাপাতে পারে। ফলে তারা নিজস্ব উপকূলের বদলে ওমানের উপকূলীয় সীমানা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে গুলি চালায়, যা মার্কিন কর্মকর্তাদের চরম ক্ষুব্ধ করে। এদিকে ইরান ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে। কারণ, তারা অবিলম্বে আটককৃত সম্পদ মুক্ত করেনি এবং হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলাও থামায়নি। উভয় পক্ষই সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রতিপক্ষ প্রতারণা করছে, এবং ফলস্বরূপ সংঘাত পুনরায় শুরু হয়।
এই ব্যর্থতার অর্থ এই নয় যে, তেহরান ও ওয়াশিংটন আর কখনো আলোচনায় বসবে না। তারা সম্ভবত একটি সংলাপ বজায় রাখবে এবং সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের জন্য পর্যায়ক্রমে যুদ্ধে সাময়িক বিরতিও নিতে পারে। তবে কূটনীতি ও যুদ্ধ একই সাথে চলতে পারে। যেমন, ১৯৫০-এর দশকে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর আগে বহু বছর ধরে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিল। যতক্ষণ তেহরান ও ওয়াশিংটন একে অপরকে আঘাত করার ক্ষমতা ও মানসিকতা বজায় রাখবে, তারা যতই কথা বলুক না কেন, এই যুদ্ধ থামবে না।
প্রতিবেশীদের ওপর নজর
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন সম্ভবত এক ধরনের স্থবিরতা বা অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। তবুও এই সংঘাত ইসলামী প্রজাতন্ত্র এবং তার আশপাশের পুরো অঞ্চলকে আমূল বদলে দিচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ইরান ছিল এক জটিল একনায়কতন্ত্র। সেখানে ধর্মীয় কর্তৃত্ব, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী নিরাপত্তা ও সামরিক সংস্থা, প্রতিদ্বন্দ্বী পৃষ্ঠপোষক চক্র এবং একটি প্রাণবন্ত সমাজ একসঙ্গে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যু এই কাঠামোর শীর্ষ শক্তিকে বিলুপ্ত করে বিদ্যমান ভারসাম্য নষ্ট করেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শেষ পর্যন্ত স্যুট-বুট বা ধর্মীয় পোশাক পরা বেসামরিক নেতাদের ওপর ইউনিফর্মধারী সামরিক কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় জনগণের মতামত বা অংশগ্রহণের সুযোগ এমনিতেই খুব কম ছিল। এই যুদ্ধের কারণে তা আরও কমে যাবে বা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। দেশের আসল ক্ষমতা চলে যাবে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। আর বাইরে কেবল নামমাত্র ধর্মের পোশাক বা ধর্মীয় শাসন দেখানো হবে।
এর মানে এই নয় যে, বেসামরিক রাজনীতিবিদরা একবারে নিঃস্ব বা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বেন। তারা তখনও আলোচনা করতে পারবেন–ইরানের কি বৈঠকে বসা উচিত, নাকি তারা আরও অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করতে পারবে। কিন্তু তাদের সব ধারণা শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিজাতদের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। এই অভিজাতদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো–প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এবং শত্রুদের আঘাত হানার মতো পর্যাপ্ত আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বজায় রাখা। দেশটি তার বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ মুছে ফেলবে না। দেশের প্রায় সব ক্ষেত্রকেই এখন নিরাপত্তা ঝুঁকি বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। যেমন ইন্টারনেট-যোগাযোগ, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। ফলে এসব বিষয় এখন সরাসরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। দেশটিতে ধর্মের নাম হয়তো থাকবে, কিন্তু যে ধর্মীয় নেতারা একসময় ক্ষমতা ধরে রাখতে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছিলেন, তারা নিজেরাই এখন সামরিক বাহিনীর অধীনে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
এদিকে আরব উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিন্যাস করছে। তাদের কিছু চিন্তাভাবনা তেহরানকে আনন্দিত করতে পারে। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করার পর এখন উপসাগরীয় দেশগুলো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদেরকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি তাড়িয়ে দেবে–এমন সম্ভাবনা কম। সমস্ত ত্রুটি সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র বহিরাগত শক্তি, যা তাদের সামরিক সুরক্ষা দিতে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের প্রতি তাদের অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে। এমনকি কিছু উপসাগরীয় দেশ তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপও নিয়েছে।
এর বদলে এই দেশগুলো সম্ভবত এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ বা দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করবে। তারা তেহরানকে তাদের ওপর হামলা বন্ধ করতে রাজি করানোর আশায় ইরানের সঙ্গে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখবে। পাশাপাশি তারা অভ্যন্তরীণ মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অবকাঠামো সুরক্ষিত করা, বিকল্প জ্বালানি রপ্তানি পথ তৈরি করা এবং তেল, গ্যাস ও অস্ত্রের বৃহৎ কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার চেষ্টা করবে। এই অঞ্চলটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র–উভয়ের সঙ্গে সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে সংঘাত মধ্যস্থতার চেষ্টাও করতে পারে।
সহজ কথায়, যুদ্ধ মানেই চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা। ভবিষ্যতের কোনো আক্রমণ বা অঘটন বর্তমান ভারসাম্যকে সহজেই উল্টে দিতে পারে। যেহেতু দুই পক্ষই বর্তমান স্থিতাবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আগে মনে করত–তারা কোনো দেশে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালিয়ে সেখানকার সরকারকে দুর্বল করতে পারলেও পুরোপুরি ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। কিন্তু এখন তারা সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে। তারা ভাবতে পারে যে, তীব্র আক্রমণ চালিয়ে কোনো দেশের সরকারকে সরাসরি তাদের কথা মানতে বা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা সম্ভব। তারা এমন একটি ফাঁদে পা দিতে পারে।
এর জবাবে ইরান বিশ্ববাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করতে পারে। আবার কোনো ইরানি মিসাইলের আঘাতে বিপুলসংখ্যক আমেরিকান প্রাণ হারালে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় অবকাঠামো ধ্বংস হলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত পদাতিক বাহিনী পাঠানোর বা ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে বর্তমান শাসনব্যবস্থা চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
তেহরান যদি মনে করে, জনগণের ওপর অসীম দুর্ভোগ চাপিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেই হিসাবও ভুল প্রমাণিত হতে পারে। নিত্যপণ্যের তীব্র সংকট নতুন করে গণবিক্ষোভ উসকে দিতে পারে এবং ক্ষমতাসীন অভিজাতদের মধ্যে বিদ্রোহ বা দলত্যাগের প্রবণতার জন্ম দিতে পারে। তখন ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া তেহরানের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তবে আপাতত এই যুদ্ধ উভয় পক্ষের জন্যই সহনীয় মনে হচ্ছে। ওয়াশিংটন তার ঘোষিত কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি এবং তাদের মূল্যবান গোলাবারুদ ও সামরিক রসদ প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছে। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, নতিস্বীকারের মাশুল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচের চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে ইরানি সমাজ বছরের পর বছর ধরে দারিদ্র্য ও চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। তবুও ইসলামী প্রজাতন্ত্রটি আপাতত স্থিতিশীল। তারাও মনে করে না যে, কোনো অর্থপূর্ণ ছাড় দেওয়ার বিলাসিতা তাদের রয়েছে।
এই সংঘাতের আসল প্যারাডক্স এখানেই। দুই পক্ষই দিনশেষে আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেউই বিজয়ী হতে পারবে না। তবুও তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে যুদ্ধ থামানোর বিকল্প পথগুলো আরও বেশি তিক্ত এবং পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।
লেখক: ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক