আয়তনে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হলো কানাডা। এই দেশটিকে ৫১ তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ইচ্ছা অনেকবারই প্রকাশ্যেই বলেছেন প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই সঙ্গে রয়েছে তার বৈশ্বিক শুল্কনীতি। এসব কারণে কানাডা এখন আমেরিকান হামলার সম্ভাবনাও সামরিক পরিকল্পনার আওতায় আনছে।
গত সপ্তাহে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্বীকার, তিনি এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা একসময় কল্পনাও করা হত না। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
কার্নি বলেন, “এমন কোন হামলার ঝুঁকি খুবই কম এবং বাস্তবে এ ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।” নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্কে পরিবর্তন এসেছে। তাই সব ধরনের পরিস্থিতি বিবেচনা করা তার দায়িত্ব। তিনি বলেন, “এটা আসলে ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ।”
গত বছর ট্রাম্প বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্র কখনো কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে– এমন সম্ভাবনা ‘নেই বললেই চলে।‘ তার বদলে তিনি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখবেন বলে জানিয়েছিলেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স
এ সপ্তাহে হোয়াইট হাউস বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডার মহান জনগণের সুরক্ষায় অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি করেছেন।”
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা সামরিক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। এর অন্যতম কারণ হলো– প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশ দুটি একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। তবে বিষয়টি যে কানাডার মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর করা এক জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশেরও বেশি কানাডিয়ান মনে করেন কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন এটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম?
রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ৩৪ বছর দায়িত্ব পালন করা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বিবিসিকে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে যুদ্ধ হলে সেটি হবে অত্যন্ত জটিল, যা কল্পনা করাও কঠিন।” তিনি বলেন, “আমি পুরো কর্মজীবন সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু আমরা কখনোই ভাবিনি যে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার ওপর সামরিক হামলা আসতে পারে।”
কোটস ন্যাটোর বিভিন্ন মিশনেও কাজ করেছেন। তিনি বলেন, “কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বহু বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করে। দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর মূল নীতির একটি হলো– কোন সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। এছাড়া, দুই দেশ নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের অধীনে আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে।”
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
এসব কারণে কোটস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো কানাডার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি সম্ভবত সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। পরিবর্তে সাইবার যুদ্ধ বা অন্যান্য পদ্ধতি দিয়ে শুরু হতে পারে।
কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল না
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ২০ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ ভালো ছিল। সময়ের সঙ্গে দুই দেশের অর্থনীতি, সামরিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। তবে অতীতে তাদের সম্পর্ক এতটা ভাল ছিল না।
কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বিবিসিকে বলেন, “১৮ ও ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণ ঠেকানো কানাডার জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।” তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ভয় কানাডার রাষ্ট্রীয় চিন্তার একটি বড় অংশ।
আধুনিক কানাডা গঠনের আগে ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশ ব্রিটেনের প্রতি অনুগত ছিল। অন্যদিকে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশগুলো ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
কানাডা রাষ্ট্র গঠনের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলো দখলের চেষ্টা করেছিল। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বাহিনী মন্ট্রিয়েল দখল করে এবং কুইবেক সিটিও প্রায় দখল করে ফেলেছিল। এরপর ১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী কানাডার বিভিন্ন এলাকা ও সমুদ্র উপকূলের উপনিবেশগুলোতে কয়েক দফা হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ফল অনেকটা অমীমাংসিতই থেকে যায়। এই যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী পাল্টা হামলা চালিয়ে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।
ফোরান বলেন, “তখন কানাডা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ব্রিটেন, ব্রিটিশ নৌবাহিনী এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করত। এসব জনগোষ্ঠীর নেতারা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন।”
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও প্রভাব বাড়তে থাকলে কানাডা আবারও সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবতে শুরু করে। এর অংশ হিসেবে কানাডা একটি গোপন পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কানাডার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা গোপনে সীমান্তের কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখতেন।
তারা পর্যটকের ছদ্মবেশে সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য শত্রু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন।
২০ শতকে কানাডার ইতিহাস নিয়ে কাজ করা কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চের মতে, তখনো যুদ্ধের সম্ভাবনা খুবই কম ছিল, কিন্তু কানাডা প্রস্তুত থাকতে চেয়েছিল। তিনি বলেন, “এটাই সামরিক বাহিনীর কাজের একটি অংশ। তারা বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করে।”
যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় আক্রমণ করলে কী হতে পারে?
কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিট বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা খুবই কম। তবে কানাডা বর্তমানে এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটিই দেখায় বিশ্ব রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।”
তার মতে, কানাডার নেতাদের এখন কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর মধ্যে একটি হলো- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তারা কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে। কারণ এই সহযোগিতা কানাডাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও ভবিষ্যতে একই তথ্য যুক্তরাষ্ট্র কানাডার বিরুদ্ধেও ব্যবহার করতে পারে।
শ্মিট বলেন, “এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কানাডার মানুষের মধ্যে সত্যিকারের ভয় তৈরি হয়েছে।”
প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে এবারই প্রথম কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় এমন সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে। ফাইল ছবি: রয়টার্স
আমেরিকানরা হয়তো ট্রাম্পের কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মন্তব্যকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কিন্তু কানাডার মানুষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। প্রয়োজন হলে নিজেদের রক্ষার জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছে।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে পারবে?
যদি কোনভাবে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে এর প্রথম ধাপ খুব দ্রুত শেষ হতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে কানাডার সংবাদপত্র গ্লোব অ্যান্ড মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি হিসাব অনুযায়ী- যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকাগুলো দখল হয়ে যেতে পারে। এ অবস্থায় কানাডার সেনাবাহিনী সংখ্যার দিক থেকে দ্রুত পিছিয়ে পড়বে। তখন তারা সম্ভবত গেরিলা কৌশলে যুদ্ধ করে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডা তখন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা চাইতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে এবারই প্রথম কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় এমন সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করেছে।
তবে রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের কোটস বলেন, “এই ধরনের হিসাব এখনো সামরিক যুদ্ধ পরিকল্পনার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তার মতে, অন্য ন্যাটো মিত্রদের তুলনায় স্থলপথে কোন হামলা হলে কানাডা কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনায় পিছিয়ে ছিল। বর্তমান অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে দেশটি।”
এর একটি উদাহরণ হলো- কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধানের সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর সাম্প্রতিক প্রস্তাব। এর মধ্যে প্রায় তিন লাখ তুলনামূলক কম প্রশিক্ষিত নাগরিক সৈন্য যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও যুদ্ধ সহজ হবে না
বিবিসি বলছে, কানাডায় হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ হবে না।
কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের শ্মিটের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি অনেক বেশি হলেও কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দেশটির জনগণ ও সামরিক বাহিনীর সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে। তিনি বলেন, “অনেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা কানাডা আক্রমণের নির্দেশ পেলে পদত্যাগ করতে পারেন। তাদের কাছে এমন নির্দেশ অবৈধ ও অনৈতিক মনে হতে পারে।
কারণ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা নিয়মিত একসঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ নেয় এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক রয়েছে।”
তবে দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে যদি যুদ্ধ শুরু হয়, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কানাডার গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে নজর দেবে বলে মনে করেন শ্মিট। এর মধ্যে তেল ও খনিজ সম্পদ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকতে পারে।
পাশাপাশি তারা কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তার মতে, এমন অভিযান অনেকটা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের মতো হতে পারে।