ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধপ্রস্তুতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চোখে পড়ছে—দেশটি শুধু নিয়মিত সেনাবাহিনী, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কিংবা প্রচলিত সামরিক কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে সাধারণ জনগণকে সম্ভাব্য যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার মোকাবিলায় একটি সংগঠিত প্রতিরক্ষা শক্তিতে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের নাম ‘জানফাদায়ান-ই ইরান’ বা ‘জানফাদা’, যার অর্থ মোটামুটি ‘ইরানের জন্য আত্মত্যাগকারীরা’।
দ্য ক্র্যাডল-এ গত ২৩ সেপ্টেম্বর ফেরেশতেহ সাদেঘির এক প্রতিবেদনে এই উদ্যোগের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, বিদেশি হামলা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে ইরানের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে এমন একটি জনগোষ্ঠী, যাদের বড় অংশকে প্রয়োজনের সময় সংগঠিত ও সক্রিয় করা সম্ভব।
‘জানফাদা’ উদ্যোগের গুরুত্ব বুঝতে হলে এর জন্মপরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ৪০ দিনের যুদ্ধের পর এই আন্দোলনের সূচনা হয়। শুরুতে এটি কোনো প্রচলিত সামরিক বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা ছিল না; বরং যুদ্ধকালীন একটি স্বেচ্ছাসেবী নিবন্ধন কর্মসূচি হিসেবে শুরু হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল এমন বেসামরিক নাগরিকদের চিহ্নিত করা, যারা প্রয়োজন হলে সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু নিবন্ধন শুরু হওয়ার পর উদ্যোগটি দ্রুত বড় আকার ধারণ করে। দ্য ক্র্যাডলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রচার কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, ৩ কোটি ১৬ লাখের বেশি ইরানি এতে নাম নিবন্ধন করেছেন। এমনকি বিদেশে বসবাসকারী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থকরাও কীভাবে বিদেশ থেকে নিবন্ধন করা যায়, তা জানতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
এই সংখ্যাটি নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; ইরানের যুদ্ধকৌশল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ধারণার একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেই এটিকে দেখা হচ্ছে। কারণ আধুনিক যুদ্ধে একটি দেশের প্রতিরক্ষা শুধু সীমান্তে মোতায়েন সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করে না। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে শহর, অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বন্দর, শিল্পাঞ্চল এবং জনজীবনও যুদ্ধের অংশ হয়ে ওঠে। জানফাদা উদ্যোগের পরিকল্পনায় তাই সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি উদ্ধার, ত্রাণ, সামাজিক সহায়তা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়ও রাখা হয়েছে। আন্দোলনের মুখপাত্র সাসান জারেকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বেচ্ছাসেবীদের একটি অংশ নিরাপত্তা ও সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে প্রস্তুত, আর অন্যরা ত্রাণ, উদ্ধার ও সামাজিক কাজে অংশ নিতে আগ্রহী। অর্থাৎ এটি কেবল একটি ‘বেসামরিক সামরিক বাহিনী’ নয়; বরং যুদ্ধকালীন একটি বিস্তৃত সামাজিক প্রতিরক্ষা কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জানফাদাকে ইরানের অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট রক্ষার একটি সম্ভাব্য শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা এমন একটি বিশাল রিজার্ভ কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলে তেহরানসহ বিভিন্ন শহর ও জনপদে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী, সশস্ত্র অস্থিরতা কিংবা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় এই বাহিনী ব্যবহারের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। এর কৌশলগত যুক্তি হলো—নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি যদি দেশের বাইরে থেকে আসা সামরিক আক্রমণ মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে শহর ও দেশের অভ্যন্তরীণ এলাকাগুলো রক্ষার দায়িত্বের একটি অংশ স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর হাতে দেওয়া যেতে পারে। এতে নিয়মিত বাহিনীকে একই সঙ্গে বহিরাগত শত্রু ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—দুই ফ্রন্টে বড় আকারের জনবল ছড়িয়ে দিতে হবে না।
এই পরিকল্পনার পেছনে গত জানুয়ারির অস্থিরতার অভিজ্ঞতাও কাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময়ে ইরানের কয়েকটি শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তেহরান এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি এজেন্টদের পাশাপাশি সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ভূমিকার অভিযোগ তুলেছিল। একই সময়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানিদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইরানি পরিকল্পনাকারীদের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ নয়; বরং বিদেশি সামরিক চাপ, সামাজিক অসন্তোষ, সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত বিভাজন এবং সশস্ত্র অস্থিরতাকে একত্র করে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তাই জানফাদা প্রকল্পের একটি বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে সম্ভাব্য যুদ্ধের সময় দেশের ভেতরের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ফ্রন্টকে স্থিতিশীল রাখা।
এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জানফাদার ব্যাপক সামাজিক সংগঠনের ধারণাটি সরাসরি যুক্ত। আন্দোলনের প্রচারাভিযানে তেহরানের বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে এমন বিলবোর্ডের উল্লেখ রয়েছে যেখানে নাগরিকদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছে—তারা কাঁধে বহনযোগ্য অস্ত্র চালাতে জানেন কি না, অথবা স্নাইপার রাইফেল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ আছে কি না। এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়: উদ্যোগটি শুধু প্রতীকী দেশপ্রেমের প্রচার হিসেবে থেমে থাকতে চায় না; বরং নির্বাচিত স্বেচ্ছাসেবীদের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি ও বাসিজের সিদ্ধান্ত হচ্ছে এমন একটি প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী তৈরি করা, যাকে সংকটের সময় শহর ও দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা যাবে।
জানফাদা উদ্যোগের সামাজিক ভিত্তিও প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মুখপাত্র সাসান জারের বক্তব্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবীদের ৩২ শতাংশ নারী এবং অধিকাংশের বয়স ৪৬ বছরের নিচে। অর্থাৎ এটি শুধু বয়স্ক রাজনৈতিক সমর্থকদের একটি সংগঠন নয়; এতে তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষ-নারী উভয়ের অংশগ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। ১৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে অনুষ্ঠিত মহড়ায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান হাসানজাদেহের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানের জন্য পাঁচ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছিলেন এবং আয়োজকেরা অন্তত ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষের অংশগ্রহণ আশা করেছিলেন। এত বড় জনসমাগমকে ইরান রাষ্ট্রের জন্য একদিকে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা রিজার্ভ এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক-সামাজিক সমর্থনের প্রদর্শন হিসেবে দেখা যায়।
তবে জানফাদার তাৎপর্য কেবল সংখ্যায় নয়, অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। দ্য ক্র্যাডলের প্রতিবেদনে কয়েকজন অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ৫৪ বছর বয়সী সেদিকেহ বলেছেন, তিনি চান শত্রু দেখুক যে ইরানিরা এখনো মাঠে আছে এবং তারা পিছিয়ে যাচ্ছে না। আরেকজন অংশগ্রহণকারী হোসেইন (৩৯) বলেছেন যে এই প্রচার বিশ্বের কাছে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা, জনপ্রিয়তা ও বৈধতার চিত্র তুলে ধরে। ৫১ বছর বয়সী ধর্মীয় নেতা বাহাদোরি বলেছেন, তিনি দেশ, ধর্ম ও ইরানের জনগণকে রক্ষার জন্য এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্যে জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য, ধর্মীয় দায়িত্ব এবং বিদেশি হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ—এই চারটি ধারণা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ও সামনে আসে। জানফাদা কেবল যুদ্ধের সময় ব্যবহারযোগ্য একটি মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠছে না; এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের জনসমর্থন প্রদর্শনের একটি মাধ্যমও। প্রতিবেদনের শেষে যে কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তাতে আন্দোলনের লক্ষ্য হিসেবে ‘টেকসই নিরাপত্তা তৈরি’, ‘জনশক্তি প্রদর্শন’ এবং ‘দেশের শত্রুদের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শক্তিশালী করার’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের জন্য এর দুটি আলাদা মূল্য রয়েছে। একদিকে এটি সম্ভাব্য যুদ্ধের সময় ব্যবহারযোগ্য একটি বিশাল রিজার্ভ; অন্যদিকে এটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে রাষ্ট্রের পক্ষে জনগণের একটি অংশের সংগঠিত সমর্থনের ছবি তুলে ধরে।
এই দ্বৈত ভূমিকা থেকেই জানফাদা উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যায়। একটি রাষ্ট্র যখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কায় থাকে, তখন শুধু অস্ত্র ও সেনা বাড়ানো সব সময় যথেষ্ট নয়। জনগণের মধ্যে প্রতিরোধের মানসিকতা তৈরি করাও একটি কৌশল। ইরানের ক্ষেত্রে এই ধারণা নতুন নয়। প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধ, যাকে ইরান ‘স্যাক্রেড ডিফেন্স’ নামে স্মরণ করে, দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে যুক্ত করে সাধারণ নাগরিকের আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের ধারণাকে আবার সক্রিয় করা হচ্ছে। সেপ্টেম্বরের জানফাদা মহড়াটি ইরান-ইরাক যুদ্ধের ৪৬তম বার্ষিকীর কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত হওয়াও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ।
আরও একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—জানফাদার পরিকল্পিত কাঠামো। আয়োজকেরা শুধু তেহরানে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। অন্যান্য প্রদেশেও ধীরে ধীরে মহড়া ও পদযাত্রা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্থানীয় পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষা প্রয়োজন অনুযায়ী কাঠামো তৈরি করা যায়। প্রশিক্ষণের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও থাকবে। এই ত্রাণ ও উদ্ধার অংশ ইরানিয়ান রেড ক্রিসেন্টের সহযোগিতায় পরিচালিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় জানফাদাকে একদিকে নিরাপত্তা রিজার্ভ এবং অন্যদিকে বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।
সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হলো স্বেচ্ছাসেবীদের এক হাজার ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যাটালিয়নে’ সংগঠিত করা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে একটি যুদ্ধকালীন নিবন্ধন কর্মসূচি ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী, সংগঠিত ও দেশব্যাপী রিজার্ভ কাঠামোয় পরিণত হবে। এর অর্থ হবে, ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল নিয়মিত বাহিনী ও আধাসামরিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৃহৎ সংখ্যক সাধারণ নাগরিককে একটি সংগঠিত জাতীয় প্রতিরক্ষা কাঠামোর অধীনে আনার চেষ্টা করা হবে। ৩ কোটি ১৬ লাখের বেশি মানুষের নিবন্ধনের দাবি এবং এক হাজার ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনা তাই সংখ্যার দিক থেকে যেমন বিশাল, কৌশলগত দিক থেকেও তেমন তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে প্রতিবেদনে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে জানফাদার প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
বিপুলসংখ্যক নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী মানেই বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত যোদ্ধা নয়। দ্য ক্র্যাডল নিজেই উল্লেখ করেছে যে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জানফাদা স্বেচ্ছাসেবীদের প্রতিরক্ষামূলক অভিযানে মোতায়েনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। কিছু স্বেচ্ছাসেবীকে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর ও পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোর আশপাশে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হলেও, পুরো বাহিনী কী ধরনের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, কমান্ড কাঠামো বা বাস্তব যুদ্ধ সক্ষমতা অর্জন করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তাই ৩ কোটি ১৬ লাখ নিবন্ধনের সংখ্যাকে সরাসরি ৩ কোটি ১৬ লাখ প্রশিক্ষিত সামরিক সদস্য হিসেবে দেখা যাবে না।
তারপরও এই উদ্যোগের কৌশলগত বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। ইরান মনে করছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হবে না; দেশের ভেতরেও তার প্রতিফলন ঘটবে। বিদেশি বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের পাশাপাশি নাশকতা, অস্থিরতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সামাজিক বিভাজনও একটি যুদ্ধের অংশ হতে পারে—এমন ধারণা থেকে জানফাদার কাঠামো তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ ইরানের প্রতিরক্ষা চিন্তায় ‘হোম ফ্রন্ট’ বা অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টকে বহিরাগত যুদ্ধক্ষেত্রের সমান গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে। নিয়মিত বাহিনী বহিরাগত শত্রুর দিকে মনোযোগ দেবে, আর স্বেচ্ছাসেবী রিজার্ভ দেশের ভেতরের নিরাপত্তা ও বেসামরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব সামলাবে—এটাই পরিকল্পনার মূল যুক্তি।
সব মিলিয়ে, ফেরেশতেহ সাদেঘির প্রতিবেদনে উঠে আসা জানফাদা উদ্যোগকে ইরানের যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিরক্ষা মানসিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়। ৪০ দিনের যুদ্ধের পর শুরু হওয়া একটি স্বেচ্ছাসেবী নিবন্ধন কর্মসূচি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে কোটি মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা একটি বৃহৎ জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এখন সেটিকে এক হাজার জাতীয় প্রতিরোধ ব্যাটালিয়নে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য শুধু যুদ্ধ করা নয়; শহর রক্ষা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, উদ্ধার, ত্রাণ, সামাজিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রের পক্ষে জনসমর্থনের প্রদর্শন—সবকিছুকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা।
এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ইরান মূলত একটি বার্তা দিতে চাইছে—দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলে প্রতিরোধ কেবল সামরিক ব্যারাকে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সমাজের একটি বড় অংশকেও তার অংশ করা হবে। এই ধারণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা ভবিষ্যতের সংঘাত ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে জানফাদা ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি ইরানের সেই প্রতিরক্ষা দর্শনকে প্রকাশ করছে, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি জনগণের সংগঠন, জাতীয়তাবাদ, আত্মত্যাগের ধারণা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ‘৩ কোটি ১০ লাখের বেশি স্বেচ্ছাসেবী’ এবং ‘এক হাজার ব্যাটালিয়ন’—এই দুটি সংখ্যা শুধু জনবল বা সাংগঠনিক পরিকল্পনার হিসাব নয়; এগুলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইরান কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকে একই প্রতিরক্ষা কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে, তারই সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ।