ঘড়িতে তখন রাত ১২টা। নারীরা হাতে জ্বলন্ত মশাল উঁচিয়ে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসেন। ট্রাফিকের কোলাহল ছাপিয়ে তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন, “এবার আমরা সমঅধিকার চাই।”
বাংলাদেশের অনেকের কাছেই গত কয়েক সপ্তাহ ছিল উল্লাসের। কারণ প্রায় ১৭ বছর পর তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই অভ্যুত্থানে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়িত ও কারাবন্দী বিরোধী দলীয় নেতারা এখন প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বহু বছর পর প্রথমবারের মতো অবাধে জনসভা করছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী এখন ভারতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন এবং বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তার দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না।
কিন্তু দেশের বিপুল সংখ্যক নারী, যারা অভ্যুথানের অগ্রভাগে ছিলেন, তাদের মধ্যেও নির্বাচনের আশা হতাশায় ও ভয়ে রূপ নিয়েছে। এর কারণ হলো, উগ্রবাদী ধর্মীয় রাজনীতির পুনরুত্থান এবং নির্বাচনী দৌড়ে নারী প্রার্থীর তীব্র অভাব। আর নারীরা আশঙ্কা করছেন এতে নারী অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হতে পারে।
সবাই আশা করেছিল এই নির্বাচনে পরিবর্তন আসবে। কিন্তু তার পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে খুব কৌশলে আমরা নারীদেরকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সেইসাথে তাদের অধিকার নিয়ে হুমকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন শেকল ভাঙার পদযাত্রায় অংশ নেওয়া সাবিহা শারমিন (২৫)। তিনি বলেন, “আমরা উদ্বিগ্ন যে এই নির্বাচন দেশকে ১০০ বছর পিছিয়ে দেবে।”
হাসিনা শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল জামায়াতে ইসলামী। সে সময় নির্বাচন কারচুপি ও বিরোধীদের দমন করা হতো। এই ইসলামপন্থী দলটিকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করে। তাদের নেতাদের কারাবন্দী, গুম বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
হাসিনার পতনের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী অভূতপূর্ব উদ্যমে সংগঠিত হয়েছে। তারা বিএনপির জন্য এক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। এতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপির জন্য যেই নিরঙ্কুশ বিজয়ের কথা চিন্তা করা হয়েছিল তা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সীমিত জনমত জরিপ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে বিএনপিই নির্বাচনে জিতবে, তবে মনে হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নজিরবিহীন ভোট পাবে এবং নির্বাচনের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হবে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ বিষয়ক পরামর্শদাতা থমাস কিন বলেন, “একটি উল্লেখযোগ্য বিরোধী দল হিসেবে হোক বা ক্ষমতায় বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যতে একটি উগ্র ইসলামি দল কেন্দ্রে অবস্থান করবে বলে মনে হচ্ছে।”
সমালোচকরা বলছেন, উগ্রপন্থী রাজনীতির পুনরুত্থান ইতিমধ্যেই সমাজে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। গ্রামীণ এলাকায় ফুটবল খেলাকে অশ্লীল আখ্যা দিয়ে মেয়েদের খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এছাড়া, নারীরা জানিয়েছেন যে তারা যদি মাথার চুল না ঢাকেন বা শালীন পোশাক না পরেন, তবে তাদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
সংস্কার, নারী নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছ রাজনীতির ওপর জোর দিয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করলেও, দলটি একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি। দলের আমির শফিকুর রহমানের বিভিন্ন বক্তব্য জনমনে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার করেছে।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: ফেসবুক
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসলাম পরিপন্থী হওয়ায় কোনো নারী কখনোই এই দলের নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। এছাড়া গত বছরে করা তার কিছু মন্তব্যও পুনরায় আলোচনায় এসেছে, যেখানে তিনি বৈবাহিক ধর্ষণের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন এবং ধর্ষণকে ‘অনৈতিক নারী ও পুরুষের বিবাহবহির্ভূত মিলন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ঢাকার মধ্যরাতের পদযাত্রায় অংশ নেওয়া ২১ বছর বয়সী পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী জাইবা তাহজীব বলেন, “ইরান বা আফগানিস্তানে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি শোনা যায়। এই নির্বাচনে নারীর সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা সবই এখন ঝুঁকির মুখে।”
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বাংলাদেশের শ্রমশক্তির ৪৪ শতাংশই নারী, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। কিন্তু সেই দেশে এই দলটির প্রস্তাবিত নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নারীদের কাজের সময় আট ঘণ্টা থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা। এর ফলে নারীরা যেন বাড়িতে বেশি সময় কাটাতে পারেন, সেজন্য সরকার আয়ের ঘাটতি ভর্তুকি হিসেবে দেবে।ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর প্রগতিশীল দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ যখন ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর জোটে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়, তখন হতাশা আরও বাড়ে। নারীদের অগ্রভাগে রেখে রাজনৈতিক বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠা দলটি এখন মাত্র দুইজন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
এনসিপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও চিকিৎসক তাজনুভা জাবীন জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট ঘোষণার পর দল ত্যাগকারী নারীদের একজন। এই জোট গঠনের সিদ্ধান্তটি দলের শীর্ষ পর্যায়ের হাতেগোনা কয়েকজন পুরুষ সদস্য কোনো আলোচনা ছাড়াই নিয়েছিলেন।
জাবীন বলেন, “এটি ছিল এক স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। জুলাই অভ্যুত্থানে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, সেই পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করার এবং একটি তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার এটিই ছিল ঐতিহাসিক সুযোগ। কিন্তু তারা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং এই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা নারীদের কণ্ঠরোধ করেছে। অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলছি, এই নির্বাচন জুলাই বিপ্লবের চেতনার প্রতিনিধিত্ব করবে না।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই নির্বাচনে নারীদের উপেক্ষা করার ব্যর্থতা কেবল জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপি’র একার নয়, বিএনপিরও ৫ শতাংশেরও কম প্রার্থী নারী।
তাজনুভা জাবীন। ছবি: সংগৃহীত
৯১ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস বেশ অম্লমধুর। দেশ গঠনের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলেও ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসনামলে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সংবিধানের মাধ্যমে আবারও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, বর্তমানে যারা জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করছেন, তাদের অনেকেই মূলত গতানুগতিক পুরোনো রাজনীতির ওপর বিরক্ত। দেশটির প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শাসনে পরিবারতন্ত্র এবং লাগামহীন দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
তরুণ ও নতুন ভোটারদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর জনপ্রিয়তা লক্ষণীয়। মোট ভোটারের প্রায় ৪২ শতাংশই তরুণ এবং তারা পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনা সরকারের স্বৈরাচারী আচরণ ধর্মনিরপেক্ষতাকে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা এবারের নির্বাচনে ভোটারদের ইসলামপন্থী রাজনীতির প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নতুন মুখগুলোর একজন হলেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান, যিনি ঢাকা থেকে নির্বাচনে লড়ছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতার ছেলে আরমানকে হাসিনা আমলে অপহরণ করা হয়েছিল এবং তিনি আট বছর ধরে গোপন বন্দীশালায় কারাবন্দী থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হাসিনা সরকারের পতনের পরদিন তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তখন তিনি ভেবেছিলেন এবার বোধহয় তাকে মেরে ফেলার জন্যই বের করা হচ্ছে।
কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, “আট বছর ধরে আমার ওপর নির্যাতন চলেছে, যা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। মনে হতো যেন আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। যারা গুম হয়ে আর কখনো ফিরে আসেনি, আমি তাদের সবার প্রতিনিধিত্ব করতে এখানে এসেছি।”
সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বার্তা দিয়ে আরমান জোর দিয়ে জানান, তার দল সম্পর্কে নারীদের ভীতি ভিত্তিহীন এবং এটি রাজনৈতিক অপপ্রচারের অংশ।
তিনি বলেন “আপনি যখন শহরের অভিজাত শ্রেণির সাথে কথা বলবেন, তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো নারীরা সরকারের শীর্ষ পদে থাকতে পারবে কি না, বা নারীরা যা খুশি তা পরতে পারবে কি না।” এগুলো নারীবাদী দাবি। মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাঠপর্যায়ের নারী, বিশেষ করে শ্রমজীবী নারীদের প্রাথমিক প্রয়োজন হলো নিরাপত্তা, এবং সেটাকেই আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”
জামায়াতের এই নেতা বলেন, “হয় তো অদূর ভবিষ্যতে আপনারা আমাদের দল থেকে নারী প্রার্থী দেখবেন।”
জামায়াতে ইসলামীর হাজার হাজার নারী সমর্থক আরমানের নির্বাচনী এলাকা ঢাকার রাস্তায় করেছেন। দলটি তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২৭ বছর বয়সী সিরাজিম মুনিরা বলেন “জামায়াত যে নীতিগুলো প্রস্তাব করছে, তা নারীদের জীবনযাত্রার মান ও নিরাপত্তা উন্নত করবে। আমি মনে করি, দেশে ইসলামী আইন আনা ভালো হবে কারণ এটি আমাদের সৎ এবং দুর্নীতিমুক্ত করবে।”
৫৮ বছর বয়সী আইনুন নাহার বলেন, ‘‘জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ে নারীরাই মূল চালিকাশক্তি। জামায়াত আমাদের ক্ষমতায়ন করে। তবে তিনিও একমত পোষণ করেন যে নারীদের কখনোই দলের প্রধান হওয়া উচিত নয়। একটি ইসলামী দল হিসেবে নারীদের নেতা হওয়া নিষিদ্ধ, কিন্তু আমরা পর্দার আড়ালে থেকে আমাদের নেতাদের অনুপ্রাণিত করব, উৎসাহিত করব এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব।”