ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার যুক্তিতে গাজায় একের পর এক হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এমনকি যুদ্ধবিরতি চলমান থাকা অবস্থাতেও ইসরায়েল নিয়মিতভাবেই হামলা করে যাচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রতিবেশী দেশ সিরিয়া।
বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে দেশটির ভেতরেও নিয়মিত সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল।
সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পাশাপাশি তারা নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তোলার কথাও বলছে। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠছে, গাজার পর এবার কি সিরিয়াও একই ধরনের বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে?
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা জানিয়েছে, গত রোববার ভোরে ইসরায়েলি বাহিনী দারা প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের ইয়ারমুক অববাহিকার মারিয়া ও আল-আরদা গ্রামে অনুপ্রবেশ চালিয়েছে।
তবে এটি সিরিয়ায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ইসরায়েল নিয়মিতভাবে সিরিয়ার ভেতরে হামলা ও সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু সিরিয়া-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাস আরও পুরনো।
১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর শুরু হয় ইয়োম কিপুর যুদ্ধ। এটি ছিল আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের চতুর্থ যুদ্ধ।
ইহুদিদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব ইয়োম কিপুরের দিন মিশর ও সিরিয়া একযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করে।
তখন রমজান মাসও চলছিল। ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে পরে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নও নিজেদের মিত্রদের সমর্থনে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে।
যুদ্ধ শুরুর মূল উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে দেশটি আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য আরও অনুকূল শর্তে শান্তি আলোচনায় বসতে রাজি হয়।
যুদ্ধ শেষে ১৯৭৪ সালের ৩১ মে জেনেভায় ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে বাহিনী বিচ্ছিন্নকরণ (এগ্রিমেন্ট অন ডিজএঙ্গেজমেন্ট বিটুইন ইসরায়েল-সিরিয়া) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধ রাখা এবং সীমান্তে উত্তেজনা কমানো। এরপর কয়েক দশক ধরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।
কিন্তু এই চুক্তি ২০২৪ এ এসে অকার্যকর হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর তিনি মস্কোতে পালিয়ে যান। এরপর বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর নেতা আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
আল-শারা জাবহাত আল-নুসরার উত্তরসূরি হিসেবে এইচটিএস গড়ে তোলেন। জাবহাত আল-নুসরা ২০১৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত আল-কায়েদার সিরিয়া শাখা ছিল।
পরে তারা আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও অতীতের সেই সম্পর্ক এবং আল-শারার ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
আসাদ সরকারের পতনের পরপরই ইসরায়েল দাবি করে, ১৯৭৪ সালের বাহিনী বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তি কার্যত অকার্যকর হয়ে গেছে।
এরপর তারা জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রণাধীন বাফার জোনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এই অঞ্চলটি ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমি এবং সিরিয়ার বাকি অংশের মধ্যে অবস্থিত।
সেই থেকেই ইসরায়েল নিয়মিত বিমান হামলা, স্থল অভিযান ও তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা সিরিয়ার আরও ভেতরে সামরিক চৌকি স্থাপন করেছে।
কেন হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল?
গ্লোবাল কনফ্লিক্ট ট্র্যাকারের এক নিবন্ধে বলা হয় ইসরায়েলের দাবি, নতুন ইসলামপন্থী সরকার যেন বড় ধরনের সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে না পারে, সে কারণেই তারা সিরিয়ার বিভিন্ন অস্ত্রের গুদাম ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্রুজ, বেদুইন ও সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষের সময় ইসরায়েল এই হামলা আরও জোরদার করে।
সে সময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
একই সঙ্গে তারা দ্রুজদের সেই অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানায়, যেখানে বলা হয়েছিল সরকার বেদুইনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা দক্ষিণ সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান করতে চান।
তারা এই এলাকাকে নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে বর্ণনা করছেন।
গত শনিবার সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ হাসান আল-শাইবানি বাফার জোন থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
তার ভাষায়, ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান ও দখলদারিত্ব পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি।
অন্যদিকে আহমেদ আল-শারা আল জাজিরার আল মুকাবালা অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তা চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে দামেস্ক।
তিনি বলেন, “ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি সফল হলে, সিরিয়ার অধিকৃত গোলান মালভূমির অধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই একটি সার্বিক শান্তির পথ তৈরি হবে।”
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর কোনো আগ্রহ সিরিয়ার নেই।
এবারে শুরুর প্রশ্ন- গাজার পর এবার কি সিরিয়া?
সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের কাছেই গাজার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
গাজায়ও ইসরায়েল তাদের সামরিক অভিযানের পক্ষে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের যুক্তি তুলে ধরেছে। যুদ্ধবিরতি বারবার ভেঙে গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে হামলা চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
সিরিয়ার ক্ষেত্রেও ইসরায়েল নিরাপত্তার প্রয়োজনের কথা বলছে।
একই সঙ্গে তারা সীমান্তের ভেতরে বাফার জোন তৈরি করছে, নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে এবং দক্ষিণ সিরিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির কথা জানাচ্ছে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। গাজার মতো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখনো সিরিয়ায় শুরু হয়নি। বরং জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই দেশ ১৯৭৪ সালের বাহিনী বিচ্ছিন্নকরণ চুক্তি পুনর্বহাল এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়। নিরাপত্তার যুক্তিতে সীমান্তের ভেতরে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, বাফার জোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং নিয়মিত হামলা-এসব কি কেবল সাময়িক ব্যবস্থা, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মানচিত্রে সিরিয়া আবারও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। আর তাই প্রশ্নটিও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে ফিলিস্তিন, গাজার পর এবার কি সিরিয়া?