আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটির মতে, ট্রাইব্যুনালে আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে কর্তৃপক্ষ, যা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার বঞ্চিত করা, আইনের শাসন দুর্বল করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করছে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলেছে এইচআরডব্লিইউ।
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা ঘিরে সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করার পর গতকাল মঙ্গলবার এইচআরডব্লিউ এই প্রতিক্রিয়া জানায়।
এই মামলার আসামিদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও দুজন সাংবাদিক রয়েছেন।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলের নিপীড়নের জবাবদিহি জরুরি, তবে বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। নতুন সরকারের উচিত অবিলম্বে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ বন্ধ করা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে ৮০০-র বেশি মানুষের মৃত্যু ও হাজার হাজার মানুষের আহত হওয়ার ঘটনার পাশাপাশি তৎকালীন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার এখন এই ট্রাইব্যুনালে হচ্ছে। ২০১০ সালে গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল পূর্বে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করলেও তা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটির জন্য সমালোচিত হয়েছিল। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এ পর্যন্ত ৬টি রায়ে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন (যার মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে) এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার অপরাধের সংজ্ঞায় কিছু সংশোধনী আনলেও এইচআরডব্লিউর মতে, তা আন্তর্জাতিক সমতুল্য মানদণ্ড নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও আইনে নতুন কোনো সংশোধনী আনেনি।
এইচআরডব্লিউর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রমাণের ভিত্তি ছাড়াই গ্রেপ্তারের নির্দেশ, কারণ দর্শানো ছাড়া আটকে রাখা এবং অন্তর্বর্তীকালীন আপিলের সুযোগ না থাকার বিধান এখনো বিদ্যমান। প্রমাণ জমা দেওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে বিচার শুরু হওয়া এবং অনুপস্থিত আসামিদের আইনজীবী নিয়োগ ও সাক্ষী জেরায় সীমাবদ্ধতা থাকা। শাপলা চত্বর মামলায় তৎকালীন একাত্তর টিভির মোজম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপাকে লিখিত ব্যাখ্যা ছাড়াই গ্রেপ্তার দেখানো এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হাছান মাহমুদ চৌধুরী ও অন্যান্যদের মামলায় ৫৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দির মধ্যে একাধিক জবানবন্দিতে হুবহু একই অনুচ্ছেদ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাক্ষ্যের সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আসামি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর জামিনের বিনিময়ে ১ কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগে এক প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও সেই তদন্ত শেষ না করেই অভিযোগ গঠন ও বিচারের প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী জোর দিয়ে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতো রাজনৈতিক ‘উইচ-হান্ট’ বা নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি করা উচিত নয়। ভুয়া বা নকল জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে বিচার করলে তা একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার অভাবই নির্দেশ করে, যা প্রকারান্তরে দেশের মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করবে।