গাজায় গণহত্যা: ইসরায়েল কত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে?

ড্যানিয়েল টেস্টার
ড্যানিয়েল টেস্টার
গাজায় গণহত্যা: ইসরায়েল কত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে?
ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা। ছবি: রয়টার্স

গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ৭২ হাজারের কিছু বেশি মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। তবে এই ফেব্রুয়ারি মাসে দ্য ল্যানচেট গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সংঘাতের প্রথম ১৬ মাসে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।

এই ইসরায়েলি হামলাকে বড় আন্তর্জাতিক ও ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাগুলো গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে হিউম্যান রাইট ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও বি-সেলেম।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যা বলছে

গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হলো ওই এলাকার সরকারি জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তারা হাসপাতাল ও অন্যান্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান তদারকি করে।

এখানে কর্মরত আছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এটি গাজার স্থানীয় প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হয়, যা হামাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পাশাপাশি, মন্ত্রণালয়টি রামাল্লায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও সমন্বয় করে।

ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা নিবন্ধন নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ফিলিস্তিনি বাসিন্দাকে একটি পরিচয় নম্বর দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয় কোনো মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, পরিচিতি নম্বরসহ আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত হিসেবে নিবন্ধিত হয়। মন্ত্রণালয় কেবল সেই মৃত্যুগুলো নথিভুক্ত করে, যেগুলো তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা হাসপাতালে পৌঁছায় এবং সব পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যাচাই সম্পন্ন হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে একতরফা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে বহু মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে অথবা এমন এলাকায় পড়ে আছে যেখানে চিকিৎসকেরা পৌঁছাতে পারেনি। ফলে তাদের এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত হিসেবে নিবন্ধন করা যায়নি।

গণহত্যা চলাকালে মন্ত্রণালয় নিহতদের নাম, বয়স, লিঙ্গ ও পরিচয় নম্বরসহ তালিকা প্রকাশ করেছে। ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আনুষ্ঠানিকভাবে ৭২,০৭২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

এর মধ্যে ১১ অক্টোবর ২০২৫-এর তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর চলমান ইসররায়েলি হামলায় নিহত ৬১৪ জনও অন্তর্ভুক্ত। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সংঘাতে আরও ১,৭১,৭৪১ জন আহত হয়েছেন।

৭ অক্টোবর ২০২৫ প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ তালিকা অনুযায়ী, নিহতদের অর্ধেকের বেশি ছিলেন নারী, ১৮ বছরের নিচের শিশু অথবা ৬৫ বছরের বেশি প্রবীণ। মন্ত্রণালয় যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য করে না।

গাজার ধ্বংসস্তূপ
গাজার ধ্বংসস্তূপ

কেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এটিকে নির্ভরযোগ্য মনে করে?

পরিসংখ্যান সংগ্রহে মন্ত্রণালয়কে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজার মানুষের বারবার ও জোর করে বাস্তুচ্যুতি, প্রশাসনিক অবকাঠামোর ধ্বংস এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার বারবার অচল হয়ে পড়া।

এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গাজায় কার্যরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা– মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে।

জাতিসংঘের মানবিক পরিস্থিতি মূল্যায়নকারী সংস্থা UN Office for the Coordination of Humanitarian Affairs (ওচা) তাদের নিয়মিত মানবিক প্রতিবেদনে কোনো বিশেষ সতর্কীকরণ ছাড়াই এসব পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে।

২০০৮-০৯ সালের গাজা যুদ্ধ এবং ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের হিসাব জাতিসংঘের স্বতন্ত্র গণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

রয়্যাল হলোওয়ে ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ‘এভরি ক্যাজুয়ালটি কাউন্টস’ নামের এনজিওর চেয়ারম্যান মাইকেল স্প্যাগাট বলেন, পরিচিতি নম্বর অন্তর্ভুক্ত থাকায় মন্ত্রণালয়ের তালিকা বহিরাগতভাবে যাচাইযোগ্য। তিনি বলেন, “জনসংখ্যা নিবন্ধন ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ইসরায়েল চাইলে সঙ্গে সঙ্গে যাচাই করতে পারে যে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি বাস্তব।” তিনি আরও বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে এটি নজিরবিহীন স্বচ্ছতা। এখানে হামাসকে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। তথ্য বিস্তারিতভাবে পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত।”

তবে তিনি যোগ করেন, “হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক গতি রিয়েল-টাইমে ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে নির্ভরযোগ্য ন্যূনতম হিসাব হিসেবে দেখা উচিত, পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে নয়।”

ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথের গবেষণা কী দেখায়?

গবেষণাটি বলছে, ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত গাজায় ৭৫,২০০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫০ জন। এটি একই সময়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নথিভুক্ত ৪৯,০৯০ মৃত্যুর তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি।

গবেষণাটি আরও বলছে, সংঘাতের পরোক্ষ প্রভাবে– যেমন অনাহার ও চিকিৎসা-সুবিধায় ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে অতিরিক্ত ৮,৫৪০ জন নিহত হয়েছেন।

আরও প্রায় ১২ হাজার ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ছিলেন, যাদের মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়। ফলে ২০২৫ সালের জানুয়ারি নাগাদ সম্ভাব্য মোট মৃত্যুসংখ্যা ৯৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

নতুন গবেষণাটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

দ্য ল্যানচেট ১৮২৩ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী। ইসরায়েলি সামরিক অবরোধের কারণে গাজায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে স্বতন্ত্র একাডেমিক গবেষণার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত ছিল।

এই গবেষণাটি প্রথম পিয়ার-রিভিউকৃত গবেষণা, যা ফিলিস্তিনি মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বাইরে স্বাধীনভাবে মৃত্যুর একটি অনুমান অন্তত দিয়েছে।

ইসরায়েল কী বলেছে?

প্রাথমিকভাবে ইসরায়েল মন্ত্রণালয়ের মৃত্যুর সংখ্যা অবিশ্বাসযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করে। তবে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধে ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের দেওয়া সংখ্যাকে কার্যত স্বীকার করে।

২০২৫ সালের আগস্টে +972 ম্যাগাজিন জানায়, ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা ডাটাবেজ অনুযায়ী ৯ হাজারের কম নিহতকে হামাস যোদ্ধা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইঙ্গিত দেন যে মন্ত্রণালয়ের হিসাব কম দেখানো হতে পারে। তার পূর্বসূরি জো বাইডেন ২০২৩ সালের অক্টোবরে সংখ্যাগুলোর নির্ভুলতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভাষণে ’৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি’ নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।

আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সরকারগুলো নিয়মিতভাবে মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে।

মিডিল ইস্ট আই-এর সৌজন্যে।

সম্পর্কিত