২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর, ইউরোপীয় মিত্ররা প্রাথমিকভাবে ট্রাম্পের অনন্য বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও তার ইচ্ছার সামনে নিজেদের কিছুটা মানিয়ে নিতে এবং নতিস্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল। এর একটি বড় উদাহরণ ছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার-এর দ্রুত হোয়াইট হাউস সফর, যেখানে তিনি রাজা চার্লস (তৃতীয়)-এর পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে একটি নজিরবিহীন দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। স্টারমার ভালো করেই জানতেন যে, ট্রাম্প রাজকীয় জাঁকজমক ও আড়ম্বরের প্রতি ভীষণভাবে দুর্বল।
শুধু স্টারমার নন, অন্য ইউরোপীয় নেতারাও একই পথ অনুসরণ করেছিলেন। এমনকি ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুটে ২০২৫ সালের একটি ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পকে কিছুটা অদ্ভুতভাবে ‘ড্যাডি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের সামনে সুযোগ ছিল বিশ্বকে নিজের মতো করে সাজানোর এবং মুক্ত বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে পুনরুজ্জীবিত করার। কিন্তু এর পরিবর্তে তিনি ক্রমাগত মিত্রদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং বিশ্বমঞ্চে হোয়াইট হাউসের ঐতিহ্যগত দায়িত্ব ও অবস্থানকে প্রত্যাখ্যান করছেন। ফলে, ইউরোপীয় দেশগুলোও এখন ঠিক একই ভাষায় এবং নিজস্ব কৌশলে এর জবাব দিতে শুরু করেছে।
ইউরোপীয় কূটনীতি বিষয়ে একজন এমি অ্যাওয়ার্ড-জয়ী সাংবাদিক লুক ম্যাকগি ওয়াশিংটন ভিত্তিক ম্যাগাজিন ফরেন পলিসিতে তার একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও তার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের কৌশলগত পরিবর্তনের এক গভীর রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
লুক ম্যাকগি লিখছেন, স্নায়ুযুদ্ধের পরবর্তী দশকগুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে এক ধরণের অলসতা ও আত্মতুষ্টির মধ্যে দিন কাটিয়েছে। সেই সময়ে একটি আটলান্টিকপন্থী বা মার্কিন-অনুগামী অবস্থান তাদের জন্য বেশ সুবিধাজনক ছিল। ওয়াশিংটন তাদের নিরাপত্তার খরচ বহন করবে এবং মার্কিন বাজারে বিশেষ সুবিধা দেবে– এই শর্তের বিনিময়ে ইউরোপ নিজেকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারে সম্মতি দিয়েছিল। ট্রাম্পকে খুশি রাখার পেছনে ইউরোপের মূল কারণ ছিল তাদের বিশ্বাস যে, নিরাপত্তার জন্য তখনও তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই হিসাব-নিকাশ আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, একটি সহজ ও আত্মতুষ্টির ব্যবস্থার মূল্যই বা কী থাকবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে জার্মানি থেকে ৫ হাজার সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় কিংবা কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ঢালাওভাবে শুল্ক আরোপ করে? ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে ছোট করার জন্য যখন ট্রাম্প ঘরোয়া সহিংসতা নিয়ে কৌতুক করেন। কিংবা রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান রাজা চার্লস ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যক্তিগত আলাপে ট্রাম্পের সাথে একমত হয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেন। তখন ট্রাম্পের এমন আচরণের পর তার তোষামোদ করা ইউরোপের জন্য কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
তবে ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য ইউরোপের এই চেষ্টা শুধু মুখের কথা বা অঙ্গভঙ্গির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ওভাল অফিসে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ে একটি বড় ধরনের উত্থান ঘটে। ইউক্রেনের যুদ্ধে মার্কিন অর্থায়নের ঘাটতি মেটাতে ইউরোপীয় দেশগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে, যা মূলত প্রকারান্তরে মার্কিন অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পকেটেই গেছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা ট্রাম্পের সাথে এমন একটি যুগান্তকারী ফার্মা বা ওষুধ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যার ফলে ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা (এনএইচএস)-কে প্রতি বছর ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অতিরিক্ত অর্থ গুণতে হবে। ন্যাটোর ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে ট্রাম্পের ক্রমাগত অভিযোগ সত্ত্বেও, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে পুরো ইউরোপ মহাদেশ জুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউস ইউরোপীয় নেতাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে রেখেছিল।
হোয়াইট হাউজ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনসবাস্তব ও অর্থনৈতিক সব দিক থেকেই ট্রাম্পকে চটিয়ে না দেওয়ার মৌলিক যুক্তিগুলো এখনো টিকে আছে। ওয়াশিংটন যে বিশাল নিরাপত্তা পরিকাঠামো বা সিকিউরিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রদান করে, ইউরোপ রাতারাতি তার বিকল্প তৈরি করতে পারবে না। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপের যে বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে, তা হুট করে অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। তবে ইউরোপ এখন যা করছে, তা হলো ট্রাম্পকে সাময়িকভাবে বা বাহ্যিকভাবে খুশি রেখে দীর্ঘমেয়াদী এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যা ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের অতি-নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনবে এবং ইউরোপের নিজস্ব ‘কৌশলগত সার্বভৌমত্ব’ ফিরিয়ে আনবে।
কার্নেগি ইউরোপের গবেষক রিম মোমতাজের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, ইউরোপ মূলত আটলান্টিক চুক্তি বা মার্কিন জোট থেকে এক ধরণের ‘কোয়াইট কুইটিং’ বা নীরবে সরে যাওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। আটলান্টিকপন্থার কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত কিছু দেশও এখন দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন সেবাদাতাদের পরিবর্তে ইউরোপীয় সেবাদাতাদের বেছে নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদের ক্লাউড অপারেটর হিসেবে বিশ্বখ্যাত মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস’ বা এডব্লিউএস-কে বাদ দিয়ে জার্মানির ‘লিডল’-কে বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে, ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মার্কিন ‘প্যাট্রিয়ট’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বদলে ফ্রান্স ও ইতালির যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি ‘স্যাম্প/টি’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লেখক উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্পবাদের কারণে মার্কিন নির্ভরযোগ্যতার যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই ইউরোপীয় দেশগুলো এই ব্যবহারিক পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপগুলো কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থেকে নয়, বরং এক ধরণের আত্মবিশ্বাস থেকেই নেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় এবং ন্যাটো কর্মকর্তাদের সাথে কথা বললে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর জুড়ে যে অনবরত সংকটময় পরিস্থিতি ছিল, তা এখন ইউরোপের সহ্য হয়ে গেছে বা তাদের সংবেদনশীলতাকে ভোঁতা করে দিয়েছে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ নিজেরাই গড়ে তোলার ব্যাপারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ বা কাউ, যা মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমমনা মধ্যম শক্তির দেশগুলোর একটি জোট। এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের আত্মরক্ষার লড়াইয়ে সমর্থন বজায় রাখা। বর্তমানে এই জোটে ৩৫টি দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যার মধ্যে ইউরোপের বাইরের দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং কানাডাও রয়েছে। এটি মূলত ইউরোপীয় নিরাপত্তাকে কেন্দ্রে রেখে একটি সাধারণ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ইউরোপীয় পলিটিক্যাল কমিউনিটির এক বৈঠকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা আবারও পুনর্গঠিত হবে, তবে এবার তার কেন্দ্রবিন্দু হবে ইউরোপ।
মার্ক কার্নির বর্ণিত এই নতুন ইউরোপীয় শৃঙ্খলার মধ্যে যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনও একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সহযোগীরা ইউক্রেনকে যেভাবে ‘কোনো তাস বা সুবিধা না থাকা দেশ’ কিংবা একটি ‘অকৃতজ্ঞ অর্থের অপচয়’ হিসেবে অদ্ভুতভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেছেন, তা সহজেই ভুল প্রমাণিত হয় যখন দেখা যায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি মধ্যপ্রাচ্য সফর করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে বিভিন্ন কৌশলগত চুক্তি করছেন। এই চুক্তিগুলোর আওতায় ইউক্রেন মূলত ইরানের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ওই দেশগুলোকে নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রস্তাব দিচ্ছে। ইউক্রেনের হয়তো এই মুহূর্তে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সামরিক দিক থেকে তাদের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান বিশ্বের অন্যতম কার্যকর এবং সবচেয়ে অভিজ্ঞ যুদ্ধশক্তি– যা ভবিষ্যতের যেকোনো ইউরোপীয় জোটের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ বা সম্পদ হিসেবে কাজ করবে।
ইউক্রেন। ছবি: রয়টার্সকানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং কাউ জোটে থাকা তার সহযোগীরা এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যেভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন তা স্পষ্টতই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি এই বছরের শুরুতে ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন, তখনো মার্কিন মিত্ররা ট্রাম্পকে যৌথ সিদ্ধান্তের বৃত্তের মধ্যে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। তারা এখনও সেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এর মধ্যে আগের মতো কোনো উৎসাহ বা বড় প্রত্যাশা নেই।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ইউরোপের বর্তমান যাত্রার গন্তব্য এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন– এমন একটি গন্তব্য যা তাদের যুক্তরাষ্ট্রের করুণার ওপর অসহায়ভাবে নির্ভরশীল করে রাখবে না। এই পরিবর্তনের হাওয়া আমরা ইতিমধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। কাউ জোটের দেশগুলো এখন এমন সব প্রকল্পে একসাথে কাজ করছে যেখানে জাপান তার পরবর্তী প্রজন্মের ফাইটার জেট বা যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে না তাকিয়ে ইউরোপীয় অংশীদারদের বেছে নিয়েছে। একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১৫০ বিলিয়ন ইউরোর একটি বিশাল অস্ত্রের জন্য ঋণ পরিকল্পনা অবশেষে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে, যেখানে পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়া প্রথম দেশ হিসেবে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ইউরোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে।
ভূ-রাজনৈতিক এই বড় পরিবর্তনগুলো সাধারণত একটি ভারী তেলবাহী জাহাজের গতিতে চলে, যা খুব ধীরে ধীরে মোড় নেয়। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের সেই প্রথম নাটকীয় বিজয়ের পর দীর্ঘ দশ বছর ধরে চলা সমস্ত আকস্মিক ক্ষোভ, উত্তেজনা এবং প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া সংবাদচক্রগুলো অবশেষে সেই তেলবাহী ভূ-রাজনৈতিক জাহাজটিকে অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও ধীর প্রক্রিয়ায় তার গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছে। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় মিত্রদের আবার আগের মতো ওয়াশিংটনমুখী অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।