নগরকান্দা-সালথা: নারী কল্যাণে নারী প্রার্থীর ভাবনা

নিমাই সরকার
নিমাই সরকার
নগরকান্দা-সালথা: নারী কল্যাণে নারী প্রার্থীর ভাবনা
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

ভোট হলো নেতা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের কৌশল। সুতরাং জনগণের প্রতিনিধি কেমন হবে সেটা ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। শামা ওবায়েদ রিংকু ফরিদপুর-২ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন। তিনি নারী সদস্য। নির্বাচনে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বড় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি নির্বাচনী এলাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন। নগরকান্দা সালথা এলাকার মানুষেরা এখন তার দিকে তাকিয়ে। এর মধ্যে নারীদের আগ্রহ আরও বেশি। নারীদের উন্নয়নে তার পরিকল্পনা কি, এ প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে অবলীলায়।

নারীর সম্মান ও তার অধিকার নিয়ে অনেকেই ভাবেন। তারা হাঁটছেন, এগিয়ে যাচ্ছেন সামনে। সেটা কেবল তাদেরই কৃতিত্ব। সমাজ তাদের সহযোগিতা করে, এর মানুষেরাও পাশে থাকে। তবে সবসময় নয়। রাষ্ট্র আইন করে নারীর পক্ষে সমর্থন দেয়। সরকারও তাদের বিষয়টির গুরুত্ব দেয় না এমন নয়। তবে তা নিঃসন্দেহে প্রত্যাশার সমান নয়। এই কারণেই সমাজ নারীবান্ধব সরকার খোঁজে। শামাকে পেয়ে তারা এমন একটি ঠিকানা পায়। এবার নারীর উন্নয়ন হবে সেই আশায় তারা বুকে বাঁধে।

একটা সংসারে ভাইদের তুলনায় বোনদের ত্যাগ বা উৎসর্গ অনেক বেশি। অধিকারবঞ্চিত হয়েও সংসারে সবচেয়ে বেশি অবদান বোনদেরই। তারা ভাইদের মতো লেখাপড়ার সময় বা সুযোগ পায় না। ভাইয়েরা বিয়ে করে নিজের ভিটেমাটিতে থাকেন। বোনেরা অন্যের সংসারে গিয়ে অচেনা সব লোকজনের মন যোগাতে জীবন পার করে দেয়। শাশুড়ির মন জোগাতে হয় তাকে। বাচ্চার জুতা লাগবে কখন তাও ঠিক করে দিতে হয়। এসব ছোট খাটো জিনিসপত্র সংগ্রহের দায়িত্ব অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের ওপরই পড়ে।

সম্বলহীন বোনেরা বাবা মায়ের সম্পত্তির সমান ভাগও পান না। সেই বোন মা হয়েও একই যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হয়। এক সময় ক্লান্তিতে তারও সেবার প্রয়োজন হয়। দরকার হয় ওষুদের, স্বাস্থ্যসেবার। সংসার এ ক্ষেত্রে কখনো দায়িত্বটা বুঝে উঠতে পারে না। হাতের কাছে চিকিৎসা সেবার এই নাকাল দশার  কারণে  কিংবা সচেতনতার অভাবে কষ্ট পেতে হয় মাকে। কেননা অবশেষে সেই সত্যই বেরিয়ে আসে, ‘মায়েদের চিকিৎসার সময় হয় না।’

মাকে সন্তান জন্ম দিতে হয়। প্রতি মাসে শরীর থেকে কতটা রক্ত বের হয়ে যায়! মাথা ব্যথা, পায়ে পানি আসাসহ নানান অসুস্থতা তাকে সহ্য করতে হয়। তবুও নারীকে শুনতে হয়, পুরুষের সমান অধিকার সে পাবে না! এক্ষেত্রে সমাজকে এক কলেজ শিক্ষক বলেই বসলেন, “আরে সমান দরকার নাই! নারীর অধিকারটুকুই নারীকে বুঝিয়ে দেয়া হোক..!”

মায়ের জীবনের বিরাট একটা সময় চলে যায় যত্নআত্তি করে সন্তানকে বড়ো করে তুলতে। মায়ের চাকরি দিন রাত। তাও অবৈতনিক। কোনো সন্তানের অসুখ বিসুখে রাত জেগে বসে থাকেন মা। হিসাব করে সংসারও চালান মা। আবার সংসারে সবচেয়ে বঞ্চিত এবং অবহেলিত মানুষটিও মা। এ এক আজব ব্যাপার।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ। ছবি: ফেসবুক
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ। ছবি: ফেসবুক

একটা কর্মজীবী নারীকে শুধুমাত্র নারী গণ্য করে তার কর্মস্থলে হয়রানি করা হয়। এ যেন সাধারণ দৃশ্য। প্রমোশন আটকে দেওয়া হয়। পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করে বাসায় গিয়ে পুরুষ বিশ্রাম নিতে পারলেও নারী পারে না। তাকে সংসার সন্তান সব সামলাতে হয়। নারী হিসেবে তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তাও করা হয়। এর প্রতিকার কি, সমাজ কি তা ভাবে?

নারীদের ‘আপা’ কিংবা ‘দিদি’ বলে প্রকৃত অর্থেই সম্মান দেওয়া হয়। তারা সাড়া দেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়। বলেন, মর্যাদা অনেক পেয়েছি, অধিকারটা দেন! এ যেন রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদায় অর্জুনের প্রতি সখীর বলে ওঠা, “...পর্বতের তেজস্বী তরুণ তরু সম--/ যেন সে সম্মান পায় পুরুষের।” অর্থাৎ সমান অধিকারটাই তার চাওয়া।  সংখ্যালঘু বুঝি না, একজনের বড়ো পরিচয় সে মানুষ। শামা ওবায়েদ নিজে বলেন। সম্ভবত এ জন্যই তার মুখটি চকচক করে ওঠে। বলেন, “সম্মান এবং অধিকার দুটোই নারীর প্রাপ্য।”

দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় অর্ধেক ভোটার  নারী। সুতরাং তাদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নতি হতে পারে না।  নারীর স্বাধীনতা, নারীর নিরাপত্তা, নারীর শিক্ষা, নারীর স্বাস্থ্য, নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল একটি কর্মসূচি আছে নেত্রীর। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার কথাটিও ভাবেন তিনি। মনের ভেতর জাগ্রত থাকে, গ্রাম পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসার প্রয়োজন। মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনার বোঝা যে তার কাঁধেই নিয়েছেন।

নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা চিন্তা করে কার্ড দেওয়া হবে। শুধু আর্থিক নয় সামাজিক নিরাপত্তাও জরুরি। নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো রাষ্ট্রকে সভ্য বলা চলে না। আর গণতন্ত্রের গুণগত মান এর মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। দেখতে হবে, অন্ততঃ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কতটা চিন্তামুক্ত। তারা সমাজে নিজেদের কতটা নিরাপদ এবং অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করে।

শামার বাবা কে এম ওবায়দুর রহমানের মাহাত্ম্য এখানে চলে আসে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একসঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপনের বিষয়টি ছিল তার চরিত্রের অনন্য অনুষঙ্গ। এর মধ্য দিয়ে উদ্ভাসিত স্বাধীনতার অন্যতম সংগঠক এই প্রাণ পুরুষের বার্তা। দারুন এক আহ্বানে তিনি ছিলেন ভাস্বর। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা পূজা করবে, সবাই মিলে সেই অনুষ্ঠান পালন করবে। শামারও বিশ্বাস, “এইভাবে দেশের উন্নয়নও একসঙ্গে হবে।”

সাহসী ও প্রতিবাদী এক নারীর নাম শামা ওবায়েদ। নারীর প্রতি সহিংসতা, সব ধরনের নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন এই নারী। নারী নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন ও শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি সব সময়ই উচ্চকণ্ঠ।

নারী নিয়ে তার আছে বড় পরিকল্পনা। একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলেই সেটা বাস্তবায়ন সম্ভব। সেজন্যই লড়াই। এই কারণেই বারবার একটি নারীবান্ধব সরকারের কথা আসে। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া প্রতিটি ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় কর্ম পরিচালনার স্বাধীনতাও কোনোভাবেই উপেক্ষার ব্যাপার নয়। পরিকল্পনাকে ঘিরে তিনি নগরকান্দা সালথা অঞ্চলে বৃহৎ কেন্দ্র করবেন। এখানে সম্মেলন হবে এক ঝাঁক আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীর।

নাগরিক অধিকার কী, নারীর অধিকার কী, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কি সুযোগ না অধিকার– এই কথাগুলো তিনি মানুষকে বুঝিয়ে বলতে পারেন। এজন্যই গরিব, নিপীড়িত মানুষ তাকে নিজেদের নেতা বলে গ্রহণ করে নেয়। আর যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মানুষকে সচেতন করার প্রবল শক্তি আছে তার।

সময় পাল্টেছে। পাল্টে গেছে মানুষের মন। নির্বাচনের মাঠে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। সবসময় বলেন তিনি। আমরাও বলি, কোনো প্রার্থীকে দুর্বল ভাবা ঠিক না। পুরনো ভোটারদের অনেকেই লোকান্তরে। নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন অসংখ্য। তারা প্রথমবার ভোট দেবেন। এই ভোটাররা যেদিকে হেলবেন, সেদিকেই পাল্লা ঝুঁকে পড়বে।    নিশ্চয়ই সে হিসেব নারী এই প্রার্থীর আছে। “ভালোবাসি, ভালোবাসি– এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি।” শামা নিজের মধ্যেই গেয়ে ওঠেন। প্রকৃতির মধ্যে তিনি তার আরাধ্য ভোটারের সৌন্দর্যকে দেখতে পান।

নারীর কল্যাণ ও ভাবনার জয় হোক।   

লেখক: প্রকৌশলী, কথা সাহিত্যিক

সম্পর্কিত