Advertisement Banner

ভারতের বহুমুখী-জোটবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারতের বহুমুখী-জোটবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গণতন্ত্রীকরণ
ভারতের ভূরাজনৈতিক নীতি আদর্শবাদের চেয়ে নিজস্ব স্বার্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

প্রাচীন সভ্যতা, বিশাল জনসংখ্যা আর অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থান সবসময়ই কৌশলগত। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের আত্মপ্রকাশ কেবল একটি দেশের মুক্তি ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্বমঞ্চে এক সুপ্ত মহাশক্তির জাগরণ। দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করায় ভারতের মধ্যে প্রথম থেকেই এক ধরনের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনচেতা ভাব ছিল, যা পরবর্তীতে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। স্নায়ুযুদ্ধকালীন ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর ‘বহুমুখী-জোটবদ্ধতা’—ভারতের প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপই মূলত তার নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন রক্ষা এবং বিশ্বব্যবস্থায় নিজের যোগ্য স্থানটি বুঝে নেওয়ার প্রয়াস। বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বরাজনীতিতে ভারত আর কোনো পরাশক্তির অনুসারী নয়, বরং সে নিজেই দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর এক প্রভাবশালী দেশে পরিণত হচ্ছে । 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক কাঠামোর ত্রুটি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা মূলত যুদ্ধের জয়ী পক্ষগুলোর হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল। সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এশিয়া ও আফ্রিকার এক বিশাল অংশ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। ফলে, বৈশ্বিক পরিচালনা কাঠামো বা গ্লোবাল গভর্ন্যান্স থেকে স্বভাবতই তারা বাদ পড়ে যায়। এই ঐতিহাসিক সত্যটিই স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা কেন শুরু থেকেই পুরোপুরি গণতান্ত্রিক হতে পারেনি।

তবে ডিকলোনাইজেশন বিশ্বরাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। ১৯৫৫ সালের ঐতিহাসিক বান্দুং আফ্রো-এশিয়ান সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ‘গ্লোবাল সাউথ’ রাষ্ট্রগুলো বৈশ্বিক শৃঙ্খলায় নিজেদের কণ্ঠস্বর ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হয়। বান্দুং সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ভারত ১৯৪৫ সালের সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনে অংশ নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সনদে স্বাক্ষর করলেও, তাকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন দেওয়া হয়নি।

১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারত মূলত দুটি পরিচয় নিয়ে যাত্রা শুরু করে—প্রথমটি হলো একটি সুপ্ত মহাশক্তি, এবং দ্বিতীয়টি হলো অনন্য সংগ্রামের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শাসনকে পরাস্ত করার গৌরব। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের স্নায়ুযুদ্ধকালীন ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ এবং বর্তমানের ‘বহুমুখী-জোটবদ্ধতা’-র মহাকৌশলকে এই দুই পরিচয়ের আলোকেই সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

বহুমুখী-জোটবদ্ধতা ও বিশ্বব্যবস্থার সংস্কার

বহুমুখী-জোটবদ্ধতা হলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রধান পরাশক্তিগুলোর সাথে একই সময়ে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কৌশল। একটি গণতান্ত্রিক ও বহু-মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার যে তাগিদ ভারতের মধ্যে দেখা যায়, তা মূলত এই কৌশলেরই একটি ফল। কারণ কেবল একটি বহু-মেরুর বিশ্বেই এই নীতি সফল হতে পারে।

পৃথিবীতে ভারত গ্লোবাল সাউথের একটি প্রগতিশীল ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। ছবি: ফেসবুক
পৃথিবীতে ভারত গ্লোবাল সাউথের একটি প্রগতিশীল ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। ছবি: ফেসবুক

ফলস্বরূপ, ভারত জাতিসংঘ এবং আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো পশ্চিমা-নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বৃহত্তর প্রতিনিধিত্বের জন্য চাপ দিয়ে আসছে। ভারতের এই নীতি আদর্শবাদের চেয়ে নিজস্ব স্বার্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল। বিশেষ প্রয়োজনে কোনো পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে পড়লেও, উপযোগিতা শেষে ভারত তা সংশোধন করে নেয়—যদিও এই সংশোধনী আসতে কখনো কখনো দীর্ঘ সময় লেগে যায়।

ঐতিহাসিক বিবর্তন ও কৌশলগত সন্ধিক্ষণ

নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন না পেলেও ভারত শুরু থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগে (যেমন: ১৯৫০ সালে কোরিয়ায় এবং ১৯৬০ সালে কঙ্গোয়) এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রচেষ্টায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তবে, ১৯৬২ সালে চীনের কাছে সামরিক পরাজয় এবং ১৯৬৬ সালে রুপির অবমূল্যায়নের মতো অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা উন্নয়নশীল বিশ্বে ভারতের মর্যাদাকে কিছুটা ক্ষুণ্ন করে। চীন যুদ্ধের সময় ভারত হতাশ হয়ে লক্ষ্য করে যে, সদ্য স্বাধীন হওয়া বেশিরভাগ দেশই কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ ছিল।

পরবর্তীতে, খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের শর্তযুক্ত ‘শর্ট টেদার’ নীতি এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বাংলাদেশ সমর্থন ও সহযোগিতা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ’ পাঠানো নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন সম্পর্ককে শীতল করে তোলে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার বক্তৃতাগুলোতে ‘বিদেশি হাত’-এর উপস্থিতির কথা বলতেন এবং ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে স্পষ্ট ঝুঁকে পড়ে।

স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে ভারতের কৌশলগত অবস্থানে একটি সন্ধিক্ষণ আসে। একদিকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গ্যাট-এর তুলনায় গ্লোবাল সাউথকে বেশি অন্তর্ভুক্ত করে এবং ভারত ‘ব্রিকস’ গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়—যা পরবর্তীতে মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও ইউএই-কে অন্তর্ভুক্ত করে আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে, পরমাণু বিস্তার রোধ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কঠোর শর্তের মতো বৈশ্বিক নিয়মগুলো একক আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারাই নির্ধারিত হতে থাকে। ভারত বিশ্বায়নকে গ্রহণ ও আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করলেও, ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ায় ন্যাটোর হামলা এবং ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের তীব্র সমালোচনা করে পশ্চিমা ব্যবস্থার বিপরীত অবস্থান নেয়।

চার প্রধান স্তম্ভের সাথে সম্পর্কের সমীকরণ

কাউন্সিন অন ফরেন রিলেশনস-এর প্রতিবেদনে ভারতের বহুমুখী-জোটবদ্ধতার কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটি বহুমুখী-জোটবদ্ধতার বাস্তব রূপ ফুটে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং ইসরায়েলের সাথে তার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সমীকরণে: 

  • যুক্তরাষ্ট্র: ২০০০-এর দশকে চীনকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখার অভিন্ন স্বার্থে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সূচনা হয়। ২০০৫ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০০৮ সালে চূড়ান্ত হওয়া ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে ভারত সোভিয়েত আমলের ঐতিহাসিক ঝুঁকে থাকার প্রবণতা সংশোধন করে। তবে তারা ওয়াশিংটনের সাথে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটে জড়ায়নি।
  • ফ্রান্স: ন্যাটোর সদস্য হয়েও ফ্রান্স চার্লস দ্য গলের আমল থেকেই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নীতি মেনে চলে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের নিজস্ব ভূখণ্ড ও আট হাজার সেনা রয়েছে। ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পরও ফ্রান্স কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি এবং ওয়াশিংটনের চেয়ে অনেক কম শর্তে নয়াদিল্লির কাছে অস্ত্র বিক্রি করে।
  • রাশিয়া: মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি উপেক্ষা করে ভারত ২০২১ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় এবং জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকে ছাড়কৃত মূল্যে তেল কেনা বাড়িয়ে দেয়। যদিও মোট ক্রয়ের অনুপাত হিসেবে রাশিয়ার অস্ত্রের ভাগ কিছুটা কমেছে, তবুও ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। রাশিয়া ভারতের মাধ্যমে চীন-ভারত সম্পর্ক সহজ করতেও ভূমিকা রেখেছে, যার প্রমাণ ২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চলা ‘আরআইসি’ ত্রিপক্ষীয় ফোরাম।
  • ইসরায়েল: ওসলো চুক্তির পর ১৯৯০-এর দশকে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও ভারত ফিলিস্তিন সংকটে ‘দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান’-এর পক্ষে ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিকল্পিত ‘ইন্ডিয়া মিডল ইস্ট ইকোনমিক করিডোর’ (আইএমইসি), অস্ত্র ক্রয় এবং শীর্ষ নেতাদের সফরের মাধ্যমে ভারত ইসরায়েলের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। 

বহুপাক্ষিক সংস্থায় ভারসাম্য রক্ষা

ওয়ার্ল্ড ট্রেড অরগানাইজেশন-এর দোহা রাউন্ডে ভারত পশ্চিমা দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে চীনের সাথেও সহযোগিতা করেছিল। ২০২২ সাল থেকে ভারত প্রতিবছর ‘ভয়েস অব দ্য গ্লোবাল সাউথ’ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করে নিজেকে দক্ষিণ গোলার্ধের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পুনপ্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনে আফ্রিকান ইউনিয়নকে স্থায়ী সদস্যপদ দিতে মূল ভূমিকা রেখেছে।

ব্রিকসের মাধ্যমে পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার ও নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠনে ভূমিকা রাখলেও, ভারত ‘ডি-ডলারাইজেশন’-এর বিরোধিতা করে এবং ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতিত্বের সময় ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার যৌথ নিন্দার উদ্যোগ নেয়নি। একইভাবে, মহাদেশীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ভারসাম্য আনতে ভারত ইউরেশীয় জোট ‘সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন’ (এসসিও)-এ যোগ দিয়েছে, আবার অন্যদিকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনকে প্রতিহত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সাথে ‘কোয়াড’-এ সক্রিয় রয়েছে। যদিও কোয়াডের বিবৃতিতে বেইজিংয়ের নাম সরাসরি উল্লেখ না করে জনকল্যাণমূলক এজেন্ডায় জোর দেয় ভারত।

বর্তমান সংকট ও নতুন সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা

কোনো পরাশক্তির অন্ধ দালালি না করে ভারত যে স্বাধীন অবস্থান নেয়, তা বিশ্বব্যবস্থায় এক-মেরু আধিপত্য রুখে দেয়। জলবায়ু তহবিলের দাবি এবং মার্কিন শুল্ক বা চীনের খনিজ সম্পদকে অস্ত্র বানানোর রাজনীতির মুখে ওমান, ইইউ ও মারকোসুরের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে ভারত মুক্ত বাণিজ্য নীতি টিকিয়ে রেখেছে।

তবে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রতিবেদনটিতে এটিও বলা হয়েছে যে, কোনো পরাশক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়লে ভারতের নিজস্ব স্বার্থ মার খায়, যা পরবর্তী সংশোধনীর জন্ম দেয়। যেমন, ২০০০ সালের পর আমেরিকার দিকে ঘনিষ্ঠতার সংশোধনটি ২০১০-এর শেষের দিকে অন্ধ বন্ধুত্বের রূপ নেয়। একইভাবে, ২০২৬ সালের চলমান মার্কিন-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ ইঙ্গিত করছে যে, ইসরায়েল কার্ডটি ভারত একটু বেশিই খেলে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথে ইরান শক্তিশালী হয়ে ওঠায় এবং মার্কিন নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায়, জরুরি পণ্যবাহী জাহাজ নিরাপদে পার করতে ভারতকে এখন তেহরানের সাথে আলাদা করে দরাদরি করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক বক্তৃতায় গ্লোবাল সাউথকে পুনরায় গুরুত্ব দেওয়া এবং চীনের সাথে বরফ গলার সীমিত চেষ্টা মূলত একটি নতুন ভারসাম্য বা সংশোধনীরই প্রাথমিক লক্ষণ।

মার্কিন-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ

বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চড়া শুল্ক এবং রাশিয়ার তেল ক্রয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। ব্রিকসে ভারতের ভূমিকা ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তিকর এবং ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ এই দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।

ভারতের সাথে আমেরিকার সবসময় স্থায়ী স্বার্থ জড়িয়ে থাকবে। ছবি: রয়টার্স
ভারতের সাথে আমেরিকার সবসময় স্থায়ী স্বার্থ জড়িয়ে থাকবে। ছবি: রয়টার্স

তবে আশার কথা হলো, আমেরিকার ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল স্বীকার করেছে যে পৃথিবী আর এক-মেরু ব্যবস্থায় নেই। অন্যের গণতন্ত্র বা মানবাধিকার নিয়ে আমেরিকার খবরদারি কমানোর নীতিকে গ্লোবাল সাউথ ইতিবাচকভাবে দেখছে। রাশিয়া, ব্রিকস বা জাতিসংঘের সংস্কার নিয়ে দ্বিমত থাকলেও বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাব টিকিয়ে রাখতে আমেরিকার বন্ধুর সংখ্যা বাড়ানো দরকার। সরকার বদল যাই হোক না কেন, ভারতের সাথে আমেরিকার তিনটি স্থায়ী স্বার্থ জড়িয়ে থাকবে। এশিয়ায় বহু-মেরুর ভারসাম্য রাখা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ রাখা। সাথে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা।

ভবিষ্যৎ পৃথিবী আর একক আধিপত্যের যুগে ফিরবে না। এই সংঘাতময় ও নতুন রূপ নিতে থাকা পৃথিবীতে ভারত গ্লোবাল সাউথের একটি প্রগতিশীল ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি একলা চলার নীতি বাদ দিয়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে ফেরে, তবে তারা ভারতকে এক বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পাবে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন ও ইতিবাচক দিগন্তের সূচনা করতে পারে।

সম্পর্কিত