Advertisement Banner

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চুক্তি হলেও কি স্থায়ী সমাধান হবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চুক্তি হলেও কি স্থায়ী সমাধান হবে?
ইরান দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধে যে ক্ষতি করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ নিয়ে আরও একটি নাটকীয় কিন্তু নিষ্ফল সপ্তাহ শেষ হয়েছে। এই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর একটি চুক্তির বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্তের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। কিন্তু পরে তিনি তাতে আরও পরিবর্তনের দাবি তোলেন।

অন্যদিকে, ইরান ইঙ্গিত দেয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করতে পারে। পিছিয়ে না থাকতে ট্রাম্পও বলেন, তিনিও হয়তো আর আগাবেন না।

উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে, যেমনটি তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে করে আসছে। যদিও নামমাত্র একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান মোটামুটি একটি চুক্তির মূল কাঠামো নিয়ে একমত। এর আওতায় অন্তত ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানকে সীমিত নিষেধাজ্ঞা-শিথিলতা দেওয়ার কথা রয়েছে। বিনিময়ে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করবে।

তবে এটি কেবল একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি। এরপরও উভয় পক্ষকে একটি বিস্তারিত চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে হবে যে কারণেই ৬০ দিনের মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কেবল তখনই ইরান তাদের পারমাণবিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে এবং আরও বড় অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।

তবে আপাতদৃষ্টিতে কিছু সীমিত মতপার্থক্যের কারণে আলোচনা আটকে আছে। ইরান চায় অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের পর তাদের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের জব্দ করা সম্পদের একটি অংশ ছাড় করা হোক। অন্যদিকে ট্রাম্প জোর দিচ্ছেন, ইরান যেন আরও স্পষ্টভাবে প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যাবে না এবং তাদের ৪০০ কেজিরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ওয়াশিংটনের হাতে তুলে দিতে হবে।

তাত্ত্বিকভাবে, গ্রীষ্মের শেষের দিকে একটি বড় অংকের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইরানের তাদের ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করার কথা। তাহলে কেন তারা শুরুতেই সম্ভবত ৬ বিলিয়ন থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের একটি মামুলি অর্থ প্রদানের জন্য জেদ ধরে আছে? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত শব্দচয়ন নিয়ে এত বেশি মগ্ন বা জেদ ধরে আছেন, যদি তা শেষ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক না-ই হয়?

বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই এমন আচরণ করছে যেন এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি স্থায়ী হতে চলেছে—অথবা অন্তত একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতাবস্থা তৈরি করবে। ওয়াশিংটনের একজন আরব কূটনীতিক বলেন, "এটি কিন্তু প্রথমবার নয়, আমরা এর আগেও ট্রাম্পকে এমনটা করতে দেখেছি।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত অক্টোবরে চাপ দিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যেমন একটি চুক্তি করিয়েছিলেন ট্রাম্প, ইরানের সঙ্গে চুক্তিটিও অনেকটা সেরকম হতে পারে। ওই চুক্তিতে গাজা যুদ্ধ থামানো ছিল প্রথম ধাপ। এরপর আরও আলোচনার মাধ্যমে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার পুনর্গঠন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আট মাস পেরিয়ে গেলেও এসবের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি।

ইরানের সঙ্গে চুক্তিও যদি অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যায়, তাহলে এর ঝুঁকি আরও বড় হবে। প্রথমত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি রয়েছে। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানেই থেকে যেতে পারে। ধারণা করা হয়, জুনে যুক্তরাষ্ট্র যে স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছিল, সেগুলোর ভেতরে এসব ইউরেনিয়াম এখনো চাপা পড়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দারা নিশ্চয়ই এসব স্থাপনার ওপর কড়া নজর রাখছে।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসডে গ্রাহাম প্রস্তাব দিয়েছিলেন যেন এমন ব্যবস্থা করা হয় যেন ওই স্থাপনাগুলোর ভেতরে ঢুকবে, তার মৃত্যু হবে।” অন্য রিপাবলিকানরা অবশ্য বিষয়টিকে ততটা গুরুতর মনে করছেন না। তাদের যুক্তি, ইরান ইউরেনিয়াম উদ্ধার করলেও তা সমৃদ্ধ করার স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, বাস্তবতা হলো, একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে খুব বেশি সেন্ট্রিফিউজ লাগে না। আর কোনো নজরদারি ব্যবস্থাই শতভাগ নির্ভুল নয়। গ্রাহামের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ওই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হবে। এমনকি ইরান যদি ইউরেনিয়াম উদ্ধার করতে না-ও পারে, তবু তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অন্য ধাপগুলো এগিয়ে নিতে পারে—যেমন ইউরেনিয়ামকে ওয়ারহেডে রূপ দেওয়া বা ক্ষেপণাস্ত্রে সেটি বসানোর প্রযুক্তি অর্জন করা। ফলে ইউরেনিয়ামের মজুত ইরানেই থেকে গেলে তা ট্রাম্পের জন্যও বিব্রতকর হবে।

অন্যদিকে ইরানের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অর্থনীতি। যুদ্ধের কারণে দেশটির কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছেএবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। মে মাসে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৭৭ শতাংশে পৌঁছায়, আর পণ্যমূল্য বেড়েছে ১১৪ শতাংশ। তেহরানের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটিই সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি। ফলে চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে অর্থ ছাড় করা হবে, তা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যেতে পারে।

এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে যদি ইরান তেল রপ্তানির অনুমতি পায়। ট্রাম্প সরাসরি ইরানকে নগদ অর্থ দিচ্ছেন—এমন সমালোচনা এড়াতেই যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। ট্রাম্পের সহযোগীরা বলছেন, ইরান যদি অন্তর্বর্তী চুক্তি ভঙ্গ করে বা স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই সুবিধা আবারও বাতিল করা যেতে পারে। তবে ইরানও একই ধরনের অবস্থান নিতে পারে হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আংশিক একটি চুক্তির অর্থ হলো, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে না। ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে পাতা মাইন সরিয়ে ফেলতে হবে এবং পথটি নিরাপদ ঘোষণা করতে হবে। তখন সেখানে আটকে থাকা শত শত জাহাজ বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তবে সব জাহাজ নিরাপদে এলাকা ছাড়তে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এর ফলে ধীরে ধীরে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ আবার বাজারে ফিরতে শুরু করবে। কিন্তু জাহাজ মালিক ও বীমা কোম্পানিগুলো নতুন করে পারস্য উপসাগরে জাহাজ পাঠাতে দ্বিধায় পড়তে পারে, কারণ আবারও সংঘাত শুরু হলে জাহাজগুলো সেখানে আটকে যেতে পারে।

একইভাবে তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করবে কি না, তা নিয়ে ভাববে। কারণ সেগুলো আবার হামলার শিকার হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতার প্রভাব শুধু তেল-গ্যাস খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। গ্রীষ্মজুড়ে যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলে এবং আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা হলে পর্যটকেরা ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করতে পারে। কিন্তু সামান্য উত্তেজনাও আবার ব্যাপক হারে বুকিং বাতিলের কারণ হতে পারে।

অনেক কোম্পানি পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে পারে। বিদেশি কর্মীরাও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত হয়ে অন্য দেশে কাজ খুঁজতে পারেন।

এই পরিস্থিতি কারো জন্যই ভালো নয়। তবে ইরান যদি কিছুটা হলেও তেল রপ্তানির সুযোগ পায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম ক্ষতির মুখে থাকবে তারাই। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে।

সম্পর্কিত