ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের প্রায় দুই বছরের টানাপোড়েনের কি অবসান হতে যাচ্ছে? এই প্রশ্ন যখন উঠছে, তখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা আশা দেখছেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে সক্রিয় হয়েছে দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ। দুই দেশের কর্মকর্তারা সফরের সূচি ও সম্ভাব্য এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছাজ করছেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণকে সফরের একমাত্র পূর্বশর্ত করে ভারত সফর থেকে বিরত ছিল বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে শেখ হাসিনা ইস্যুটিকে পাশে সরিয়ে রেখে বাণিজ্য, গঙ্গা চুক্তি, জ্বালানি, ভিসা ও যোগাযোগের মতো বাস্তব দ্বিপক্ষীয় ইস্যুকে আলোচনার কেন্দ্রে আনছে ঢাকা। এটি ৯ সেপ্টেম্বরের পর ঢাকার কূটনৈতিক তৎপরতার লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের পেছনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, গঙ্গা চুক্তির সময়সীমা, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং একই সঙ্গে চীন-ভারত ভারসাম্য রক্ষার কৌশল কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সবশেষ ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার পর ৯ সেপ্টেম্বর ভারতের পত্রিকা দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যত দ্রুত সম্ভব ভারত যেতে আগ্রহী। এতে বলা হয়, তারেক রহমান এমন সফর চান, যেখান থেকে দেশে ফিরে দেখানোর মতো বা দৃশ্যমান অর্জন থাকবে।
পরে ভারত সফরের আগ্রহের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, দুই দেশ সম্পর্ক ‘রিসেট’ করার দিকে এগোচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ‘ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ’ এবং ‘ওয়ার্ক ইন প্রোগ্রেস’ উল্লেখ করে তিনি জানান, সফর হবে তখনই, যখন সময়টি উপযুক্ত এবং দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সময় নির্ধারণ করতে পারবে।
কিন্তু কবে হতে পারে সম্ভাব্য এই সফর? দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আগামী নভেম্বরে হতে পারে তারেক রহমানের ভারত সফর।
আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের একটি সূত্রও আগামী নভেম্বরের শেষদিকে সফর হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কিছু জানানো হয়নি।
শেখ হাসিনা ইস্যুটি ফেলে না দিয়ে বরং অন্যান্য ইস্যুর মতোই কূটনৈতিকভাবে নিষ্পত্তির পথেই হাঁটতে চাইছে বলে ধারণা করছেন অনেক কূটনৈতিক বিশ্লেষক। সেই সাথে দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিষ্পত্তিতে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে ঢাকার উদ্যোগ সময়োপযোগী বলেও মনে করেন তারা।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। ফলে বছর শেষ হওয়ার আগে রাজনৈতিক পর্যায়ে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সমঝোতা তৈরি করা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর থেকে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন ছাড়াও তিস্তা নিয়ে অগ্রগতি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্য বাধা প্রত্যাহার, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনর্বহাল, রেল ও মানুষে-মানুষে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, জ্বালানি সহযোগিতা এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইবে ঢাকা।
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বাংলাদেশ এখন আগের মতো কেবল কানেকটিভিটি বা বাজার সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইছে না; বরং পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত ও জ্বালানিতে দৃশ্যমান ফল দেখতে চায়।
আর ভারত দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে চায় পারস্পরিকতা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দেশটির সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে এমন সম্পর্ক চায় যা হবে ‘মিউচ্যুয়ালিটি অব ইন্টারেস্ট অ্যান্ড রেসিপ্রোসিটি’-এর ভিত্তিতে। সোজা বাংলায়–দুই দেশের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। বাংলাদেশ প্রশ্নে এটি আগের ভারতীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বলে মনে করেন দেশটির কূটনীতিকরা।
ভারতের অন্যতম প্রধান স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের সফর থেকে ভারত এই নিরাপত্তার গ্যারান্টিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেল, নদী ও বন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহন ভারতের আগ্রহের জায়গা অনেক আগে থেকেই।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সম্ভাব্য ৩২টি সংযোগ সড়কের বড় অংশ বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ওপর নির্ভরশীল। সে কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের প্রশ্নে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কানেকটিভিটি চাইতে পারে দিল্লি। পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে ভারতের প্রবেশাধিকার এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চাইবে দিল্লি।
বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ আর বিচ্ছিন্নভাবে নিজেকে নিরাপদ আর স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবতে পারে না। তাই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যোগাযোগ, দেনদরবার, পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার এজেন্ডা এবং চাওয়া-পাওয়ার তালিকা তৈরিকে কূটনৈতিক সৌন্দর্য্য হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ সফরের আলোচনা আবার শুরু হওয়াকে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন। চরচাকে তিনি বলেন, “আমেরিকার সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে, চীনের সঙ্গে প্রকল্প আছে, আর ভারতের সঙ্গে আছে ৫০টি নদী ও ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত। কাউকেই বাদ দেওয়া যাবে না; (বাদ দিলে) তা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ভূরাজনৈতিক জট খোলার একমাত্র উপায় সবার সঙ্গে সংলাপের আগ্রহ দেখানো।”
এই বিশ্লেষক আরও বলেন, “দুই দেশের সম্পর্ক কঠিন হলে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।” তিনি চীন-ভারত সম্পর্কের উদাহরণ টেনে বলেন, “গুরুতর বিরোধ সত্ত্বেও ওই দুই দেশ ব্যাপক যোগাযোগ বজায় রাখে। এটাই কূটনীতির রীতি।”
আলতাফ পারভেজ বলেন, দুই দেশেরই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আছে। বাংলাদেশকে এখন ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার তাগিদ বোধ করার পেছনে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি ও পানিবণ্টন ইস্যু ভূমিকা রাখতে পারে।
হাসিনা ইস্যু থেকে সরে না গিয়ে বরং সেটিকে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডার একটি অংশ হিসেবে আলাদা করে দেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া দুই দেশের সম্পর্কের জন্যই ইতিবাচক বলে মনে করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ভূরাজনৈতিক অনেক ইস্যু নিয়ে আলোচনার সুযোগের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জট খুলতেও শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। অনেক জটিল সমস্যার সমাধান শীর্ষ বৈঠকের মধ্য দিয়ে সমাধানের অনেক নজির কূটনৈতিক দুনিয়ায় আছে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকেরা।