Advertisement Banner

পেন্টাগনে দ্বন্দ্ব: সেনাপ্রধানের অপসারণ যে সংকেত দিচ্ছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পেন্টাগনে দ্বন্দ্ব: সেনাপ্রধানের অপসারণ যে সংকেত দিচ্ছে
সাবেক মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জ। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জে. র‍্যান্ডি জর্জ-কে অপসারণ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি পেন্টাগনের ভেতরে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের মধ্যে সম্পর্ক কতটা তিক্ত হয়ে উঠেছিল।

জর্জ ২০২৩ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি বড় নিয়োগসংকট থেকে বের করে আনেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সস্তা ড্রোন ও আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহে জোর দেন। অর্থাৎ, তিনি যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্র বুঝে সেনাবাহিনীকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার এই রূপান্তরমুখী অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ নীতিগত মতভেদ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অসন্তোষ, নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে সংঘাত এবং সেনাবাহিনীর সেক্রেটারি ড্যানিয়েল পি ড্রিসকোল-এর সঙ্গে হেগসেথের জটিল সম্পর্ক। জর্জ ও ড্রিসকোলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গড়ে ওঠা এই টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে তোলে।

বিশেষ করে চারজন কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে দেওয়া নিয়ে বিরোধ পরিস্থিতিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। হেগসেথ যে চারজনকে ওয়ান-স্টার জেনারেল পদে উন্নীত করা থেকে বিরত রাখেন, তাদের মধ্যে দুইজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং দুইজন নারী ছিলেন– যা সেনাবাহিনীর ভেতরে বৈষম্যের প্রশ্ন তোলে। যদিও জর্জ ও ড্রিসকোল ওই কর্মকর্তাদের পেশাগত যোগ্যতার পক্ষে অবস্থান নেন। অথচ হেগসেথ তাদের সরানোর জন্য মাসের পর মাস চাপ দিয়ে আসছিলেন। এই ঘটনাটি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কাঠামোর ভেতরে রাজনীতি, পরিচয় ও ক্ষমতার জটিল মিশ্রণকে সামনে নিয়ে আসে।

পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় যখন জর্জ এই বিষয়ে সরাসরি আলোচনার জন্য বৈঠকের অনুরোধ করেন এবং হেগসেথ তা প্রত্যাখ্যান করেন। অর্থাৎ, দ্বন্দ্বটি শুধু মতবিরোধে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং যোগাযোগের ভাঙন ও আস্থাহীনতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। একই সময়ে ডানপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব লরা লুমের-এর সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ইঙ্গিত এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও উন্মোচিত করে।

আমেরিকার পতাকা। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার পতাকা। ছবি: রয়টার্স

জর্জের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে জে. ক্রিস্টোফার লানেভের নাম সামনে আসা এবং একই সঙ্গে জে. ডেভিড এম হুডনে ও মে. জে. উইলিয়াম গ্রিন জুনিয়ার-কে অপসারণের ঘটনা দেখায়, এটি একক কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে একটি বিস্তৃত পুনর্গঠনের অংশ। এর আগে জে. জেমস জে মিঙ্গাস-এর আগাম অবসরও একই ধারার ইঙ্গিত দেয়।

এই ধারাবাহিক পরিবর্তনের ফলে সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মনে করছেন, ইরাক ও আফগানিস্তানে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্বকে একের পর এক সরিয়ে দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন যুদ্ধের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জর্জের সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্পষ্টভাবে আধুনিকমুখী। তিনি ‘ট্রান্সফরমেশন ইন কনট্যাক্ট’ কর্মসূচির মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং নতুন কৌশলের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি ব্যয়বহুল ও পুরোনো ধাঁচের অস্ত্র প্রকল্প বাতিল করেন। যেমন এম-১০ বুকার ট্যাংক– যা আধুনিক যুদ্ধে সস্তা ড্রোনের কাছে সহজ টার্গেট হয়ে উঠতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি দ্রুতগতির, হালকা ও নমনীয় যুদ্ধক্ষমতার ওপর জোর দেন।

সব মিলিয়ে, এই অপসারণ একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়– যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কি পেশাদার সামরিক কৌশলের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, নাকি রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের প্রভাব ক্রমশ বাড়বে? জর্জের বিদায় সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব শুধু পেন্টাগনের ভেতরেই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ও বৈশ্বিক কৌশলেও প্রতিফলিত হতে পারে।

(নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে)

সম্পর্কিত