ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার দীর্ঘ ছয় মাস পর হঠাৎ করে ইরাকে অবস্থানরত ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর বিমান হামলা চালাল সৌদি আরব। আর এটা করেই নিজেদের সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলল তারা। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, চলতি সপ্তাহে তাদের জাতীয় তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার উপযুক্ত জবাব ও প্রতিশোধ হিসেবেই ইরাকের ভেতরে এই বিমান হামলা চালান হয়েছে। যদিও ইরাকের কোনো মিলিশিয়া গোষ্ঠী এই তেল স্থাপনায় হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবুও সৌদি নেতৃত্বের জন্য এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
সৌদি আরবের এই বিলম্বিত ও অনিচ্ছাকৃত উপস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন আমেরিকান প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের দুই সাংবাদিক। তারা বলছেন, এটি মূলত রিয়াদকে এমন এক জটিল দ্বিমুখী সংকটের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে সংঘাত বৃদ্ধি না করে কেবল আত্মরক্ষা ও প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত রাখাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত সংবাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সৌদি বিমান হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, এই হামলায় বেশ কয়েকজন নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছেন। পাশাপাশি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি সৌদি আরবের এই পদক্ষেপকে ‘একটি অগ্রহণযোগ্য আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যদিও এর জবাবে সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বাড়তি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে তাদের সরকারি বার্তাগুলোতে এই আক্রমণকে একটি সীমিত ও নির্দিষ্ট প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করার পূর্ণ চেষ্টা দেখা গেছে। তারা এটি স্পষ্ট করতে চেয়েছে যে, এই হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের চলমান কোনো বৃহৎ আকারের সর্বাত্মক যুদ্ধে যোগদানের অংশ নয়।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি নিজের বক্তব্যে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, সৌদি আরব কোনোভাবেই আঞ্চলিক পরিস্থিতির উত্তেজনা বাড়াতে বা যুদ্ধ বিস্তার করতে চায় না। তবে যেকোনো ধরণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা অবশ্যই কঠোর জবাব দেবে। আত্মরক্ষার মৌলিক অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, যারা বিশ্বাসীদের ওপর আক্রমণ করে, তাদের বিরুদ্ধে ঠিক একইভাবে পাল্টা আঘাত হানার নির্দেশনা রয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে সৌদি আরবের জন্য তৈরি হওয়া চরম কূটনৈতিক ও সামরিক– উভয় সংকটের কথা বলা হয়েছে। এই সংকট চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের পর থেকে রিয়াদকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সাথে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে সৌদি কর্তৃপক্ষ তেহরানের সাথে কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল।
রিয়াদের কাছে এই কৌশলগত আলোচনাই ছিল ইরান থেকে আসা সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি সামাল দেওয়ার সবচেয়ে ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত উপায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর রিয়াদের সব কূটনৈতিক প্রয়াস ও মধ্যস্থতা ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে সৌদি আরবের ওপর।
এর পাশাপাশি একই মাসে সৌদি আরবকে লোহিত সাগরে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়াদের সাথে পুনরায় নতুন করে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখা যায়। হুথিরা সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে বেশ কয়েকটি সফল হামলার দাবি করে এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী সৌদি তেল ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর সরাসরি নৌ অবরোধের ঘোষণা দেয়। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান
‘গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম’-এর সিনিয়র নন-রেসিডেন্ট ফেলো আব্দুল আজিজ আলঘাশিয়ান দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন যে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হয়তো ইরানের সাময়িক দুর্বলতার মধ্যে নিজেদের কিছু কৌশলগত সুবিধা দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই যুদ্ধ তার স্বপ্নপূরণের ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। সৌদি আরবকে একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করার যে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে তা বর্তমানে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এই সংঘাত সৌদি আরবের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিয়াদের সরকারি বাজেটের মূল চালিকাশক্তি হলো তেল রপ্তানি। কিন্তু যুদ্ধের কারণে তেল পরিবহনের আন্তর্জাতিক জলপথগুলো রুদ্ধ ও বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় রাজস্ব আদায়ে ধস নামছে। তদুপরি, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সাথে সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্কেও ততই টানাপোড়েন সৃষ্টি হচ্ছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিধানের পদ্ধতি এবং নীতিগত অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যদিও যুদ্ধের শুরুর দিকে সৌদি আরব গোপনে ইরানের বিরুদ্ধে কিছু সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। তবে ইরাকে মার্কিন-সৌদি এই যৌথ বিমান হামলা ছিল রিয়াদের তরফ থেকে প্রকাশ্যে যুদ্ধে নিজেদের অংশগ্রহণ স্বীকার করার প্রথম ঘটনা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের এই অনীহা ও সংঘাত এড়ানোর মানসিকতাকে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীগুলো নিজেদের দুর্বলতা ও নীরব সম্মতি হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করছিল। সেই ভুল ধারণা ভাঙতেই রিয়াদ এবার প্রকাশ্যে সরাসরি সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর মিডল ইস্ট পলিসি বিষয়ক সিনিয়র ফেলো হাসান আলহাসানের পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস উল্লেখ করেছে, এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে সৌদি আরব ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর কোনো বিমান হামলার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করল।
সৌদি বিমান বাহিনীর প্রাক্তন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফয়সাল আল-হামাদ এটিকে সৌদি আরবের জন্য একটি ‘স্পষ্ট রেড লাইন’ বলে অভিহিত করেছেন। যাতে ভবিষ্যতে তাদের অর্থনৈতিক স্থাপনায় আঘাত হানার আগে শত্রুপক্ষ দ্বিতীয়বার ভাবে। সবমিলিয়ে, এই প্রতিবেদনটি পরিষ্কার করে যে, সৌদি আরব যুদ্ধের ব্যাপকতা কমানোর পথ খুঁজলেও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা এবং ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সংঘাত তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।