টেসলা, বোরিং কোম্পানি থেকে স্পেসএক্স–এমন সব চোখ ধাঁধানো ও ‘মাথা ঘুরিয়ে’ দেওয়ার মতো ব্যবসা যার ঝুলিতে রয়েছে, সেই ইলন মাস্ককে বর্তমান সময়ের অন্যতম দূরদর্শী ও চতুর ব্যবসায়ী বললে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলা হবে না। সবশেষ তার ঝুলিতে যোগ হয়েছে ‘এক্স মানি’ নামের নতুন আর্থিক সেবা ব্যবস্থা।
কয়েক মাস ধরে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারকারীর মধ্যে পরীক্ষামূলক ধাপে রাখার পর, গত মঙ্গলবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইলন মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এর ‘প্রিমিয়াম’ ও ‘প্রিমিয়াম প্লাস’ গ্রাহকদের জন্য এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। চীনের ‘উইচ্যাট’-এর মতো এক্সকেও একটি ‘এভরিথিং অ্যাপ’ হিসেবে গড়ে তোলার যে সার্বিক পরিকল্পনা তার রয়েছে, এটি মূলত তারই একটি অংশ।
কেউ কেউ বলছে, ইলন মাস্ক তার বিপুল সম্পদে আরও কিছু ডলার যোগ করতে এবং বিশ্বের শীর্ষ ধনী হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করতে এক্স মানি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
এক্স মানি কীভাবে কাজ করে
এক্সের তথ্যমতে, এক্স মানি ব্যবহারকারীদের একটি ডিজিটাল ভিসা ডেবিট কার্ড দেওয়া হবে, যা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাপল পে-তে যুক্ত করা যাবে। পরে তাদের একটি ফিজিক্যাল ভিসা ডেবিট কার্ডও দেওয়া হবে। কার্ডটির মাধ্যমে বিদেশে লেনদেনের সময় অতিরিক্ত ফি দিতে হবে না। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এটিএম থেকে বিনা খরচে নগদ অর্থ তোলার সুবিধাও থাকবে। ফলে এক্সের মাধ্যমে বাড়তি অর্থ খরচ না করেই তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ আদান-প্রদান করা যাবে।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করতে এক্স মানি নিয়ে মাঠে নেমেছেন ইলন মাস্ক। ছবি: রয়টার্স
এক্সের প্রিমিয়াম প্লাস ব্যবহারকারীরা জমা রাখা অর্থের ওপর বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে মুনাফা (এপিওয়াই) পাবেন। এ ছাড়া নির্দিষ্ট কিছু কেনাকাটায় সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক পাবেন তারা। ডাইরেক্ট ডিপোজিটের সুবিধা চালু থাকলে নির্ধারিত সময়ের কয়েক দিন আগেই নতুন করে জমা হওয়া অর্থ ব্যবহার করা যাবে।
আকর্ষণীয় ফিচার ও মূল সুবিধাসমূহ
৬ শতাংশ মুনাফা: প্রচলিত সাধারণ ব্যাংকগুলো যেখানে ১ শতাংশেরও কম সুদ দেয়, সেখানে এক্স মানিতে রাখা জমার ওপর মিলবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি মুনাফা।
ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট ও ‘স্মার্ট ক্যাশট্যাগ’: কোনো বাড়তি ফি বা লিমিট ছাড়াই এক্স অ্যাপের যেকোনো ব্যবহারকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাঠানো বা গ্রহণ করা যাবে। এমনকি টাইমলাইন থেকেই সরাসরি শেয়ারবাজারের স্টক ও ক্রিপ্টো ট্রেড করার সুবিধাও রয়েছে।
আনলিমিটেড ৩ শতাংশ ক্যাশব্যাক: ভিসা সাপোর্ট করে এমন যেকোনো জায়গায় ‘এক্স কার্ড’ দিয়ে কেনাকাটা করলেই পাওয়া যাবে ৩ শতাংশ ক্যাশব্যাক।
অ্যাডভান্সড পে-চেক: সরাসরি ডিপোজিট চালু থাকলে সাধারণ পে-ডের চেয়ে অন্তত ২ দিন আগেই বেতনের টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে।
ফ্রি এটিএম সুবিধা: নির্দিষ্ট এটিএম নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ ফ্রিতে টাকা তোলা যাবে। এমনকি বাইরের এটিএম বুথ ব্যবহারে কোনো ফি কাটলে তাও রিফান্ড বা ফেরত দেওয়া হবে।
ডেবিট কার্ড: কেনাকাটায় ব্যবহার করতে পারবেন ভার্চুয়াল কিংবা ফিজিক্যাল ডেবিট কার্ড। সাথে থাকছে ভিসার জিরো লায়াবিলিটি পলিসি–যা যেকোনো অননুমোদিত লেনদেনের ক্ষেত্রে আপনাকে সব ধরনের দায়ভার থেকে মুক্ত রাখবে।
সুদৃঢ় নিরাপত্তা: পাসকি (Passkeys) এবং উন্নতমানের প্রাইভেসি কন্ট্রোলের সাহায্যে আপনার অ্যাকাউন্টকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা যাবে।
এ ধরনের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধার কারণে এক্স মানি ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে সমালোচকদের দাবি, এই বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলো এক্স মানির পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। এক্স মানি ধাপে ধাপে তাদের সেবা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ঠিক কবে এবং কোথায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
কারা ব্যবহার করতে পারবে এক্স মানি
আপাতত ১৮ বছরের বেশি বয়সের যেকোনো মার্কিন নাগরিক এক্স মানি ব্যবহার করতে পারবেন। তবে তাদের অবশ্যই ‘এক্স প্রিমিয়াম’ বা ‘প্রিমিয়াম প্লাস’-এর গ্রাহক হওয়া লাগবে। প্রিমিয়াম প্লাসের গ্রাহকরাই সরাসরি ৬ শতাংশ হারে সুদের সুবিধা পাবেন।
অন্যদিকে, সাধারণ ‘এক্স প্রিমিয়াম’ ব্যবহারকারীদের এই সুবিধা পেতে কিছু অতিরিক্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। যেমন– ডাইরেক্ট ডিপোজিটের মাধ্যমে অন্তত ১ হাজার ডলার গ্রহণ করা।
এক্স মানি দিয়ে যেভাবে লোকসান গুনছেন ইলন মাস্ক
ফেডারেল রিজার্ভের বর্তমান বেঞ্চমার্ক সুদহার যেখানে ৩.৫ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে মাস্কের এই ৬ শতাংশ সুদের প্রস্তাবের সহজ অর্থ হলো–প্ল্যাটফর্মে টানতে তিনি নিজের পকেট থেকে গ্রাহকদের টাকা দিচ্ছেন। তবে সাধারণ গ্রাহকদের এসব নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই!
যদি কোনো সাধারণ ব্যাংকে ১০০ ডলার রাখেন, তবে ব্যাংক সেই টাকা নিরাপদ কোনো মাধ্যমে অন্য কাউকে ঋণ হিসেবে দিয়ে ৪ ডলার লাভ করে। এর মধ্যে ৩ ডলার ৯০ সেন্ট তারা নিজেরা রাখে। আর তাদের ব্যাংকে টাকা রাখার জন্য ‘ধন্যবাদ বার্তা’ হিসেবে দেয় মাত্র ১০ সেন্ট।
কিন্তু এক্স মানির ক্ষেত্রে মাস্ক যেন বলছেন–“আপনার ১০০ ডলার অন্য কোথাও না রেখে আমার অ্যাপে রাখুন! আমি আপনাকে প্রতি বছর ৬ ডলার দেব!” অথচ ওই ১০০ ডলার দিয়ে মাস্ক নিরাপদে আয় করতে পারবেন সর্বোচ্চ প্রায় ৩ ডলার ৫০ সেন্ট। কিন্তু যেহেতু তিনি ৬ ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাই অ্যাপে রাখা প্রতি ১০০ ডলারের জন্য তাকে ও তার প্রতিষ্ঠানকে নিজের পকেট থেকে প্রায় ২ ডলার ৫০ সেন্ট করে লোকসান দিতে হবে।
তদারকি সংস্থাগুলো কেন জনগণকে সতর্ক করছে
যদিও ৬ শতাংশ লভ্যাংশ শুনলেই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো মনে হয়, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক তদারকি সংস্থা ও রাজনীতিবিদরা ইতিমধ্যে ব্যবহারকারীদের তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় সরানোর আগে ছোট ছোট শর্তাবলী খুব ভালো করে পড়ে নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।
ইউনিল্যাড টেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “এক্স পরিচালনায় মাস্কের অতীত ইতিহাস গ্রাহকদের সুরক্ষা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তোলে।” সেই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট মডারেশনের সাথে ব্যাংকিং সেবাকে এক করে ফেলা ব্যবহারকারীদের অর্থকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো জালিয়াতি প্রতিরোধ হেল্পলাইন কিংবা সরাসরি কোনো ফিজিক্যাল শাখা নেই এক্স মানির। এটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত স্বয়ংক্রিয় মডারেশনের ওপরই অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল। এর মানে হলো, ভুলবশত একটি অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারী তাৎক্ষণিকভাবে তার নিজের টাকা থেকেই পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
আপাতত, শুরুর দিকের ব্যবহারকারীরা ফিনটেক (আর্থিক প্রযুক্তি) ইতিহাসের সম্ভবত সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই মার্কেটিং স্টান্টের সুফল লুফে নিতে পারছেন