উপ-রেজিস্ট্রারের দাড়ি ধরে টানাটানি, ছয়জন ডিনকে জোর করে পদত্যাগপত্র লেখানো, বেলচা হাতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢোকার চেষ্টা, পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীকে মারধর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনবরত হুমকি-ধমকি—এসবই করছেন এক ছাত্রনেতা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জেরবার হলেও রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
কার কথা বলা হচ্ছে? কার নাম মনে আসছে? ঠিক ধরেছেন, তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি দিয়েই শুরু করা যাক।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে বেলচা নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকতে চাইছেন সালাউদ্দিন আম্মার। সহযোগীরা তাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন। এ সময় আনাস নামের এক শিক্ষার্থীকে উদ্দেশ করে আম্মারকে বলতে শোনা যায়, “তোরে একবারে পুঁইতা ফেলাব কিন্তু, একবারে পুঁতে ফেলব।” আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, পাঠকক্ষের ভেতরে একটি বড় লাঠি দিয়ে এক শিক্ষার্থীকে পেটাচ্ছেন আম্মার।
বেলচা হাতে গ্রন্থাগারে ঢোকার চেষ্টা সালাউদ্দিন আম্মারের। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
ঘটনাটি ঘটে গত সোমবার (২৭ জুলাই)। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধের জেরে প্রক্টর দপ্তরে একটি মীমাংসা বৈঠক চলছিল। উত্তেজনার একপর্যায়ে তিন শিক্ষার্থী গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন। সেখানে ঢুকে তাদের ‘ছাত্রলীগ’ ট্যাগ দিয়ে প্রক্টরের সামনেই মারধর করেন রাকসু ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা। পরে আহত এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্স থেকে টেনে নামিয়েও মারধর করা হয়।
এমন কর্মকাণ্ডকে ‘মব সন্ত্রাস’ অ্যাখ্যা দিয়ে ঘটনার তদন্ত সাপেক্ষে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো। তবে আম্মারের স্পষ্ট জবাব, “আমরা মার খাইনি, মার দিয়েছি। প্রশাসনের ওপর ভরসা রেখে লাভ নেই।”
সালাউদ্দিন আম্মারের একের পর এক এমন বিতর্কিত ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ ছড়িছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। উপাচার্য থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী—সবার কাছে এখন এক ‘আতঙ্কের’ নাম সালাউদ্দিন আম্মার।
আম্মারের বিতর্কের খতিয়ান
আম্মারের উগ্র আচরণ কিংবা আইন হাতে তুলে নেওয়া এবারই প্রথম নয়; এর আগেও তিনি একাধিক বিতর্কিত ঘটনা ঘটিয়েছেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে ছয়জন ডিনকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র লেখান এবং নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ডিন অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ ছাড়া উপাচার্যের কাছে ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ শিক্ষকদের তালিকা দিয়ে তাদের ধরে থানায় সোপর্দ করার হুমকিও দেন।
তার বিরুদ্ধে উপ-উপাচার্য মাঈন উদ্দীনকে লাঞ্ছিত করা এবং একজন উপ-রেজিস্ট্রারের দাড়ি ধরে টানাটানির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি অন্য একটি হলের ছাত্র সংসদের জিএসকে কলার ধরে হেনস্তা করার অভিযোগও আছে।
গত ডিসেম্বরে এক ঘটনার পর তৎকালীন উপ-উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন খান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আম্মারের উগ্র আচরণে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার বিব্রত ও ভীত।”
গত বছরের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর আসার পর ফেসবুকে আম্মার দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দেন। ১৮ ডিসেম্বর রাতে দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, উদীচী ও ছায়ানট ভবনে নজিরবিহীন হামলা হয়। সর্বশেষ ঘটনাতেও তার একই অবস্থান দেখা গেছে।
রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও তিনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে টাঙানো একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে সেই ভিডিও ফেসবুকে প্রচার করেন আম্মার। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষকরা উপাচার্যের কাছে তার মানসিক চিকিৎসার দাবি পর্যন্ত তুলেছিলেন।
চলতি ২ মার্চ রাকসু ভবনে ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতা মেহেদী মারুফের সঙ্গে আম্মারের বাগবিতণ্ডা হয়। সে সময় ফেসবুকে আম্মারের একটি মন্তব্য ছিল—“চুলকানি শুরু? মলমের নাম নুরু”। এই পোস্টকে কেন্দ্র করেই তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।
ডাকসুর এক নেত্রী পাকিস্তানি এক নারীর সঙ্গে তোলা ছবি নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন। সেই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার লেখেন, “নিয়ে আসেন আমার জন্য।” একজন নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধি হয়ে নারীদের নিয়ে এমন মন্তব্য করায় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
আবার ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠান তিনি, যাকে চাঁদা দাবি হিসেবে দেখা হয়। পরে সেটির আর্থিক হিসাব প্রকাশ করার কথা বললেও তিনি তা দেননি।
আম্মারের উত্থান
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ছাত্রশিবির পরিচালিত তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন আম্মার। তার পরিবারের সদস্যরাও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। শিবিরবান্ধব পরিবেশে বেড়ে উঠলেও সাংগঠনিকভাবে পদে ছিলেন না বলে নিজেকে আধিপত্যবাদবিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থী বলেই দাবি করেন আম্মার।
সালাউদ্দিন আম্মার। ছবি: বাসস
খুলনার প্রত্যন্ত জনপদ কয়রা থেকে আসা এই ছাত্রনেতা ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এলাকাভিত্তিক কোটায় ভর্তি হন রাবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে। সেই আম্মারই ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছাত্রনেতা হয়ে ওঠেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘ওয়ানম্যান আর্মি’ তকমা পাওয়া সালাহউদ্দিন আম্মার একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে রাকসু তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্য ফৌজদারি অপরাধে জড়ানোর পরও আম্মারের বিরুদ্ধে কেন নীরব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—সেই প্রশ্নও উঠছে জনমনে।
সালাহউদ্দিন আম্মারের কথাবার্তা, আচরণ এবং মারমুখী ভঙ্গি দেখে অনেকেই তার ভেতরে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের ছায়া দেখছেন। অভ্যুত্থানের পর যখন সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, বেপরোয়া ভঙ্গি এবং ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব বহাল থাকে, তখন জনমনে এই প্রশ্ন উঠছে—ছাত্রলীগ বিদায় করে যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এল, তারা কি ছাত্রলীগের সেই ‘বেপরোয়া লিগ্যাসি’ বহন করছে?
এ বিষয়ে রাকসুর সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আম্মার দ্বারা যা সংঘটিত হচ্ছে, তা রাকসুর ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমার লজ্জা লাগছে, এই রাকসুর আমরা ভিপি-জিএস ছিলাম!” এসব ঘটনার বিচার দাবি করে তিনি আরও বলেন, “দ্রুত এই ব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত হবে এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো।”