কোনো ‘রাখঢাক’ ছাড়া যার সামনে নিজের সব ভয়, সংশয়, অসহায়ত্ব, কষ্ট, আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়, বিপদে যে সবসময় পাশে এসে দাঁড়ায়, যাকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়— সে-ই তো বন্ধু!
বন্ধুত্বের সম্পর্কে রক্তের হিসাব-নিকাশ থাকে না, শর্ত থাকে না। তবুও বন্ধু থেকে যায়। এমন সম্পর্ক কখনো আলাদাভাবে ঘটা করে উদযাপন না করলেও চলে। তবুও পৃথিবীতে আছে ‘বন্ধু দিবস’। তা-ও একটি নয়, দুইটি! এই নিয়ে আমাদের মধ্যে দ্বিধার শেষ নেই। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতেই পারে— মা দিবস, বাবা দিবস, ভালোবাসা দিবস একটি হলেও, বন্ধু দিবস কেন দুইটি?
৩০ জুলাই ও আগস্টের প্রথম রোববার সাধারণত বন্ধু দিবস উদযাপিত হয়। একটি তারিখের পেছনে রয়েছে বিশ্বশান্তির এক বৈশ্বিক উদ্যোগ, আর অন্যটি গড়ে উঠেছে সাপ্তাহিক ছুটির দিনের একটি জনপ্রিয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে।
৩০ জুলাই
৩০ জুলাইয়ের উদযাপনের সূচনা ঘটেছিল ১৯৫৮ সালে। সে সময় প্যারাগুয়ের চিকিৎসক রামোন আরতেমিও ব্রাচো বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে সীমান্ত ছাড়িয়ে বন্ধুত্ব ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ২০ জুলাই বিশ্বব্যাপী বন্ধু দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। একই বছর রামোনের ডাকে সাড়া দিয়ে পুয়ের্তো পিনাসকো এবং প্যারাগুয়ের অন্যান্য স্থানে ‘বন্ধুত্ব সপ্তাহ’ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরের বছর তারা একইভাবে পুরো সপ্তাহজুড়ে উদযাপন শেষে ৩০ জুলাইকে ‘বন্ধু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে।
সেখান থেকেই বন্ধুত্বের উদযাপনের পরিধি বাড়তে থাকে এবং তা প্রথমে গোটা আমেরিকা অঞ্চলে, পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের দক্ষিণ আমেরিকাসহ, এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকার অনেক দেশ বন্ধু দিবস উদযাপনের প্রস্তাব দেয়। সেই ঐতিহাসিক প্রস্তাবে বলা হয়— বিশ্বজুড়ে মানবজীবনে বন্ধুত্ব এক মহৎ ও মূল্যবান অনুভূতি, যা বিভিন্ন সংস্কৃতি, দেশ ও মানুষের মধ্যে শান্তির সেতুবন্ধ তৈরি করে। সভ্যতার সংলাপ, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সংহতিকে জোরদার করতে বন্ধুত্বের বিকল্প নেই। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে এ ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
শান্তির সংস্কৃতি প্রচার ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানানোর এই তাগিদ থেকেই বিশ্বব্যাপী বন্ধুত্বের অসামান্য অবদানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই ধারাবাহিকতায়, বিশ্বের সকল দেশ ও সংস্থাকে নিজ নিজ সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে শিক্ষা ও জনসচেতনতামূলক আয়োজনের মাধ্যমে উদযাপনের আহ্বান জানিয়ে ৩০ জুলাইকে ‘আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অবশেষে জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র ও সহযোগীদের কাছে এই সিদ্ধান্তের বার্তা পৌঁছে দিয়ে বিশ্বজুড়ে সৌহার্দ্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান তৎকালীন মহাসচিব বান কি মুন।
আগস্টের প্রথম রোববার
কিন্তু আগস্টের প্রথম রোববার যে বন্ধু দিবস সেটা এল কী করে? মজার ব্যাপার হচ্ছে, বন্ধু দিবস দুই বন্ধুর অমর কোনো কাহিনী নয়। সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই এর প্রচলন শুরু হয়েছিল। ১৯৩০ সালে এই কাজটি করেছিলেন বিশ্বখ্যাত উপহার সামগ্রী ও কার্ড বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান হলমার্কের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জয়েস হল। তিনি প্রতিবছর ২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে বন্ধুত্ব দিবস উদযাপনের বিষয়টি সামনে আনেন। এদিন কার্ড আদান-প্রদানের মাধ্যমে বন্ধু দিবস পালন করার চল শুরু হয়।
অবশ্য তার জয়েস হলের প্রচেষ্টা অতটা সফল হয়নি। ১৯৪০ সাল নাগাদ মানুষ বুঝতে পারে, এটা কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নয়, বরং হলমার্কের কার্ড ব্যবসা বাড়ানোর ফন্দি। এরপর থেকে বন্ধু দিবস উদযাপন একরকম বন্ধই হয়ে যায়।
হলমার্কের উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রে সুবিধা করতে না পারলেও ইউরোপ-এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বন্ধু দিবস উদযাপনের রেওয়াজ। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ছুটির দিনে বন্ধুদের একত্রিত হওয়া এবং উপহার আদান-প্রদানের এক সুবিধাজনক সময় হিসেবে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে ও স্থায়ী রূপ নেয়।
এই আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সূচনার বাইরেও বন্ধু দিবসের মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্যে। এটি খুব সহজেই ব্যক্তিগত আন্তরিকতার সাথে বিশ্বশান্তির বৃহত্তর লক্ষ্যকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। আগস্টের প্রথম রোববারের উদযাপনটির মধ্য দিয়ে মানুষ পুরনো সখ্য ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়, হাতে ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড বাঁধে, আর নিজের পছন্দের পরিবার সমতুল্য বন্ধুদের প্রতি হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
৩০ জুলাই জাতিসংঘ কর্তৃক প্রবর্তিত বন্ধু দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বন্ধুত্ব কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; বরং এটি কূটনীতি, সহানুভূতি এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার মাধ্যমও হতে পারে। পাড়ার খেলার মাঠ, করপোরেট অফিস কিংবা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে গড়ে ওঠা এসব বন্ধুত্ব সকল ধরনের পক্ষপাত দূর করতে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের ওয়েবসাইট, ব্রিটিশ কাউন্সিল, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস