‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি বহুদিন ধরেই আমাদের পরিচয়ের অংশ। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের একজন মানুষের মাসিক খাদ্যতালিকায় কী কী থাকছে?
আর সেই খাবার কি শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট? বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিইউএফপি) বাংলাদেশ মার্কেট মনিটর, জুন ২০২৬ প্রতিবেদনে এই প্রশ্নগুলোরই একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে।
একজন মানুষের মাসিক খাদ্যতালিকায় কী থাকার কথা?
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করতে এমন একটি খাদ্য তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দৈনিক ২ হাজার ১০০ কিলোক্যালরি শক্তি নিশ্চিত করার জন্য তৈরি।
এতে কেবল ক্যালরি নয়, প্রোটিন ও ফ্যাটেরও সুষম বণ্টন রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন মানুষের মাসে প্রয়োজন—
- মোটা চাল ৭ দশমিক ৮ কেজি এবং গম ৯০০ গ্রাম
- মাছ, মাংস বা পোল্ট্রি ৩ কেজি
- ডিম ৩০টি
- ডাল দেড় কেজি
- দুধ সাড়ে ৪ কেজি
- শাক সাড়ে ৪ কেজি
- অন্যান্য সবজি ৯ কেজি
- ফল ৩০টি
- আলু ৯০০ গ্রাম
- ভোজ্য তেল ৮১০ গ্রাম
- চিনি ৭৫০ গ্রাম
- মসলা ৬০০ গ্রাম
এই খাবার কি সবার নাগালের মধ্যে?
ডব্লিউএফপির হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন মাসে এই খাদ্যতালিকার জন্য একজন মানুষের গড়ে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮৬৮ টাকা।
মে মাসের তুলনায় এই ব্যয় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমলেও অনেক মানুষের জন্য এটি এখনো নাগালের বাইরে।
কেন?
২০২২ সালের হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে অনুযায়ী, দেশের জাতীয় খাদ্য দারিদ্র্যসীমা মাসে ১ হাজার ৮৫১ টাকা।
অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে যে ২ হাজার ৮৬৮ টাকা লাগে, তা খাদ্য দারিদ্র্যসীমার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দারিদ্র্যসীমার আশপাশে থাকা মানুষের পক্ষে এই খাদ্যতালিকা মেনে চলা কঠিন।
প্রতিবেদনটি আরও দেখায়, একজন কৃষকের দৈনিক গড় মজুরি ৬২৫ টাকা। এই অর্থ দিয়ে তিনি প্রায় ১২ কেজি চাল কিনতে পারেন।
অন্যদিকে, একজন পোশাক শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ৪৮০ টাকা, যা দিয়ে কেনা যায় মাত্র ৯ দশমিক ৭ কেজি চাল। এই পার্থক্যই তাদের খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির চিত্র তুলে ধরে।
কক্সবাজার ও ভাসানচর
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে শুধু বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্যতালিকাই নয়, কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের খাদ্যতালিকাও তুলে ধরা হয়েছে।
‘শরণার্থীদের’ জন্য ব্যবহৃত হয় একটি শক্তি-সমৃদ্ধ (এনার্জি-সাফিশিয়েন্ট) খাদ্যতালিকা, যা জাতীয় খাদ্যতালিকার থেকে আলাদা।
এই খাদ্যতালিকায় একজন মানুষের জন্য প্রতি মাসে রাখা হয়-
১২ দশমিক ৩ কেজি ফর্টিফাইড চাল, ১ কেজি ডাল, ১ দশমিক ১ কেজি সয়াবিন তেল ও ১৫টি ডিম
অর্থাৎ, জাতীয় খাদ্যতালিকার তুলনায় এখানে চালের পরিমাণ বেশি, তবে খাদ্য উপাদানের বিন্যাস আলাদা।
২০২৬ সালের জুনে এই খাবারের জন্য ব্যয় ছিল কক্সবাজারে ১ হাজার ৩৮৯ টাকা এবং ভাসানচরে ১ হাজার ৪৭৯ টাকা।
ভাসানচরে ব্যয় বেশি হওয়ার কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে খাদ্যপণ্য পৌঁছাতে চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ অতিক্রম করতে হয়। বর্ষাকালে উত্তাল সমুদ্রের কারণে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হলে এই ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
বাস্তব চিত্র কী?
ডব্লিউএফপির বাংলাদেশ মার্কেট মনিটরে দেখানো এই খাদ্যতালিকা একজন মানুষের প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য তৈরি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা অনুসরণ করতে যে অর্থ প্রয়োজন, তা এখনো দেশের খাদ্য দারিদ্র্যসীমার অনেক ওপরে।
তাই মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও চাল ও আলুর মতো মৌলিক খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে অনেক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।