Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
Advertisement
Advertisement
> বিশ্লেষণ

আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নতুন লড়াই

চরচা ডেস্ক

চরচা ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫: ১৮
আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নতুন লড়াই
আর্কটিক এখন এমন এক মঞ্চ, যেখানে একই সঙ্গে সামরিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সার্বভৌমত্বের হিসাব কষছে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো। ছবি: রয়টার্স

বরফের রাজনীতি এখন আর শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প নয়। পৃথিবীর উত্তর প্রান্তের যে অঞ্চলকে এত দিন ভৌগোলিক দুর্গমতা, তীব্র শীত আর বরফের আবরণে আচ্ছাদিত এক দূরবর্তী ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয়েছে, সেটিই ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে। বরফ গলছে, নতুন সমুদ্রপথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামরিক ঘাঁটি, রাডার, স্যাটেলাইট, আইসব্রেকার, বন্দর ও নজরদারি অবকাঠামোর প্রয়োজন। ফলে আর্কটিক এখন এমন এক মঞ্চ, যেখানে একই সঙ্গে সামরিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জ্বালানি, বাণিজ্য ও সার্বভৌমত্বের হিসাব কষছে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—আর্কটিকের প্রতিযোগিতা কেবল যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়া বা পশ্চিম বনাম চীন—এমন সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। বরং একই পশ্চিমা জোটের ভেতরেও স্বার্থের নতুন সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরটিতে ২৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ এই বাস্তবতার দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। লেখায় যুক্তি দেওয়া হয়েছে, আর্কটিককে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটোর মিত্র হলেও অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ, গ্রিনল্যান্ড, বাণিজ্যপথ ও প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।

এখানে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। ‘আগামী যুদ্ধ এখানে হবে’ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ‘শত্রু’ হয়ে উঠবে—এগুলো ওই বিশ্লেষণের রাজনৈতিক ও বিশ্লেষণাত্মক ফ্রেম, প্রতিষ্ঠিত কোনো সামরিক বাস্তবতার ঘোষণা নয়। ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে ভূ-অর্থনৈতিক চাপ, সম্পদ ও বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ, সামরিক অবকাঠামো এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement
চীনের নতুন আর্কটিক রুট কি মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথের বিকল্প হবে?Artic route

পরিবেশের আর্কটিক থেকে নিরাপত্তার আর্কটিক

আর্কটিক নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনটি এই নতুন বাস্তবতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের আর্কটিক নীতি ছিল পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকেন্দ্রিক। ২০০৮ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে আর্কটিককে তার কৌশলগত স্বার্থের অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালে গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক কৌশল গ্রহণ করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই নীতির চরিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

আর্কটিকের প্রতিযোগিতা কেবল যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়া বা পশ্চিম বনাম চীন—এমন সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। বরং একই পশ্চিমা জোটের ভেতরেও স্বার্থের নতুন সংঘাত তৈরি হচ্ছে।  ছবি: রয়টার্স
আর্কটিকের প্রতিযোগিতা কেবল যুক্তরাষ্ট্র বনাম রাশিয়া বা পশ্চিম বনাম চীন—এমন সরল দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। বরং একই পশ্চিমা জোটের ভেতরেও স্বার্থের নতুন সংঘাত তৈরি হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আর্কটিক সামিট সেই পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ১২টি দেশ ও জোটের নেতৃত্ব এতে অংশ নেয়। সেখানে আর্কটিককে ‘ভূরাজনৈতিক হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সামরিক চলাচল, স্যাটেলাইট নজরদারি, উত্তরাঞ্চলের আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়। রাশিয়ার কথিত শ্যাডো ফ্লিটের চলাচল ঠেকানোর ক্ষেত্রেও সমন্বিত পদক্ষেপের কথা উঠে আসে। এসব সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ইউরোপের আর্কটিক নীতি পরিবেশকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে হার্ড পাওয়ারের দিকে সরে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের তাৎপর্য কম নয়। কারণ আর্কটিকে শক্তির প্রতিযোগিতা মানে কেবল যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন নয়। এখানে প্রয়োজন বরফ ভেঙে চলতে সক্ষম জাহাজ, দীর্ঘপথের বিমানঘাঁটি, রাডার, স্যাটেলাইট, গভীর সমুদ্রবন্দর, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কঠিন পরিবেশে পরিচালনাযোগ্য সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো। অর্থাৎ আর্কটিকের শক্তির সংজ্ঞাই অন্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে আলাদা।

এশিয়ার দেশগুলোর নজর কেন আর্কটিকের সমুদ্রপথের দিকে?arctic.asia

ইউরোপের বড় সীমাবদ্ধতা কোথায়

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমস্যা হলো, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও আর্কটিকে তার সরাসরি ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি সীমিত। ব্রেক্সিটের পর ইইউর নিজস্ব কোনো সার্বভৌম আর্কটিক মহাসাগরীয় সীমান্ত নেই। নরওয়ে ও আইসল্যান্ড ইউরোপের অংশ হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড, কিন্তু ইইউর অংশ নয়। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন আর্কটিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের ভূগোল সরাসরি আর্কটিক মহাসাগরের উপকূল দেয় না। তার ওপর ইইউর নিজস্ব কোনো সমন্বিত ভারী আইসব্রেকার বহর নেই।

এই সীমাবদ্ধতা থেকেই ইউরোপের কৌশলের একটি মৌলিক বৈপরীত্য তৈরি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বৈশ্বিক রাজনীতিতে অর্থনীতি, বাজার, আইন, নীতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।

কিন্তু আর্কটিক সেই শক্তির জন্য কঠিন পরীক্ষা। কারণ এখানে আইন ও নীতির পাশাপাশি দরকার বাস্তব উপস্থিতি। বরফের ওপর কাগুজে নীতিমালা দিয়ে জাহাজ চালানো যায় না, প্রয়োজন আইসব্রেকার। পরিবেশগত মানদণ্ড ঘোষণা করলেই মেরু অঞ্চলে নজরদারি করা যায় না, প্রয়োজন স্যাটেলাইট ও রাডার। রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা থাকলেই সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, প্রয়োজন বন্দর ও নৌক্ষমতা।

এই কারণেই কানাডার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক নতুন তাৎপর্য পাচ্ছে।

কানাডাকে ঘিরে ব্রাসেলসের নতুন হিসাব

ল্যাপল্যান্ড সামিটের পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইয়েন কানাডাকে বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত প্রেক্ষাপটে ইইউর অ্যাসোসিয়েট মেম্বার হওয়ার প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাব আর্কটিককে আরও বেশি রাজনৈতিক করে তুলেছে।

কানাডার ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর্কটিকের একটি বিশাল অংশ কানাডার ভূখণ্ড ও জলসীমার সঙ্গে যুক্ত। ফলে ইউরোপের পক্ষে সরাসরি মেরু অঞ্চলে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা আংশিকভাবে কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে মোকাবিলা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আর্কটিক রাজনীতি ও দক্ষিণ আমেরিকা কোথায় মিলে যায়?venezuyela_trump-attack

আরটির বিশ্লেষণে এই উদ্যোগকে ইউরোপের পুরোনো কৌশলের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হয়েছে—অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অন্য দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করা এবং সেই অংশীদারিত্বকে বৃহত্তর কৌশলগত উপস্থিতিতে রূপ দেওয়া। বলা হয়েছে, কানাডার সম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে ইউরোপ আর্কটিকে নিজের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছে।

তবে এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের নতুন টানাপোড়েনের সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ কানাডা নিজেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত বিরোধে জড়িত। ফলে ইউরোপ যদি কানাডার সঙ্গে নতুন কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলে, তা নিছক অর্থনৈতিক সহযোগিতা হিসেবে থাকবে না; আর্কটিকের ক্ষমতার সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন অনেক এগিয়ে

আর্কটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তার দীর্ঘদিনের সামরিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো। ওয়াশিংটন বহু বছর ধরে আলাস্কায় সামরিক বিমানঘাঁটি, রাডারব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। F-35 ও F-22 যুদ্ধবিমান, বরফের নিচে চলাচল করতে সক্ষম পারমাণবিক সাবমেরিন এবং নোরাড-এর আধুনিকীকরণ যুক্তরাষ্ট্রকে আর্কটিক অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা দিয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার দীর্ঘদিনের আইসব্রেকার ঘাটতি কাটানোর চেষ্টা করছে। বোলিঙ্গার শিপইয়ার্ডে বহু দশক পর প্রথম ভারী মেরু জাহাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও দুটি ভারী আইসব্রেকার এবং বেরিং প্রণালীর কাছে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও নিবন্ধে রয়েছে।

এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নর্থ–ওয়েস্ট প্যাসেজের প্রশ্ন। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় এই সমুদ্রপথের ব্যবহার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে ফ্রিডম অব নেভিগেশন ধারণাটি শুধু নৌচলাচলের স্বাধীনতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত উপস্থিতির প্রশ্নও।

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই এগিয়ে যেতে চায় তার মিত্ররা?usa flag

গ্রিনল্যান্ড: প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু

আর্কটিকের বর্তমান ভূরাজনীতিতে গ্রিনল্যান্ড সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর একটি। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে নতুন ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তায় পেন্টাগনের ভূমিকা বাড়ে এবং এখানে দুটি ঘাঁটি পুনরায় চালু করা ও আরেকটি ঘাঁটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা সামনে আসে।

চুক্তিটির অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। নন-ন্যাটো ও নন-ইউরোপীয় দেশগুলোর বড় বিনিয়োগের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজসম্পদে ইউরোপীয় ও অন্য বিদেশি ব্যবসার প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এতে সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন করলেও গ্রিনল্যান্ডের সামাজিক ব্যয় ও জনকল্যাণের দায় মূলত ডেনমার্কের ওপর থেকে যাচ্ছে।

এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের স্বার্থের পার্থক্যটি প্রকট হয়ে ওঠে। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে যুক্ত; ফলে ইউরোপের সঙ্গে তার সম্পর্কও ঐতিহাসিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থান হিসেবে দেখে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হতে পারে।

মিত্রদের প্রতিযোগিতা, রাশিয়া ও চীনের সুযোগ

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এই প্রতিযোগিতা যদি বাড়তে থাকে, তার লাভ কার?

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এর একটি সম্ভাব্য সুবিধাভোগী রাশিয়া। রাশিয়া নর্দান সি রুট-কে বছরজুড়ে পরিচালনাযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হিসেবে বিকশিত করছে। এর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার পারমাণবিক আইসব্রেকার বহর। আর্কটিকের কঠিন পরিবেশে এই সক্ষমতা রাশিয়াকে একটি বিশেষ সুবিধা দেয়।

চীনের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা কম নয়। বেইজিং-এর আইস সিল্ক রোড ধারণা আর্কটিকের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়ার আর্কাটিক এলএনজি প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে এবং দক্ষিণের অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে উত্তরাঞ্চলীয় পথকে কাজে লাগাতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তি, সামরিক উপস্থিতি বাড়াবে যুক্তরাষ্ট্রgreenland flag

অর্থাৎ পশ্চিমা শক্তির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, ততই রাশিয়া ও চীনের সামনে কৌশলগত পরিসর তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। ইতিহাসে পশ্চিমা শক্তিগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত বহুবার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের পথ তৈরি করেছে। তবে বর্তমান বিশ্বের বহুমেরুকরণ ও অধিক সংখ্যক স্বতন্ত্র শক্তির উপস্থিতির কারণে এবারের ফলাফল আগের তুলনায় আরও অনিশ্চিত হতে পারে।

আর্কটিক কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার পরীক্ষাক্ষেত্র?

আর্কটিকের বর্তমান প্রতিযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—একটি সামরিক জোটের অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থ থাকলেও তার সদস্যদের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ সবসময় অভিন্ন হয় না। রাশিয়া ও চীনকে মোকাবিলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ একই কৌশলগত কাঠামোর অংশ হতে পারে; কিন্তু গ্রিনল্যান্ড, খনিজসম্পদ, বাণিজ্যপথ, বন্দর ও বিনিয়োগের প্রশ্নে তাদের স্বার্থ ভিন্ন হতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমস্যা হলো, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও আর্কটিকে তার সরাসরি ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি সীমিত। ছবি: রয়টার্স
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমস্যা হলো, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও আর্কটিকে তার সরাসরি ভৌগোলিক ও অবকাঠামোগত উপস্থিতি সীমিত। ছবি: রয়টার্স

এই বাস্তবতা আর্কটিককে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত করছে। এখানে সামরিক শক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও ভূগোল। ইউরোপ তার নিয়ন্ত্রণমূলক ও অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করতে চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর জোর দিচ্ছে, রাশিয়া তার ভৌগোলিক অবস্থান ও আইসব্রেকার সক্ষমতাকে কাজে লাগাচ্ছে, চীন অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও নতুন বাণিজ্যপথের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইছে।

এই প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ তাই শুধু আর্কটিকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক আইন এবং বড় শক্তিগুলোর সম্পর্কের ওপরও।

সবশেষে প্রশ্নটি যুদ্ধ হবে কি না—সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, আর্কটিকে কে কতটা প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সেই প্রভাব কোন পদ্ধতিতে ব্যবহার করবে। আরটির বিশ্লেষণে যে চিত্রটি পাওয়া যায়, তাতে আর্কটিক ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতার অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতার মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তবে সরাসরি যুদ্ধের বদলে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক অবকাঠামো, সম্পদ ও সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণই সম্ভবত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠবে।

পৃথিবীর উত্তর মেরুর বরফ তাই নিছক প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির নতুন ভূগোলের অংশ। যে বরফ একসময় রাষ্ট্রগুলোর দূরত্ব তৈরি করেছিল, বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে সেই দূরত্বই কমে আসছে। নতুন সমুদ্রপথ খুলছে, নতুন সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, আর পুরোনো মিত্রতার ভেতরেও নতুন স্বার্থের সংঘাত দৃশ্যমান হচ্ছে।

বিষয়: যুক্তরাষ্ট্রইউরোপগ্রিনল্যান্ডবরফরাজনীতিভূরাজনীতিরাশিয়াচীন
সর্বশেষ
  • ১

    বোয়িং চুক্তির পেছনে কোনো গোপন এজেন্ডা নেই: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

  • ২

    ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার পুলিশ সদস্য রিমান্ডে

  • ৩

    ব্যাংককে বন্যার কারণে বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার সেবা বন্ধ

  • ৪

    সুদের হারের ধাক্কা এবার কীভাবে সামলাবে আবাসন খাত?

  • ৫

    গুণী শিক্ষক সম্মাননার পরিধি বাড়ানো হচ্ছে: মাহ্দী আমিন

সম্পর্কিত
  • সুদের হারের ধাক্কা এবার কীভাবে সামলাবে আবাসন খাত?

    সুদের হারের ধাক্কা এবার কীভাবে সামলাবে আবাসন খাত?

    বিভিন্ন দেশে সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়ায় দেশগুলোর সরকারের অর্থব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়তে পারে আবাসন বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে বেশির ভাগ গৃহঋণের সুদের হার ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

  • ট্রাম্প-সি বৈঠক: কে জিতল, কে হারল?

    ট্রাম্প-সি বৈঠক: কে জিতল, কে হারল?

    দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এ নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার সেই বৈঠকের অন্যতম আলোচিত ফলাফল হলো– চীন শিগগিরই আটলান্টার চিড়িয়াখানায় দুটি বিশাল পান্ডা পাঠাবে!

  • রাজনীতিবিদদের ভাষণ লিখছে এআই, হুমকি কতটা

    রাজনীতিবিদদের ভাষণ লিখছে এআই, হুমকি কতটা

    ব্রিটিশ এমপি ও লেবার পার্টির নেতা স্টিভ ইয়েম চলতি বছরের জুনে তার সহকর্মী এমপিদের সামনে ‘একটি মৌলিক প্রশ্ন’ তুলেছিলেন। ইয়েম বলেছিলেন, “কে আসলে কাকে প্রভাবিত করছে? প্রযুক্তি কি সমাজের সেবা করছে, নাকি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বার্থে সমাজকেই নতুন করে গড়ে তোলা হচ্ছে?”

  • বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেন?

    বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেন?

    নীতিমালা সংস্কারের নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পরিকল্পনাও। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আশানুপাতে বাড়ছে না। একাধিকবার বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেনন