Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০১ নভেম্বর, ২০২৬
০১ নভেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০১ নভেম্বর, ২০২৬
০১ নভেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ | স্বত্ব © চরচা
> ভাবনা
পর্ব–৩

তরুণের বিদ্রোহ, আধুনিক কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্র রক্ষার শেষ প্রতিরোধ

সহিদুল আলম স্বপন

সহিদুল আলম স্বপন

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ২১: ৪৪
তরুণের বিদ্রোহ, আধুনিক কর্তৃত্ববাদ ও গণতন্ত্র রক্ষার শেষ প্রতিরোধ

ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনকে শুধু নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কিংবা একজন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ করে দেখলে ঘটনাটির গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা যাবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস এই অসন্তোষের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ হলেও এর পেছনে জমা হয়েছে বহু বছরের হতাশা শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সীমিত উচ্চশিক্ষার সুযোগ, চাকরির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতা, বেকারত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে যথাযথ জবাব না পাওয়ার ক্ষোভ।

Advertisement

ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি দ্রুতই তরুণদের একটি দৃশ্যমান প্রতিবাদমঞ্চে পরিণত হয়েছে। আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং তার সমর্থকেরা নিজেদের ‘তেলাপোকা’ পরিচয়টিকেই প্রতিবাদের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন; অর্থাৎ, ক্ষমতাবানদের চোখে অবাঞ্ছিত, উপেক্ষিত ও দমনযোগ্য বলে বিবেচিত মানুষেরাও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে এবং সংগঠিত হয়। গত জুনে ছোট আকারে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ জুলাইয়ে দিল্লির রাজপথে বৃহৎ বিক্ষোভে রূপ নেয়। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনটিকে আরও নৈতিক ও জাতীয় গুরুত্ব দিয়েছে। তিনি ২৮ জুন থেকে দিল্লিতে অনশন শুরু করে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানান। তার স্বাস্থ্যের অবনতি, হাসপাতালে স্থানান্তর এবং অনশন প্রত্যাহারের আহ্বান আন্দোলনকে মানবিক সংকটের মাত্রাও দিয়েছে। 

গত ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় পুলিশের বাধা, লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। আন্দোলনকারীরা বলেছে, একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক দাবিকে আইনশৃঙ্খলার সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে অনুমতিহীন সমাবেশ ও সংসদ এলাকার নিরাপত্তা রক্ষা জরুরি হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া যদি দাবির রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করে কেবল নিয়ন্ত্রণমূলক হয়, তবে তা ক্ষোভ কমানোর বদলে আরও বাড়িয়ে দেয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

আন্দোলন কেন পরীক্ষার গণ্ডি ছাড়িয়েছে

রাহুল গান্ধীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত দশ বছরে ভারতে ১৫২টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক দাবি হিসেবে স্বাধীনভাবে আরও যাচাইয়ের দাবি রাখে; তবে এর মাধ্যমে যে গভীর জনঅসন্তোষের কথা উঠে এসেছে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, পুলিশি পদক্ষেপের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে মোদি সরকার প্রশ্নফাঁসের মামলায় দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে।

সরকারের ঘোষণাটি তাৎপর্যপূর্ণ হলেও আন্দোলনের মূল প্রশ্নটি শুধু বিচারের গতি নয়; বরং রাজনৈতিক দায় গ্রহণের সংস্কৃতি। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে প্রশাসনিক ব্যর্থতার পর তদন্ত কমিটি, বিশেষ আদালত অথবা ভবিষ্যতে কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু মন্ত্রী বা উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের নজির তুলনামূলকভাবে বিরল। এখানেই গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতির পরীক্ষা হয়: আইনি দৃষ্টিতে অপরাধ প্রমাণিত না হলেও বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি নৈতিক দায় নেবে?

ভারতের গণতন্ত্র কি এক নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে?Cockroach Janata Party (CJP)

একবিংশ শতাব্দীর কর্তৃত্ববাদ

আধুনিক কর্তৃত্ববাদ সব সময় সামরিক পোশাক পরে আসে না। কখনো তা নির্বাচনে জয়ী জনপ্রিয় নেতার ভাষায় আসে; কখনো জাতীয় নিরাপত্তা, উন্নয়ন, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে। নির্বাচন চলতে থাকে; কিন্তু প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র অসম হয়ে ওঠে। বিরোধী দল নিষিদ্ধ না হলেও তাদের রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়। সংবাদমাধ্যম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন থাকে, কিন্তু সরকারি চাপ, মালিকানার কেন্দ্রীকরণ, বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ এবং আইনি হয়রানির আশঙ্কায় সেলফ সেন্সর শুরু করে।

ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক রূপের সঙ্গে এই ব্যবস্থার পার্থক্য রয়েছে। মুসোলিনি ও হিটলারের রাষ্ট্র একদলীয়, সহিংস ও প্রকাশ্য সর্বগ্রাসী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। বর্তমান যুগের বহু শাসনব্যবস্থা বরং গণতন্ত্রের ভাষা, নির্বাচন এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বহাল রেখেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। একে কখনো নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ, কখনো অনুদার গণতন্ত্র, আবার কখনো প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদ বলা হয়।

সুতরাং ভারতকে এখনই সরাসরি ঐতিহাসিক অর্থে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ঘোষণা করা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে যথার্থ হবে না। কিন্তু রাষ্ট্র যখন ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যান্ডেটকে সীমাহীন ক্ষমতার অনুমোদন হিসেবে ব্যবহার করে এবং সমালোচকদের দেশবিরোধী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিত্রিত করে, তখন ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক প্রবণতার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফ্যাসিবাদ কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়; এটি এমন এক রাজনৈতিক মানসিকতাও, যেখানে নেতা, দল ও রাষ্ট্রকে অভিন্ন বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা

হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানের সরকার নির্বাচনী বৈধতা বজায় রেখেও সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের ওপর রাষ্ট্রীয় প্রভাব বাড়িয়েছে। তুরস্কে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়েছে এবং বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। ব্রাজিলে জাইর বোলসোনারোর সময় তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক আস্থাকে দুর্বল করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রেও ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল অস্বীকার এবং ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে হামলা দেখিয়েছে যে, দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কোনো দেশকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর্তৃত্ববাদী বিপদ থেকে রক্ষা করে না।

এসব দেশের অভিজ্ঞতায় একটি সাধারণ সূত্র পাওয়া যায়। জনপ্রিয়তাবাদী নেতৃত্ব প্রথমে দাবি করে, কেবল তারাই ‘প্রকৃত জনগণের’ প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে বিরোধী দল, সংবাদমাধ্যম, বিচারক, নাগরিক সংগঠন এবং আন্দোলনকারীদের জনগণের অংশ হিসেবে নয়, বরং জনগণের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই বিভাজনের রাজনীতি ক্রমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে।

ভারতের ক্ষেত্রে এই বিপদ আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশটির বহুত্ববাদই তার গণতন্ত্রের প্রধান শক্তি। বহু ধর্ম, ভাষা, জাতিসত্তা, অঞ্চল ও রাজনৈতিক মতের সমন্বয়ে গঠিত ভারতের রাষ্ট্রীয় ঐক্য সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য দিয়ে নয়, সাংবিধানিক সহাবস্থান দিয়ে রক্ষা করা সম্ভব।

তরুণেরা কেন বিশ্বরাজনীতির নতুন কেন্দ্র

ভারতের ককরোচ আন্দোলন একক কোনো ঘটনা নয়। বিশ্বজুড়ে তরুণেরা প্রচলিত রাজনৈতিক দলের বাইরে নতুন ভাষা, ব্যঙ্গ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিকেন্দ্রিভূত সংগঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করছে। জলবায়ু আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ এবং কর্মসংস্থানের দাবিতে তরুণদের অংশগ্রহণ নতুন ধরনের রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনও দেখিয়েছে, একটি নির্দিষ্ট দাবি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। ডিজিটাল যোগাযোগ, রাষ্ট্রীয় দমন, জনমত এবং নৈতিক ক্ষোভ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্দোলনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।

বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের অভিজ্ঞতাতেও দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে তরুণদের অসন্তোষ যখন দীর্ঘদিন উপেক্ষিত হয়, তখন তা হঠাৎ বিস্ফোরিত হতে পারে। ভারতের তরুণ আন্দোলনকে তাই ক্ষণস্থায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রবণতা হিসেবে দমন করা বিপজ্জনক হবে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণেও আন্দোলনটিকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতের তরুণদের বৃহত্তর হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে।

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলন। ছবি: সিএনএন
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলন। ছবি: সিএনএন

বিরোধীদের দায়িত্বও কম নয়

বিরোধী দলগুলো ছাত্রদের পাশে দাঁড়ালে তা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে কেবল ক্ষমতাসীন সরকারকে দুর্বল করার হাতিয়ার বানানো হলে আন্দোলনের স্বাধীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস কিংবা অন্য দলগুলোর উচিত শুধু পদত্যাগ দাবি না করে পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে সুস্পষ্ট বিকল্প নীতি উপস্থাপন করা।

কারণ, আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। রাজনৈতিক দলগুলো আসে-যায়; কিন্তু একটি ভেঙে পড়া পরীক্ষা ব্যবস্থা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং হতাশ তরুণ প্রজন্মের ক্ষতি কয়েক দশক ধরে বহন করতে হয়।

ভারতে প্রশ্নফাঁস থেকে রাষ্ট্রের সংকট: বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের আরেক অধ্যায়?cjp protest

ভারতের গণতন্ত্র কি ফ্যাসিবাদের দিকে?

এই প্রশ্নের সবচেয়ে দায়িত্বশীল উত্তর হলো–ভারত এখনও একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বহুদলীয় নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত, আদালত সক্রিয় এবং নাগরিক সমাজ সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়নি। কিন্তু একই সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা গুরুতর।

ফ্যাসিবাদ কোনো সুইচের মতো একদিনে চালু হয় না। তার আগমন ঘটে ধীরে ধীরে ভিন্নমতের অবমূল্যায়ন, সমালোচকের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন, নেতা ও রাষ্ট্রকে এক করে দেখা, সংখ্যালঘুকে সন্দেহের চোখে দেখা, ইতিহাসকে রাজনৈতিক সুবিধামতো পুনর্লিখন এবং পুলিশি শক্তিকে রাজনৈতিক সমস্যার প্রাথমিক সমাধান হিসেবে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে।

ভারত সেই চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছেছে–এ কথা বলা এখনো অতিরঞ্জিত। কিন্তু সে পথে যাওয়ার সম্ভাব্য লক্ষণগুলো নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ বা অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং এই আলোচনা গণতন্ত্র রক্ষারই অংশ।

শেষ কথা: তেলাপোকাদের উপেক্ষা করলে ইতিহাস ফিরে আসে

রাষ্ট্রক্ষমতা প্রায়ই মনে করে, প্রান্তিক ও সংগঠনহীন তরুণদের আন্দোলন সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা উল্টো। যাদের কথা শোনা হয় না, তারাই নতুন ভাষা তৈরি করে; যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নেই, তারাই নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্ম দেয়; আর যাদের রাষ্ট্র তুচ্ছ মনে করে, তারাই কখনো কখনো রাষ্ট্রের নৈতিক বৈধতাকে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি হাস্যরসাত্মক হতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক বার্তা মোটেও হাস্যকর নয়। এই আন্দোলন মনে করিয়ে দিচ্ছে উন্নয়নের পরিসংখ্যান, বৃহৎ অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক মর্যাদা কিংবা নির্বাচনী বিজয় দিয়ে তরুণদের ন্যায়বিচারের দাবি চাপা দেওয়া যায় না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার যদি এই আন্দোলনকে কেবল বিরোধীদের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে, তবে তা একটি বড় রাজনৈতিক ভুল হবে। আবার বিরোধীরা যদি শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে কেবল নির্বাচনী স্লোগানে পরিণত করে, তারাও একই ভুল করবে।

সমাধানের পথ হলো–স্বাধীন তদন্ত, প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক দায় স্বীকার, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সুরক্ষা এবং তরুণদের সঙ্গে সরাসরি ও প্রকাশ্য সংলাপ। কারণ, গণতন্ত্রের শক্তি সরকারের কখনো ভুল না করার মধ্যে নয়; ভুল স্বীকার করে সংশোধনের ক্ষমতার মধ্যে।

ভারতের সামনে তাই আজ কেবল একটি পরীক্ষা ব্যবস্থাকে রক্ষার চ্যালেঞ্জ নয়। তার সামনে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে নিজের নৈতিক দাবি রক্ষার চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র কি নাগরিকের প্রশ্ন শুনবে, নাকি প্রশ্নকর্তাকেই শত্রু বানাবে–এই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, বর্তমান অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের সূচনা হবে, নাকি ইতিহাসের পরিচিত অন্ধকার পথে আরও একটি পদক্ষেপ।

শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে কোনো নেতা, দল বা নির্বাচন কমিশন একা নয়; তাকে বাঁচিয়ে রাখে প্রশ্ন করতে পারা সাহসী মানুষ। আর রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত শুরু হয় তখনই, যখন সে মানুষের প্রশ্নকে ভয় পেতে শেখে।

সহিদুল আলম স্বপন: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

বিষয়: শিক্ষার্থীনির্বাচন কমিশনরাজনীতিককরোচ জনতা পার্টিভারতঅর্থনীতিপ্রশাসনগণতন্ত্রসংবাদমাধ্যম
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    ‘ভাবিনি জিপিএ–৫ পাব টার্গেট মেডিকেল’

  • ২

    বাংলাদেশে রয়্যাল এনফিল্ডের নতুন সংস্করণ উন্মোচন

  • ৩

    রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া সফরের ৯৬তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন

  • ৪

    ‘সরকার আসার সাথে সাথে সব জায়গায় বাপের পরিচয়ে বসে গেছে’

  • ৫

    আসাদুজ্জামান নূরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোয় এনসিপির নিন্দা

সম্পর্কিত
  • রাষ্ট্র যখন আত্মসংযম দেখাচ্ছে, তখন কেন সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়ছে?

    রাষ্ট্র যখন আত্মসংযম দেখাচ্ছে, তখন কেন সংখ্যালঘু নির্যাতন বাড়ছে?

    মানবাধিকার সংগঠন এমএসএফের (মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন) অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি পরস্পরবিরোধী চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনে আহতের ঘটনা শূন্যে নেমেছে, কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে।

  • প্রবাসী শ্রমিকেরা কি কেবলই লাশ, কেবলই গিনিপিগ?

    প্রবাসী শ্রমিকেরা কি কেবলই লাশ, কেবলই গিনিপিগ?

    চলতি বছর জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে চার হাজার ৬০টি মরদেহ। এ হিসাবে দিনে মরদেহ এসেছে গড়ে ১৪টির বেশি। সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদি আরবে, দুই হাজারের মতো। সরকার প্রবাসী কার্ড দেবে, ভালো কথা। কিন্তু বিদেশে গিয়ে যারা লাশ বা পঙ্গু হয়ে ফিরে আসেন, তাদের তো

  • স্লোগান ও গ্রেপ্তার: শব্দ নয়, অপরাধের বিচার হোক

    স্লোগান ও গ্রেপ্তার: শব্দ নয়, অপরাধের বিচার হোক

    স্লোগান ঘিরে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় একটি প্রশ্ন সামনে আসে। আর তা হলো, সমস্যা স্লোগানের উচ্চারণে, নাকি অপব্যবহারে? কারণ, রাজনীতির মাঠ-ময়দানে উচ্চারিত একটি স্লোগান কখনো কেবল কয়েকটি শব্দের সমষ্টি নয়: ইতিহাস, আবেগ, পরিচয়, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং কখনো কখনো মানুষের আত্মত্যাগের স্মৃতি। দৃষ্

  • আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা: দুধের বোতল থেকে বিশ্বরাজনীতির শিক্ষা

    আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা: দুধের বোতল থেকে বিশ্বরাজনীতির শিক্ষা

    সুপারমার্কেট থেকে দুই শতাংশ চর্বিযুক্ত দুধের একটি বোতল কেনার সময় সাধারণত কেউ আন্তর্জাতিক রাজনীতির কথা ভাবেন না। ক্রেতার প্রত্যাশা থাকে, বোতলের গায়ে যা লেখা আছে, ভেতরের পণ্যও ঠিক তা-ই হবে। কিন্তু এই সাধারণ আস্থার পেছনেও রয়েছে আন্তর্জাতিক নিয়ম, মান নির্ধারণ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের একটি বিস্তৃত