রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি বহুল আলোচিত সত্য হলো–কোনো গণতন্ত্রের সংকট শুরু হয় না নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে; বরং শুরু হয় তখন, যখন নাগরিকেরা বিশ্বাস হারাতে শুরু করেন যে, রাষ্ট্র তাদের কথা শুনতে আগ্রহী।
প্রশ্নপত্র ফাঁসকে ঘিরে ভারতের চলমান ছাত্র আন্দোলন সেই গভীর প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমে এটি ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতার দাবি; কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা রাষ্ট্রের জবাবদিহি, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
সরকার পরীক্ষা সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কঠোর ব্যবস্থা ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু আন্দোলনের বড় অংশ এখনও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ রাজনৈতিক জবাবদিহির দাবি থেকে সরে আসেনি।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো ভারত কি সত্যিই কর্তৃত্ববাদ বা ফ্যাসিবাদের দিকে এগোচ্ছে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কারণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনো সাদা-কালো নয়। একটি রাষ্ট্রে শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে শক্তিশালী নির্বাচনও থাকতে পারে।
কিন্তু যখন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংসদ, প্রশাসন, তদন্ত সংস্থা, সংবাদমাধ্যম কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমশ নির্বাহী ক্ষমতার প্রভাবের মধ্যে চলে আসে, তখন রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা সেটিকে ‘গণতান্ত্রিক পশ্চাৎগমন’ (Democratic Backsliding) হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
ছবি: রয়টার্সএটি ফ্যাসিবাদের সমার্থক নয়; বরং এমন একটি ধীর প্রক্রিয়া, যেখানে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামো অটুট থাকলেও তার প্রাণশক্তি দুর্বল হতে থাকে।
বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাস এই বাস্তবতার বহু উদাহরণ বহন করে।
হাঙ্গেরিতে নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও বিচারব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।
তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তার প্রশ্নে রাষ্ট্রক্ষমতার ব্যাপক সম্প্রসারণ দেখা গেছে। ব্রাজিলে রাজনৈতিক মেরুকরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও সামাজিক বিভাজন তীব্র হয়ে ওঠে।
আর যুক্তরাষ্ট্রের মতো দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দেশেও নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল।
এই উদাহরণগুলোর একটি সাধারণ শিক্ষা রয়েছে–গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় সামরিক অভ্যুত্থান নয়; অনেক সময় গণতন্ত্রের ভেতর থেকেই এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যা বিরোধিতাকে শত্রু এবং সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে শুরু করে।
ভারতের বর্তমান বাস্তবতাও এই বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা দ্রুত একটি রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
বিরোধী দলগুলো সংসদে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার দাবি করছে–আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
দেশটির রাজধানী দিল্লিতে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, সংসদে অচলাবস্থা এবং দেশব্যাপী বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের আরেকটি শিক্ষা দেয়।
১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে হওয়া আন্দোলন, তিয়েনআনমেন স্কয়ার বিক্ষোভ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলন–সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ছাত্রসমাজ কেবল শিক্ষানীতির পরিবর্তন চায় না; তারা রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলে।
কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ সমাজ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ।
এই কারণেই ছাত্র আন্দোলনকে কেবল আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা একটি বড় রাজনৈতিক ভুল হতে পারে।
গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের শক্তি পুলিশ বা প্রশাসনের সক্ষমতায় নয়; বরং জনগণের আস্থায়।
জনগণ যদি বিশ্বাস করে যে, তাদের অভিযোগ শোনা হচ্ছে, তাহলে আন্দোলন প্রায়ই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগোয়।
কিন্তু যদি মানুষ মনে করে, তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষিত হচ্ছে, তখন আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক অসন্তোষের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতা শুধু ভারতের নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ছাত্র আন্দোলন বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
কখনো ভাষার প্রশ্নে, কখনো গণতন্ত্রের দাবিতে, কখনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে, আবার কখনো নির্বাচন বা শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট–যুবসমাজ যখন রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারাতে শুরু করে, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
তবে এখানে আরেকটি সতর্কতার বিষয়ও রয়েছে। যেকোনো ছাত্র আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব প্রবেশ করা স্বাভাবিক।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, ন্যায্য দাবির আন্দোলনও পরবর্তীকালে দলীয় প্রতিযোগিতা, মতাদর্শিক সংঘাত বা উগ্রতার কারণে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
তাই আন্দোলনের নৈতিক শক্তি ধরে রাখার দায় যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি আন্দোলনের নেতৃত্বেরও।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার যদি কেবল বিরোধী রাজনীতিকে দায়ী করে এবং বিরোধী দল যদি কেবল সরকার পতনের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সেই শিক্ষার্থীরাই, যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা।
ছবি: রয়টার্সঅতএব, সমাধানের পথ রাজনৈতিক সংঘাতে নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে।
একটি স্বাধীন বিচারিক তদন্ত, পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ, প্রশ্নপত্র নিরাপত্তার নতুন কাঠামো, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচার, সংসদীয় পর্যালোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত সংলাপ–এসবই আস্থা পুনর্গঠনের অপরিহার্য শর্ত।
সবশেষে, ভারত কি ফ্যাসিবাদের দিকে যাচ্ছে–এই প্রশ্নের চেয়ে সম্ভবত আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–ভারত কি তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে?
কারণ ইতিহাস বলছে, কোনো গণতন্ত্র একদিনে ভেঙে পড়ে না; আবার কোনো গণতন্ত্র একদিনে পুনর্গঠিতও হয় না।
এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংবিধানিক সংস্কৃতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং এমন নেতৃত্ব, যারা সমালোচনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, বরং রাষ্ট্রকে আরও উন্নত করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
ভারতের বর্তমান সংকট সেই পরীক্ষারই আরেকটি অধ্যায়।
ফলে আজকের বিতর্ক কেবল একটি প্রশ্নপত্র, একটি আন্দোলন বা একটি সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়।
এটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের রাজনৈতিক পরিপক্বতা, সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
সেই পরীক্ষায় ভারতের সাফল্য বা ব্যর্থতা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে থাকবে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট