যে কোনো ঐতিহাসিক মানদণ্ডে ভারত কোনো জোরজবরদস্তির কাছে মাথা নত করতে অনিচ্ছুক। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু জোট নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। আর তার উত্তরসূরিরা সেই পথকে নানা রূপকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে ভারত চীনের উসকানি অনেক বেশি সহ্য করেছে। তারপরেও এমন ছাড় দিয়েছে, যা ১৯৬২ সালের দুই দেশের যুদ্ধের পর থেকে আর কখনো দেখা যায়নি।
গত ছয় মাসে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর–সবাই চীন সফর করেছেন। চীনের উসকানির মধ্যেও এই প্রতিটি সফরের পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ভারতের পক্ষ থেকে।
এই অবস্থান পরিবর্তনের কারণ কোনো জাতীয় দুর্বলতা নয়। এর মূল কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ কূটনীতি ভারতের কৌশলগত সুরক্ষা কবচ কেড়ে নিয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর চীন পাকিস্তানকে সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে, ভারতের কারখানা থেকে প্রকৌশলী সরিয়ে নিয়েছে, লাদাখ সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের প্রবেশাধিকার সীমিত রেখেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে অরুণাচল প্রদেশের বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তন করেছে।
তবুও ভারত নীরব থেকেছে এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার জন্য সংঘাত এড়িয়ে গেছে। নতুন ইন্দো-প্যাসিফিক দাবার ছকে ভারতের হিসেব স্পষ্ট: ওয়াশিংটনের নিশ্চিত সমর্থনের ওপর বাজি ধরার চেয়ে এখন বেইজিংকে মানিয়ে নেওয়াই মন্দের ভালো এই পরিবর্তন ভূরাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যেখানে চীনের প্রতি বাস্তববাদী নতি স্বীকারকে মেনে এত দিনকার চর্চিত কৌশলগত জোট নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ভারত বাদ দিয়েছে।
মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় দিল্লির আত্মসমর্পণের প্রমাণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন চীন পাকিস্তানকে ভারতীয় সেনা মোতায়েন সম্পর্কিত স্যাটেলাইট তথ্য সরবরাহ করে। ভারতীয় উপ সেনাপ্রধান পরে বলেছিলেন, চীন এই সংঘাতকে তাদের অস্ত্র ব্যবস্থার ‘লাইভ ল্যাব’হিসেবে ব্যবহার করেছে। গত পাঁচ বছরে পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের ৮১ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। তবুও ভারত পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করেছে, চীনের নাম মুখেই আনেনি। এর মানে, মোদী ভালো করেই জানেন, মার্কিন সমর্থন ছাড়া চীনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যাওয়া তার জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি ডেকে আনবে।
এখন চীন ভারতের জন্য সরাসরি সামরিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেও হাজির। জয়শঙ্কর এক সময় বলেছিলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে না। কিন্তু ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর সৃষ্ট বাফার জোনে ভারতীয় সেনারা এখনো ঢুকতে পারছে না। তবুও জয়শঙ্কর প্রথমবার বেইজিং সফরে গিয়ে সীমান্ত পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফেরানোর কথা বলেননি। বরং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘ইতিবাচক ধারার’ প্রশংসা করেছেন। এতে বোঝা যায়, মোদী সরকার এই নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও একই ছবি। জুলাইয়ের শুরুতে ব্লুমবার্গ জানায়, তাইওয়ানের কোম্পানি ফক্সকন চীনের চাপের কারণে ভারতের আইফোন কারখানা থেকে ৩০০-রও বেশি চীনা প্রকৌশলী সরিয়ে নিয়েছে। যা আদপে ভারতের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনাকে থামিয়ে দিয়েছে। ভারত এটিকে অ্যাপল ও ফক্সকনের মধ্যে সমস্যা বলে পাশ কাটিয়েছে। একই সময়ে চীন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সরবরাহে কড়াকড়ি করেছে। তবুও ভারত শুধু ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ’করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে।
এভাবে অর্থনৈতিক ধাক্কা সহ্য করা এবং চীনের মুখোমুখি হতে না চাওয়া ভারতের নতুন বাস্তবতাকে তুলে ধরে- বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করার বিরাট ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে ভারতের জন্য। এমনকি নীতি আয়োগ (পরিকল্পনা কমিশন) নাকি চীনা বিনিয়োগের নিয়ম শিথিল করার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ টেনে আনা যায় এবং উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করা যায়।
এরপরও চীন অরুণাচল প্রদেশে আরও কিছু স্থানের নাম বদলে নিজের দাবি জোরালো করেছে। দালাই লামার জন্মদিন উপলক্ষে দিল্লিকে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছে। তিব্বত প্রসঙ্গ উত্থাপনে ভারতীয় ভাষ্যকারদের সাবধান করেছে। প্রতিবারই ভারত নীরব থেকেছে। কারণ তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া নষ্ট হওয়ার ভয়ে আছে।
এই সব ঘটনাকে একত্রে দেখলে একটি সুস্পষ্ট ধারা চোখে পড়ে-চীন ভারতকে পরীক্ষা করছে, চাপ দিচ্ছে, এমনকি বিব্রত করছে। আর ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মোদী সরকার একসময় চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন বাস্তববাদী হয়ে চীনের প্রাধান্য মেনে নিচ্ছে।
তিন দেশের তিনটি আইকনিক স্থাপত্য
এর পেছনে ট্রাম্পের ভূমিকা বড়। তার দ্বিতীয় মেয়াদ ভারতের জন্য নিরাপত্তা-কবচ শিকেয় উঠেছে। মার্কিন শুল্ক নীতি, পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ, কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন, এমনকি ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপ–সব মিলিয়ে ভারত বুঝেছে, আমেরিকা আর নিশ্চিন্ত ভরসার জায়গা নয়। বরং অনিশ্চিত সঙ্গী। চীনকে অন্তত আগাম অনুমান করা যায়। তাই ভারত এখন আমেরিকার চেয়ে চীনকে মানিয়ে চলাই কম ক্ষতিকর মনে করছে।
ভারত নতি স্বীকার করছে এ কারণে না যে, তারা চীনকে বিশ্বাস করে। করছে, কারণ তারা আর আমেরিকাকে ভরসা করতে পারছে না। ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছেন, যা চীনের সঙ্গে সীমান্তে দীর্ঘদিনের কৌশলগত চাপে কারণে সম্ভব হয়নি। ভারতের কাছে বাস্তববাদী নতি স্বীকার কৌশলগত প্রতিরোধের চেয়ে ভালো বলেই মনে হচ্ছে।
(লেখাটি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের সৌজন্যে সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করা হলো।)