সহিদুল আলম স্বপন

ইতিহাস কদাচিৎ কোনো জাতিকে একই সঙ্গে সুযোগ, বৈধতা এবং দায়িত্ব দেয়। বাংলাদেশ আজ সেই বিরল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। কিন্তু এই ঘটনাটি শুধু ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের গল্প নয়, এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি আত্মজিজ্ঞাসার আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বহীনতার বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের (২০২৬-২০২৭) সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশ ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করে।
প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসভূমি দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর অন্যতম তরুণ, জনবহুল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল। ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত জলপথ, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি করিডর, পূর্ব এশিয়ার বাজার এবং আফ্রিকার সঙ্গে সংযোগ—এই ভূরাজনৈতিক অবস্থান এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে রাখার কথা। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়া আজও একটি কার্যকর আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এর মূল কারণ রাজনৈতিক বিভক্তি এবং নেতৃত্বের দীর্ঘস্থায়ী সংকট।
১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় স্বপ্ন ছিল, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সেই ভূমিকা পালন করবে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ান করেছে। চার দশক পর সেই স্বপ্ন কার্যত ধূলিসাৎ। ২০১৬ সালের পর কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব সার্ককে জিম্মি করে রেখেছে। যে অঞ্চলটি সম্মিলিতভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারত, সেটি আজও বিচ্ছিন্ন জাতীয় স্বার্থের জালে আবদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান বা আফ্রিকান ইউনিয়ন যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়া এখনো একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তৈরি করতে ব্যর্থ।

আজকের পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় এই ব্যর্থতার মূল্য আরও বেশি। কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে চীন নতুন শক্তির কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বিশ্বে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে, কিন্তু প্রভাব বাড়েনি। ভারত নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি এবং জি-২০, ব্রিকস ও কোয়াডের মতো প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। কিন্তু ভারতের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত উত্থানে রূপ নেয়নি। নয়াদিল্লি ক্রমেই আঞ্চলিক কাঠামোর বদলে বৈশ্বিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ফলে তৈরি হয়েছে এক গভীর নেতৃত্বের শূন্যতা।
বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতিত্ব সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু এটি সেই শূন্যতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। এই পদ নির্বাহী ক্ষমতার পদ নয়, তবে আন্তর্জাতিক আলোচনার অগ্রাধিকার নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঋণ পুনর্গঠন, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য আর্থিক কাঠামোর প্রশ্নে বাংলাদেশ একটি কার্যকর বৈশ্বিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি এবং মালদ্বীপের অস্তিত্ব সংকট–এই সবকিছু একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অসমতার প্রতিফলন। সেই বাস্তবতাকে বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরার এই সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখনো কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ধীরে ধীরে কমছে, দাতাদের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে এবং মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো অনুপস্থিত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ এই সংকটকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে। এটি সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক উদাসীনতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর সামনে নতুন করে রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে কেবল বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ নয়, রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক সায়মা ওয়াজেদকে ঘিরে উদ্ভূত বিতর্ক এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার মনোনয়ন ও নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রদত্ত তথ্যের যথার্থতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। পরে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং সহকারী মহাপরিচালক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনা একটি বৃহত্তর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পুরো অঞ্চলের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বৈশ্বিক নেতৃত্ব শুধু পদ পাওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না, তা প্রতিষ্ঠিত হয় কর্মদক্ষতা, নীতি এবং আস্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই বার্তা দিতে হবে যে, দেশটি মেধা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বকে সমর্থন করে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নেও বাংলাদেশকে পরিপক্ব কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রত্যাশার মধ্যে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির প্রকৃত পরীক্ষা এখন। বিশেষ করে গাজা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মর্যাদা বাড়াবে।

সবশেষে, এই মুহূর্তটি শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ারও। জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য, সমুদ্র অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে আঞ্চলিক সমন্বয় এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি অপরিহার্যতা। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব কি পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, নাকি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো নতুন ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতিত্ব সেই সম্ভাবনার একটি দরজা অন্তত খুলে দিয়েছে।
প্রশ্নটি আর কে চেয়ারে বসেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো–এই অঞ্চল কি অবশেষে সেই নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে প্রস্তুত, যা সে কয়েক দশক ধরে এড়িয়ে এসেছে? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাকে শুধু নেতৃত্ব দিতে হবে না, নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ডও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো অত্যন্ত সহজ। বিশ্ব আজ বাংলাদেশের কাছ থেকে কেবল কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, নীতিগত দৃঢ়তাও প্রত্যাশা করছে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ

ইতিহাস কদাচিৎ কোনো জাতিকে একই সঙ্গে সুযোগ, বৈধতা এবং দায়িত্ব দেয়। বাংলাদেশ আজ সেই বিরল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। কিন্তু এই ঘটনাটি শুধু ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির সাফল্যের গল্প নয়, এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি আত্মজিজ্ঞাসার আয়না, যেখানে প্রতিফলিত হচ্ছে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নেতৃত্বহীনতার বেদনাদায়ক বাস্তবতা।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের (২০২৬-২০২৭) সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বাংলাদেশ ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করে।
প্রায় ২০০ কোটি মানুষের আবাসভূমি দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর অন্যতম তরুণ, জনবহুল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অঞ্চল। ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত জলপথ, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি করিডর, পূর্ব এশিয়ার বাজার এবং আফ্রিকার সঙ্গে সংযোগ—এই ভূরাজনৈতিক অবস্থান এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রে রাখার কথা। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। দক্ষিণ এশিয়া আজও একটি কার্যকর আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এর মূল কারণ রাজনৈতিক বিভক্তি এবং নেতৃত্বের দীর্ঘস্থায়ী সংকট।
১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার সময় স্বপ্ন ছিল, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সেই ভূমিকা পালন করবে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ান করেছে। চার দশক পর সেই স্বপ্ন কার্যত ধূলিসাৎ। ২০১৬ সালের পর কোনো শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব সার্ককে জিম্মি করে রেখেছে। যে অঞ্চলটি সম্মিলিতভাবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হতে পারত, সেটি আজও বিচ্ছিন্ন জাতীয় স্বার্থের জালে আবদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান বা আফ্রিকান ইউনিয়ন যেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়া এখনো একটি সম্মিলিত কণ্ঠস্বর তৈরি করতে ব্যর্থ।

আজকের পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় এই ব্যর্থতার মূল্য আরও বেশি। কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে চীন নতুন শক্তির কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বিশ্বে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব বেড়েছে, কিন্তু প্রভাব বাড়েনি। ভারত নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি এবং জি-২০, ব্রিকস ও কোয়াডের মতো প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। কিন্তু ভারতের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত উত্থানে রূপ নেয়নি। নয়াদিল্লি ক্রমেই আঞ্চলিক কাঠামোর বদলে বৈশ্বিক ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ফলে তৈরি হয়েছে এক গভীর নেতৃত্বের শূন্যতা।
বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতিত্ব সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু এটি সেই শূন্যতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। এই পদ নির্বাহী ক্ষমতার পদ নয়, তবে আন্তর্জাতিক আলোচনার অগ্রাধিকার নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঋণ পুনর্গঠন, জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য আর্থিক কাঠামোর প্রশ্নে বাংলাদেশ একটি কার্যকর বৈশ্বিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। পাকিস্তানের ভয়াবহ বন্যা, শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি এবং মালদ্বীপের অস্তিত্ব সংকট–এই সবকিছু একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অসমতার প্রতিফলন। সেই বাস্তবতাকে বৈশ্বিক মঞ্চে তুলে ধরার এই সুযোগ বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা এখনো কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ধীরে ধীরে কমছে, দাতাদের আগ্রহ হ্রাস পাচ্ছে এবং মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো অনুপস্থিত। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ এই সংকটকে আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে। এটি সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক উদাসীনতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর সামনে নতুন করে রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
তবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে কেবল বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ নয়, রয়েছে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক সায়মা ওয়াজেদকে ঘিরে উদ্ভূত বিতর্ক এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার মনোনয়ন ও নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রদত্ত তথ্যের যথার্থতা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। পরে তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠানো হয়েছে এবং সহকারী মহাপরিচালক ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এই ঘটনা একটি বৃহত্তর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পুরো অঞ্চলের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বৈশ্বিক নেতৃত্ব শুধু পদ পাওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না, তা প্রতিষ্ঠিত হয় কর্মদক্ষতা, নীতি এবং আস্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই বার্তা দিতে হবে যে, দেশটি মেধা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বকে সমর্থন করে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নেও বাংলাদেশকে পরিপক্ব কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রত্যাশার মধ্যে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির প্রকৃত পরীক্ষা এখন। বিশেষ করে গাজা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মর্যাদা বাড়াবে।

সবশেষে, এই মুহূর্তটি শুধু বাংলাদেশের নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ারও। জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য, সমুদ্র অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে আঞ্চলিক সমন্বয় এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি অপরিহার্যতা। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব কি পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, নাকি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলো নতুন ধরনের আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতিত্ব সেই সম্ভাবনার একটি দরজা অন্তত খুলে দিয়েছে।
প্রশ্নটি আর কে চেয়ারে বসেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো–এই অঞ্চল কি অবশেষে সেই নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে প্রস্তুত, যা সে কয়েক দশক ধরে এড়িয়ে এসেছে? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাকে শুধু নেতৃত্ব দিতে হবে না, নেতৃত্বের নৈতিক মানদণ্ডও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো অত্যন্ত সহজ। বিশ্ব আজ বাংলাদেশের কাছ থেকে কেবল কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, নীতিগত দৃঢ়তাও প্রত্যাশা করছে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ

বৈশ্বিক নেতৃত্ব শুধু পদ পাওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না, তা প্রতিষ্ঠিত হয় কর্মদক্ষতা, নীতি এবং আস্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই বার্তা দিতে হবে যে, দেশটি মেধা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে বৈশ্বিক নেতৃত্বকে সমর্থন করে।