ads

অর্থনীতি বাড়লেও কেন ক্ষুব্ধ ভারত-ইন্দোনেশিয়ার জেনজিরা?

তোরু তাকাইশি
তোরু তাকাইশি
অর্থনীতি বাড়লেও কেন ক্ষুব্ধ ভারত-ইন্দোনেশিয়ার জেনজিরা?
প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে নির্মিত

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এশিয়ার দুই পরাশক্তি ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের চাকা আবার সচল হয়েছে। গত ৭ জুলাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইন্দোনেশিয়া সফর করেন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সফরে দুই দেশ প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জানান, দুই নেতা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) অবস্থান দৃঢ় করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।

ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। ১৪৮ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং ২৯ কোটি মানুষ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের চতুর্থ সর্বাধিক জনবহুল দেশ। দুই দেশই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ২০২২ সালে ইন্দোনেশিয়া এবং ২০২৩ সালে ভারত জি-২০ জোটের সভাপতিত্ব করে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক মেরুকরণের মধ্যেও জি-২০-তে এই দুই দেশ একে অপরকে সমর্থন করেছিল।

Advertisement

সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার দিক থেকেও দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। গত বছরের জানুয়ারিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট। এর জবাবে মোদিকে দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বিনতাং আদিপূর্ণা’ পদকে ভূষিত করে ইন্দোনেশিয়া। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যখন যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করছে এবং ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি সামনে আসছে, তখন এই দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। ছবি: রয়টার্স
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। ছবি: রয়টার্স

তবে শুধু বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নয়, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া নিজেদের দেশেও নতুন অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে জন্ম নেওয়া ‘জেন-জি’ প্রজন্ম এখন রাজনীতিতে সক্রিয় ও সোচ্চার হচ্ছে।

গত ৬ জুন নয়াদিল্লির রাস্তায় প্রায় এক হাজার মানুষ মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। তাদের স্লোগান ছিল—জবাবদিহিমূলক সরকার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং অনেকের হাতে ইন্টারনেটের 404 Not Found বার্তার আদলে তৈরি প্ল্যাকার্ড ছিল। এটি ছিল জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতিবাদ সমাবেশ। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় গত ১৬ মে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সিজেপি আত্মপ্রকাশ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই সিজেপির ইনস্টাগ্রাম অনুসারী ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যেখানে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অনুসারী প্রায় ৯০ লাখ।

ওই সময়ই ভারতে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। দেশে ফিরে অভিজিৎ দীপ নামের এক তরুণ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে প্রতিবাদ করায় জেন-জি প্রজন্ম বেশ দক্ষ। আট বছর আগে মোদি বলেছিলেন—যারা পাকোড়া ভেজে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদেরও কর্মসংস্থান হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থতা আড়ালের চেষ্টা। তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় পাকোড়া ভেজে বিক্ষোভ করেছিলেন। সেই ক্ষোভ এখনো শেষ হয়নি, বরং শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা হালকা মন্তব্য সেই আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে।

ইন্দোনেশিয়াতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জুন মাস থেকে জাকার্তাসহ বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সরকারের বিরুদ্ধে ‘ইন্দোনেশিয়া দেউলিয়া’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করছেন। তাদের অভিযোগ—বিনা মূল্যের স্কুলের খাবার কর্মসূচি এবং গ্রামভিত্তিক সমবায় প্রকল্পের মতো নীতিগুলো দেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। জুনের শুরুতে এই বিনা মূল্যের খাবার কর্মসূচিতে দুর্নীতির অভিযোগে জাতীয় পুষ্টি সংস্থার বরখাস্ত হওয়া প্রধান দাদান হিন্দায়ানাসহ তিন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া, প্রাবোও নিজের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর সহায়তা নিচ্ছেন, যা বেসামরিক কাজে সেনাবাহিনীর বাড়তি ভূমিকা হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা এবং তারা এর বিরোধিতা করছেন।

অথচ দুই দেশের অর্থনীতিই দ্রুত বাড়ছে। আইএমএফ-এর হিসাবে, গত বছর ভারতের অর্থনীতি ৭.৬ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতি ৫.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

তাহলে তরুণরা কেন ক্ষুব্ধ?

এর মূল কারণ—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি তৈরি হচ্ছে না। দুই দেশেই তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতে মানুষের গড় বয়স ছিল ২৮.৪ বছর এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৩০.১ বছর। কিন্তু তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ নেই। আইএলও-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ভারতে ১৫.৮ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৩.১ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও তীব্র।

ভারতের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত আগের দুই দশকে ভারতে প্রতি বছর গড়ে ৫০ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক হয়েছেন, কিন্তু চাকরি পেয়েছেন মাত্র ২৮ লাখ। অন্যদিকে, সরকারের ‘ইকোনমিক সার্ভে ২০২৪-২৫’ বলছে, স্নাতকদের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশ নিজেদের পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পান। নয়াদিল্লিভিত্তিক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরিচালক সুনাইনা কুমার বলেন, চাকরিবিহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখন বৈশ্বিক সমস্যা হলেও ভারতে এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে। ককরোচ জনতা পার্টির সাম্প্রতিক আন্দোলন দেখিয়েছে তরুণদের বেকারত্ব একটি বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা সমস্যা, যার জন্য তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দরকার।

ইন্দোনেশিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ইন্দোনেশিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও যথেষ্ট কর্মসংস্থান না হওয়ার মূল কারণ উৎপাদনশিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দুর্বলতা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অবদান ছিল ১২.৫ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ শতাংশ। অথচ মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এই হার ২৩ থেকে ২৫ শতাংশ। ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের বদলে দুই দেশের অর্থনীতি মূলত সেবাখাতের বড় অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে পাম তেল, প্রাকৃতিক রাবার ও কয়লার মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করে এগোচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক নেগারা ইন্দোনেশিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফাজার ফিত্রিয়ান্তো বলেন, ‘‘দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশিল্প এখন আলাদা পথে চলছে, যার ফলে কাগজে-কলমে জিডিপি বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।’’

উৎপাদনশিল্প বাড়াতে ভারত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচি এবং ইন্দোনেশিয়া ‘ডাউনস্ট্রিমিং’ নীতির মাধ্যমে কাঁচামাল দেশেই প্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দুই দেশই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটের দ্রুত বিস্তারের ফলে মানুষের অনেক কাজ ভবিষ্যতে যন্ত্রই করে ফেলতে পারে, যা এই চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়ে দেবে।

বর্তমানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে একের পর এক রাজনৈতিক আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং টানা ১৫ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। নেপালে ২০২৫ সালে সরকার কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার পর বিক্ষোভ শুরু হয় এবং আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে পদ ছাড়তে হয়।

ভারতে তরুণদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ভারতে তরুণদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

এই ধরনের ঘটনার অভিজ্ঞতা ইন্দোনেশিয়ারও আছে। ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখেই সুহার্তোর তিন দশকের শাসনের অবসান হয়েছিল। তবে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকোনমিজের মহাপরিচালক কোইচি কাওয়ামুরা বলেন, ১৯৯৮ সালের মতো বড় অর্থনৈতিক সংকট না হলে বর্তমান আন্দোলন সরকারের পতন ঘটাবে—এমন সম্ভাবনা কম। কিন্তু দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতা চললে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা তরুণদের অসন্তোষ আরও বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দুর্বল করবে।

ভারত ও ইন্দোনেশিয়া দুই দেশই স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তির মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে যেতে চায়। ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ্য ২০৪৫ সাল এবং ভারতের লক্ষ্য ২০৪৭ সাল। ভারতের ৭৫ বছর বয়সী নরেন্দ্র মোদি এবং ইন্দোনেশিয়ার ৭৪ বছর বয়সী প্রাবোও সুবিয়ান্তো উভয়ই নিজেদের শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। যদি তারা দ্রুত এই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারেন, তবেই সেটি তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের বড় পরিচয় হবে। তবে তার আগে তাদের দুই দেশেরই অভিন্ন ও প্রধান সমস্যার সমাধান করতে হবে—অর্থনীতি বাড়লেও কেন সেই হারে চাকরি বাড়ছে না।

(টোকিও-ভিত্তিক ইংরেজি ভাষায় সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া থেকে অনূদিত)

লেখক: ২০২০ সাল থেকে নিক্কেইয়ের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ সম্পাদকীয় লেখক।

সম্পর্কিত