বর্তমান যুগে ভালোবাসার সবচেয়ে ভয়ংকর সংলাপ বোধহয় আর “আমি তোমাকে ভালোবাসি” নয়-বরং, “তুমি আগে যাও, আমি আসছি!”
চিররঞ্জন সরকার

প্রেমের মরশুম আসে, প্রেমের মরশুম যায়। লাইলি-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতীরা বিরহকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন। আর আধুনিক ডিজিটাল যুগের প্রেম? সেটি অনেক বেশি বাস্তববাদী, হিসেবি, রিটার্ন-অন-ইনভেস্টমেন্ট নির্ভর এবং প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে ইউ-টার্ন নিতে সক্ষম। সেই বাস্তববাদের এক জীবন্ত (এবং সৌভাগ্যবশত সত্যিই জীবন্ত) নমুনা সম্প্রতি দেখা গেল ভারতের উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজের নিউ যমুনা ব্রিজে। ঘটনাটি এমন, বলিউডের কোনো পরিচালকও যদি এই স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রযোজকের কাছে যেতেন, তাকে হয়তো বলা হতো, “দাদা, এত অবাস্তব গল্প দর্শক খাবে না!”
মূল চরিত্র দুইজন—প্রেমিক আনু গুপ্তা এবং তার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, পরিস্থিতি বুঝে মুহূর্তে মত বদলানোর অলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী এক প্রেমিকা।
আচ্ছা ঠিক আছে...তবে তুমি আগে লাফ দাও। আমি ঠিক তোমার এক সেকেন্ড পরে আসছি। লেডিস ফার্স্ট তো অনেক হলো, এবার জেন্টলম্যান ফার্স্ট হোক!
পরিকল্পনাটা ছিল মহাকাব্যিক। সমাজ যখন তাদের প্রেম মেনে নেবে না, তখন তারা সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যমুনার বুকে একসঙ্গে ঝাঁপ দেবেন। ইতিহাসে লেখা থাকবে, “দুই প্রেমিক-প্রেমিকা একসঙ্গে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।” কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত যা লিখল, তার শিরোনাম দাঁড়াতে পারত, “একজন ঝাঁপ দিলেন, অন্যজন ঝামেলা এড়িয়ে বাড়ি চলে গেলেন।”
ঘটনার দিন বিকেলে দুজন এসে দাঁড়ালেন নিউ যমুনা ব্রিজে। চারপাশের বাতাস নিশ্চয়ই ভারী হয়ে উঠেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তাদের মধ্যে কিছুক্ষণ গভীর আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার সম্ভাব্য স্ক্রিপ্টটা বোধহয় এমনই ছিল-
আনু: “শোনো জানু, এই নিষ্ঠুর পৃথিবী আমাদের এক হতে দেবে না। চলো, আজ যমুনার জলে আমাদের ভালোবাসাকে অমর করে দিই। ওয়ান... টু... থ্রি...।”

প্রেমিকা: “তুমি একদম নিশ্চিত তো? পানি খুব ঠান্ডা না তো? আমার আবার সাইনাসের প্রবলেম আছে।”
আনু: “আরে বোকা! আমরা তো মরেই যাচ্ছি! তখন সাইনাস, মাইগ্রেন, গ্যাস—কিছুই থাকবে না।”
প্রেমিকা: “আচ্ছা ঠিক আছে...তবে তুমি আগে লাফ দাও। আমি ঠিক তোমার এক সেকেন্ড পরে আসছি। লেডিস ফার্স্ট তো অনেক হলো, এবার জেন্টলম্যান ফার্স্ট হোক!”
প্রেমে অন্ধ মানুষ নাকি লাল পতাকাও গোলাপ ফুল মনে করে। আনু গুপ্তাও সম্ভবত সেটাই করেছিলেন। ‘জেন্টলম্যান ফার্স্ট’ কথাটার মধ্যে যে ‘জেন্টলম্যান অনলি’ নামের একটি গোপন শর্ত লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। ভাবলেন, আহা! কী ভদ্র, কী সম্মানশীল প্রেমিকা! ব্যস, বীর বিক্রমে রেলিং টপকে যমুনার বুকে এক দুর্দান্ত ডাইভ!
এরপর শুরু হলো আসল নাটক।
আনু যখন বাতাস কেটে নিচে নামছেন, তখন হয়তো তার মাথার ভেতর বাজছিল কোনো রোমান্টিক সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তিনি হয়তো কল্পনা করছিলেন, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার প্রেমিকাও উড়ে আসবেন, দুজনে হাত ধরাধরি করে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবেন।
কিন্তু যমুনার জলে ‘ধপাস!’ করে পড়ার পর যখন তিনি ওপরের দিকে তাকালেন, তখন ইতিহাস নয়-ভূগোলটাই বদলে গেল।
কারণ ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে প্রেমিকা মোটেও “আনুউউ!” বলে চিৎকার করছেন না। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েননি, অজ্ঞান হননি, নাটকীয়ভাবে শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরেননি। বরং এমন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখছিলেন, যেন তিনি ডিসকভারি চ্যানেলের ‘ওয়াইল্ডলাইফ অব দ্য রিভার’ অনুষ্ঠান দেখছেন। প্রেমিক কীভাবে হাত-পা ছুড়ছেন, কতবার ডুবছেন, কতবার ভাসছেন-সবকিছুই ঠান্ডা মাথায় পর্যবেক্ষণ করলেন। এমনকি মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো মানসিকভাবে নম্বরও দিচ্ছেন—‘ডাইভিং: ৯/১০, সাঁতার: ২/১০, বুদ্ধিমত্তা: শূন্য।’

যখন নিশ্চিত হলেন যে আনু বাবু যথেষ্ট গভীরে পৌঁছে গেছেন এবং আপাতত আর ওপরে ফিরে এসে কোনো প্রশ্ন করবেন না, তখন তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে ঠিক করলেন। এরপর এমনভাবে হাঁটতে হাঁটতে সেতু ছেড়ে চলে গেলেন, যেন বিকেলে পার্কে হাঁটাহাঁটি শেষ করে বাসায় ফিরছেন। না কোনো তাড়াহুড়ো, না কোনো অপরাধবোধ, না কোনো সিনেমাটিক সংলাপ। একেই বলে ‘ক্লিন এক্সিট’। এমন পরিচ্ছন্ন প্রস্থান দেখে করপোরেট দুনিয়ার অনেক সিইওও অনুপ্রাণিত হতে পারেন।
মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো নিজের মনেই বলছেন, “আহা! এতদিন ধরে ব্রেকআপ করার সুযোগ খুঁজছিলাম। মুখোমুখি বলতে খারাপ লাগছিল। যমুনা মা নিজেই সমস্যার সমাধান করে দিলেন!”
কিন্তু বিধাতা আর ভারতীয় পুলিশের একটা অভ্যাস আছে-অন্যের সুন্দর করে সাজানো প্ল্যান নষ্ট করে দেওয়া। স্থানীয় মানুষ ও পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত ডুবুরি দল নেমে পড়ল। অনেক কষ্টে যমুনার বুক থেকে টেনে তোলা হলো আনু গুপ্তাকে।
জল থেকে উঠে আনুর অবস্থাটা ছিল সত্যিই করুণ। পেটে যমুনার জল, চোখে প্রতারণার জল, আর মাথায় এমন সব প্রশ্ন, যার উত্তর কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারও দিতে পারবেন না।
যে মানুষটিকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, যে বলেছিল “তুমি ছাড়া বাঁচব না”, সে যে আসলে বাক্যটা একটু ভিন্নভাবে বলেছিল, “তুমি ছাড়া আমি দিব্যি বাঁচব”-এই সূক্ষ্ম ভাষাগত পার্থক্যটি বুঝতে আনুর একটু দেরি হয়ে গেল।
উদ্ধার হওয়ার পর তিনি হয়তো পুলিশকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “স্যার...ও কি পরে লাফ দিয়েছিল?”
পুলিশ যদি উত্তর দিয়ে থাকে, “না ভাই, তিনি অনেক আগেই অটো ধরে বাড়ি চলে গেছেন।” তাহলে সেই মুহূর্তে আনুর হৃদয় দ্বিতীয়বার ডুবে যাওয়ারই কথা।
এই ঘটনাটি আধুনিক প্রেমবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। কারণ এটি কয়েকটি অসাধারণ শিক্ষা দিয়ে গেছে।
প্রথম শিক্ষা: মিউচুয়াল ট্রাস্ট আর ইএমআই এক জিনিস নয়। “আগে তুমি, পরে আমি”-এই নীতিতে ফ্রিজ কেনা যায়, আত্মত্যাগ নয়। একসঙ্গে মরার চুক্তিতে কিস্তি ব্যবস্থা চালু করলে শেষ কিস্তিটা সাধারণত আর আসে না।

দ্বিতীয় শিক্ষা: প্রেমের চেয়েও শক্তিশালী হলো বাস্তববাদ। শেষ মুহূর্তে তরুণী হয়তো ভাবলেন, “আমি মরে গেলে আমার ফোনটা কে আনলক করবে? আগামী সপ্তাহে যে সেল আছে, সেটা কে মিস করবে? আর আমার বিড়ালটার খাবার দেবে কে?” ব্যস, প্রেম হার মানল প্র্যাক্টিক্যাল চিন্তার কাছে।
তৃতীয় শিক্ষা: ডুবুরিদের কর্মসংস্থানে প্রেমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রেমিকরা যদি এভাবে আবেগে ভেসে না যেতেন, তাহলে ডুবুরি বাহিনীর এত নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগই বা কোথায় মিলত?
আনু গুপ্তা এখন জীবিত। শারীরিকভাবে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু মনের ভেতর যে যমুনা শুকিয়ে গেছে, সেখানে সহজে আর প্রেমের নৌকা ভাসবে না। এখন কেউ যদি তাকে বলে, “ভাই, একটু নদীর ধারে ঘুরতে যাবি?” তিনি সম্ভবত সঙ্গে সঙ্গে লোকটার চরিত্র যাচাই করবেন। আর কোনো প্রেমিকা যদি বলে, “তুমি আগে যাও, আমি আসছি।” আনু হয়তো সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, “না বোন, যুগ বদলেছে। এবার দুজনেই আগে দাঁড়িয়ে থাকি!”
আর সেই প্রেমিকা? তিনি হয়তো এখন বান্ধবীদের গ্রুপ চ্যাটে লিখছেন—
“জানিস, আজ একটা ভয়ংকর অ্যাডভেঞ্চার হলো! ছেলেটা এতটাই ওবিডিয়েন্ট যে যা বলেছি, তাই করেছে। তোরা বলতিস না, ও আমার জন্য জীবন দেবে না? দেখ, প্র্যাকটিক্যাল ডেমো দিয়ে দিল!”
শেষ পর্যন্ত একটা কথাই বলা যায়-আনু বাবু, আপনি ভাগ্যবান। যমুনা আপনাকে ডুবাতে পারেনি, আর প্রেমিকা আপনাকে স্থায়ীভাবে বিদায়ও করতে পারেননি। জীবন দ্বিতীয়বার সুযোগ দিয়েছে। এবার প্রেম করার আগে শুধু কুণ্ডলী নয়, প্রেমিকার কমন সেন্স, ধৈর্য, সততা আর “আমি ঠিক তোমার পরে আসছি” বাক্যটির ইতিহাসও একটু যাচাই করে নেবেন।
কারণ বর্তমান যুগে ভালোবাসার সবচেয়ে ভয়ংকর সংলাপ বোধহয় আর “আমি তোমাকে ভালোবাসি” নয়-বরং, “তুমি আগে যাও, আমি আসছি!”

প্রেমের মরশুম আসে, প্রেমের মরশুম যায়। লাইলি-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতীরা বিরহকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন। আর আধুনিক ডিজিটাল যুগের প্রেম? সেটি অনেক বেশি বাস্তববাদী, হিসেবি, রিটার্ন-অন-ইনভেস্টমেন্ট নির্ভর এবং প্রয়োজনে মুহূর্তের মধ্যে ইউ-টার্ন নিতে সক্ষম। সেই বাস্তববাদের এক জীবন্ত (এবং সৌভাগ্যবশত সত্যিই জীবন্ত) নমুনা সম্প্রতি দেখা গেল ভারতের উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজের নিউ যমুনা ব্রিজে। ঘটনাটি এমন, বলিউডের কোনো পরিচালকও যদি এই স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রযোজকের কাছে যেতেন, তাকে হয়তো বলা হতো, “দাদা, এত অবাস্তব গল্প দর্শক খাবে না!”
মূল চরিত্র দুইজন—প্রেমিক আনু গুপ্তা এবং তার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, পরিস্থিতি বুঝে মুহূর্তে মত বদলানোর অলিম্পিক স্বর্ণপদকজয়ী এক প্রেমিকা।
আচ্ছা ঠিক আছে...তবে তুমি আগে লাফ দাও। আমি ঠিক তোমার এক সেকেন্ড পরে আসছি। লেডিস ফার্স্ট তো অনেক হলো, এবার জেন্টলম্যান ফার্স্ট হোক!
পরিকল্পনাটা ছিল মহাকাব্যিক। সমাজ যখন তাদের প্রেম মেনে নেবে না, তখন তারা সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যমুনার বুকে একসঙ্গে ঝাঁপ দেবেন। ইতিহাসে লেখা থাকবে, “দুই প্রেমিক-প্রেমিকা একসঙ্গে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন।” কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত যা লিখল, তার শিরোনাম দাঁড়াতে পারত, “একজন ঝাঁপ দিলেন, অন্যজন ঝামেলা এড়িয়ে বাড়ি চলে গেলেন।”
ঘটনার দিন বিকেলে দুজন এসে দাঁড়ালেন নিউ যমুনা ব্রিজে। চারপাশের বাতাস নিশ্চয়ই ভারী হয়ে উঠেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, তাদের মধ্যে কিছুক্ষণ গভীর আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার সম্ভাব্য স্ক্রিপ্টটা বোধহয় এমনই ছিল-
আনু: “শোনো জানু, এই নিষ্ঠুর পৃথিবী আমাদের এক হতে দেবে না। চলো, আজ যমুনার জলে আমাদের ভালোবাসাকে অমর করে দিই। ওয়ান... টু... থ্রি...।”

প্রেমিকা: “তুমি একদম নিশ্চিত তো? পানি খুব ঠান্ডা না তো? আমার আবার সাইনাসের প্রবলেম আছে।”
আনু: “আরে বোকা! আমরা তো মরেই যাচ্ছি! তখন সাইনাস, মাইগ্রেন, গ্যাস—কিছুই থাকবে না।”
প্রেমিকা: “আচ্ছা ঠিক আছে...তবে তুমি আগে লাফ দাও। আমি ঠিক তোমার এক সেকেন্ড পরে আসছি। লেডিস ফার্স্ট তো অনেক হলো, এবার জেন্টলম্যান ফার্স্ট হোক!”
প্রেমে অন্ধ মানুষ নাকি লাল পতাকাও গোলাপ ফুল মনে করে। আনু গুপ্তাও সম্ভবত সেটাই করেছিলেন। ‘জেন্টলম্যান ফার্স্ট’ কথাটার মধ্যে যে ‘জেন্টলম্যান অনলি’ নামের একটি গোপন শর্ত লুকিয়ে থাকতে পারে, তা তিনি বুঝতেই পারেননি। ভাবলেন, আহা! কী ভদ্র, কী সম্মানশীল প্রেমিকা! ব্যস, বীর বিক্রমে রেলিং টপকে যমুনার বুকে এক দুর্দান্ত ডাইভ!
এরপর শুরু হলো আসল নাটক।
আনু যখন বাতাস কেটে নিচে নামছেন, তখন হয়তো তার মাথার ভেতর বাজছিল কোনো রোমান্টিক সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তিনি হয়তো কল্পনা করছিলেন, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার প্রেমিকাও উড়ে আসবেন, দুজনে হাত ধরাধরি করে ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেবেন।
কিন্তু যমুনার জলে ‘ধপাস!’ করে পড়ার পর যখন তিনি ওপরের দিকে তাকালেন, তখন ইতিহাস নয়-ভূগোলটাই বদলে গেল।
কারণ ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে প্রেমিকা মোটেও “আনুউউ!” বলে চিৎকার করছেন না। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েননি, অজ্ঞান হননি, নাটকীয়ভাবে শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ধরেননি। বরং এমন শান্তভাবে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখছিলেন, যেন তিনি ডিসকভারি চ্যানেলের ‘ওয়াইল্ডলাইফ অব দ্য রিভার’ অনুষ্ঠান দেখছেন। প্রেমিক কীভাবে হাত-পা ছুড়ছেন, কতবার ডুবছেন, কতবার ভাসছেন-সবকিছুই ঠান্ডা মাথায় পর্যবেক্ষণ করলেন। এমনকি মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো মানসিকভাবে নম্বরও দিচ্ছেন—‘ডাইভিং: ৯/১০, সাঁতার: ২/১০, বুদ্ধিমত্তা: শূন্য।’

যখন নিশ্চিত হলেন যে আনু বাবু যথেষ্ট গভীরে পৌঁছে গেছেন এবং আপাতত আর ওপরে ফিরে এসে কোনো প্রশ্ন করবেন না, তখন তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে ঠিক করলেন। এরপর এমনভাবে হাঁটতে হাঁটতে সেতু ছেড়ে চলে গেলেন, যেন বিকেলে পার্কে হাঁটাহাঁটি শেষ করে বাসায় ফিরছেন। না কোনো তাড়াহুড়ো, না কোনো অপরাধবোধ, না কোনো সিনেমাটিক সংলাপ। একেই বলে ‘ক্লিন এক্সিট’। এমন পরিচ্ছন্ন প্রস্থান দেখে করপোরেট দুনিয়ার অনেক সিইওও অনুপ্রাণিত হতে পারেন।
মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো নিজের মনেই বলছেন, “আহা! এতদিন ধরে ব্রেকআপ করার সুযোগ খুঁজছিলাম। মুখোমুখি বলতে খারাপ লাগছিল। যমুনা মা নিজেই সমস্যার সমাধান করে দিলেন!”
কিন্তু বিধাতা আর ভারতীয় পুলিশের একটা অভ্যাস আছে-অন্যের সুন্দর করে সাজানো প্ল্যান নষ্ট করে দেওয়া। স্থানীয় মানুষ ও পুলিশের তৎপরতায় দ্রুত ডুবুরি দল নেমে পড়ল। অনেক কষ্টে যমুনার বুক থেকে টেনে তোলা হলো আনু গুপ্তাকে।
জল থেকে উঠে আনুর অবস্থাটা ছিল সত্যিই করুণ। পেটে যমুনার জল, চোখে প্রতারণার জল, আর মাথায় এমন সব প্রশ্ন, যার উত্তর কোনো মোটিভেশনাল স্পিকারও দিতে পারবেন না।
যে মানুষটিকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, যে বলেছিল “তুমি ছাড়া বাঁচব না”, সে যে আসলে বাক্যটা একটু ভিন্নভাবে বলেছিল, “তুমি ছাড়া আমি দিব্যি বাঁচব”-এই সূক্ষ্ম ভাষাগত পার্থক্যটি বুঝতে আনুর একটু দেরি হয়ে গেল।
উদ্ধার হওয়ার পর তিনি হয়তো পুলিশকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “স্যার...ও কি পরে লাফ দিয়েছিল?”
পুলিশ যদি উত্তর দিয়ে থাকে, “না ভাই, তিনি অনেক আগেই অটো ধরে বাড়ি চলে গেছেন।” তাহলে সেই মুহূর্তে আনুর হৃদয় দ্বিতীয়বার ডুবে যাওয়ারই কথা।
এই ঘটনাটি আধুনিক প্রেমবিদ্যার পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। কারণ এটি কয়েকটি অসাধারণ শিক্ষা দিয়ে গেছে।
প্রথম শিক্ষা: মিউচুয়াল ট্রাস্ট আর ইএমআই এক জিনিস নয়। “আগে তুমি, পরে আমি”-এই নীতিতে ফ্রিজ কেনা যায়, আত্মত্যাগ নয়। একসঙ্গে মরার চুক্তিতে কিস্তি ব্যবস্থা চালু করলে শেষ কিস্তিটা সাধারণত আর আসে না।

দ্বিতীয় শিক্ষা: প্রেমের চেয়েও শক্তিশালী হলো বাস্তববাদ। শেষ মুহূর্তে তরুণী হয়তো ভাবলেন, “আমি মরে গেলে আমার ফোনটা কে আনলক করবে? আগামী সপ্তাহে যে সেল আছে, সেটা কে মিস করবে? আর আমার বিড়ালটার খাবার দেবে কে?” ব্যস, প্রেম হার মানল প্র্যাক্টিক্যাল চিন্তার কাছে।
তৃতীয় শিক্ষা: ডুবুরিদের কর্মসংস্থানে প্রেমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। প্রেমিকরা যদি এভাবে আবেগে ভেসে না যেতেন, তাহলে ডুবুরি বাহিনীর এত নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগই বা কোথায় মিলত?
আনু গুপ্তা এখন জীবিত। শারীরিকভাবে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু মনের ভেতর যে যমুনা শুকিয়ে গেছে, সেখানে সহজে আর প্রেমের নৌকা ভাসবে না। এখন কেউ যদি তাকে বলে, “ভাই, একটু নদীর ধারে ঘুরতে যাবি?” তিনি সম্ভবত সঙ্গে সঙ্গে লোকটার চরিত্র যাচাই করবেন। আর কোনো প্রেমিকা যদি বলে, “তুমি আগে যাও, আমি আসছি।” আনু হয়তো সঙ্গে সঙ্গে বলবেন, “না বোন, যুগ বদলেছে। এবার দুজনেই আগে দাঁড়িয়ে থাকি!”
আর সেই প্রেমিকা? তিনি হয়তো এখন বান্ধবীদের গ্রুপ চ্যাটে লিখছেন—
“জানিস, আজ একটা ভয়ংকর অ্যাডভেঞ্চার হলো! ছেলেটা এতটাই ওবিডিয়েন্ট যে যা বলেছি, তাই করেছে। তোরা বলতিস না, ও আমার জন্য জীবন দেবে না? দেখ, প্র্যাকটিক্যাল ডেমো দিয়ে দিল!”
শেষ পর্যন্ত একটা কথাই বলা যায়-আনু বাবু, আপনি ভাগ্যবান। যমুনা আপনাকে ডুবাতে পারেনি, আর প্রেমিকা আপনাকে স্থায়ীভাবে বিদায়ও করতে পারেননি। জীবন দ্বিতীয়বার সুযোগ দিয়েছে। এবার প্রেম করার আগে শুধু কুণ্ডলী নয়, প্রেমিকার কমন সেন্স, ধৈর্য, সততা আর “আমি ঠিক তোমার পরে আসছি” বাক্যটির ইতিহাসও একটু যাচাই করে নেবেন।
কারণ বর্তমান যুগে ভালোবাসার সবচেয়ে ভয়ংকর সংলাপ বোধহয় আর “আমি তোমাকে ভালোবাসি” নয়-বরং, “তুমি আগে যাও, আমি আসছি!”

রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড বা একটি অভ্যুত্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেগুলো রাষ্ট্রের চরিত্র, প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, মেজর জেনারে